বেশ বলছে কিন্তু। জিভের ধার আছে। কথাও গুছিয়ে বলে। এও এক প্রতিভা। শান পড়ে পড়ে আরও ধারালো হচ্ছে দিনকে দিন।
এবাড়ি সে-বাড়ি ঘুরে এঁটোকাঁটা খেয়ে বেড়াও, লজ্জাশরম নেই? বাসন্তীর মা এসে কত কুচ্ছো গেয়ে যায়। লজ্জায় মরি।
বাসন্তীর মা যে এবাড়িতে আসে তা জানে ধীরেন। কেন আসে তাও জানে। ধীরেন যে লজ্জা পাচ্ছে না তা নয়। বাস্তবিক লজ্জা করে বইকী! বাসন্তীর মা তো কত কথাই শুনিয়েছে আড়াল থেকে। কিন্তু কথাগুলো তাকে তেমন চিমটিও কাটে না। বরং সে কথাগুলো শুনে তারিফই করে। বেশ বলে লোকে। মানুষকে কেমন করে অপমান করতে হয়, কখনও সূক্ষ্মভাবে, কখনও স্থূলভাবে তাও কি একটা শিক্ষার বিষয় নয়? এই রণচণ্ডী মহিলা আজ যেমনই হোক, একদিন কিন্তু ভারী রসালো রকমের যুবতী ছিল। ঢলঢল করত। বউঠানের কাছে যেতে বুক ঢিপঢিপও করত একটু। তাকালে জীবন যেন ধন্য হয়ে যেত। ঠোঁট টিপে মাঝে মাঝে এমন মোহন হাসি হাসত যে সারাদিন ওই হাসি মনে পড়ত।
বলি বাড়িতে কি গেল না? সকালে গুচ্ছের বাসি রুটি না হয় মুড়ি তো দেওয়া হয়, নাকি? দুপুরে থালাভর্তি ভাত তো জুটছে। তবে কুকুরের মতো লোকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ল্যালানোর মতো রুচি হয়? লোকে কী বলে তা কি কানে যায় না? মানুষের চামড়া, না গণ্ডার?
ধীরেন একটু তটস্থ ভাব করে মাত্র। বউকে খুশি কবার জন্যই। নইলে বড়ই বেহায়া ভাববে।
বলি, মুখে কি পুলিপিঠে গুঁজে বসে আছ? বলবে তো কিছু?
ধীরেন বেশ শ্রদ্ধার সঙ্গেই বলল, তা কী বলতে বলছ?
ওদের বাড়িতে যাও কেন? কোন মধু আছে ওখানে শুনি?
ধীরেন ভালমানুষের মতো বলে, না এমনি যাই না। বাঙাল ধরে নিয়ে যায় তাই যাই। বাসন্তীও শ্রদ্ধাভক্তি করে খুব। ওদের পাম্পটা সারিয়ে দিলুম তো সেদিন।
ওসব আমি জানি। ছোঁচার মতো বেহান হতে না-হতেই গিয়ে হানা দাও খাবারের লোভে। ছিঃছিঃ ঘেন্নায় মরে যাই। ঝাঁটা মারি অমন খাবারের মুখে। আর মাগীরও আস্পর্ধা কম নয়, বাড়ি বয়ে এসে বিষ উগড়ে গেল। বলি লোকে এত সাহস পায় কেন? তোমার মতো ঘাটের মড়ার জন্যই তো!
ওদিকে দুই বউয়ের ঝগড়া একেবারে উদারা-মুদারা-তারায় ঠেলে উঠছে। বাচ্চাগুলো তার মধ্যে ভেজালে পড়ে চিল-চেঁচানি চেঁচাচ্ছে। তার মধ্যেই কিল চাপড় মারার শব্দ হচ্ছে। সব মিলিয়ে ভারী একটা গোলমাল। যেমন কেত্তনের সময় খোল কত্তাল বাজে, এও যেন ঠিক তেমনি। অনেক চেঁচামেচি মিশে একটা শব্দের ঘ্যাঁট তৈরি হয়।
ঝগড়া শোর্না ধীরেনের পুরনো বাতিক। একটু বয়স হওয়ার পর থেকেই হয়েছে এই বাইটা। পথেঘাটে ঝগড়া লেগেছে দেখলে সে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে শোনে।
বউ ডিমের থালা নিয়ে উঠে গেল। এখন সেও গিয়ে আসরে নেমে পড়বে। দুই বউয়ের ঝগড়া লাগলে শাশুড়ির তাতে মুখ এঁটো না করাটা বোধহয় খারাপই দেখায়।
ঝগড়া শুনতে ধীরেন বারান্দায় এসে দাঁড়াল।
খুড়া আছেন নাকি বাড়িতে? খুড়া!
ধীরেন তাড়াতাড়ি বারান্দা থেকে নেমে একগাল হেসে বলল, বাঙাল যে!
তড়াতড়ি লন তো খুড়া, আমাগো মিক্সিখান খারাপ হইছে। যন্ত্রপাতি লগে লইয়া লন তো।
আহা, পরান মিস্তিরিকে ডেকে নিয়ে যাও না।
আরে ওইটা একটা পাঠা। বাসন্তী কয়, খুড়া হইল কলকবজায় ওস্তাদ। তারে ধইরা লইয়া আস গিয়া। চলেন চলেন, ভাল চিতল মাছ আনছি বৈঠকখানা বাজার থিক্যা। আইজ আমার বাড়িতেই দুফুরে দুইটা খাইবেন।
ধীরেন ফাঁপড়ে পড়ে বলে, খাবো!
ক্যান, খাইবেন না ক্যান? খুড়িমারে কইতে হইব নাকি? উরেব্বাস, ঘরে তো কাইজ্যা লাগছে দেখি।
ধীরেন হেসে বলে, না বলতে হবে না। বলার কিছু নেই। চলো, যাচ্ছি।
বাঙালের পিছু পিছু বেরিয়ে এল ধীরেন। না, তার লজ্জা করছে না তো!
মিক্সি তেমন জটিল যন্ত্র নয়। ধীরেনের বিদ্যের অকুলান হল না। যন্ত্রটা খুলে খুব যত্ন করে সারাল সে। একটা কানেকশনের অভাব ঘটেছিল। আধঘণ্টাতেই হয়ে গেল।
সকালে কী খাইছেন খুড়া?
ধীরেন হেসে বলল, খেয়েছি দুখানা রুটি আর গুড়।
রামচন্দ্র! রুটি আর গুড় একটা খাদ্য হইল?
ধীরেন মাথা নেড়ে বলে, না হে বাঙাল, রুটি গুড় কিছু খারাপ জিনিস নয়। আখিগুড়ে একটা ভারী মিঠে গন্ধ আছে, রুটির সঙ্গে বনেও ভাল।
কী যে কন। গরমাগরম একটু হালুয়া খাইয়া জুইৎ কইরা বসেন। মুখ গুইজ্যা বাড়িতে বইয়া থাকেন ক্যান? বাড়িতে যত গুইজ্যা থাকবেন ততই অশান্তি। বউ বুড়া হইলেই খাণ্ডার।
ধীরেন তা জানে। খাণ্ডারকে সবাই ভয় খায়। ধীরেনও খায় বটে, তবে তার তেমন বিচলন হয় না। মিহিন মানুষ না হলে দুনিয়াটাকে বোঝাও যায় না কিনা। মাথা গরম হলে দুনিয়া আবছা হয়ে যায়। তখন মানুষ নিজের বিষে নিজেই জ্বলেপুড়ে মরে। ওতে লাভ হয় না কিছু। বরং জলের মতো মানুষ হওয়া ভাল।
হালুয়া এসে গেল। গরিব ঘরের কেলটি মার্কা জিনিস নয়। গাওয়া ঘিয়ের গন্ধ ছাড়ছে। কিসমিস কাজু গিজগিজ করছে।
কেমন খান খুড়া?
বাস রে! এ যে একেবারে দাঙ্গাহাঙ্গামা হে বাঙাল। এরকমও যে হয় জানতাম না।
যত গুড়, তত মিষ্টি, বুঝলেন খুড়া? যত মালমশলা ঠাসবেন ততই স্বাদ সোয়াদ পাইবেন।
তাই নাকি?
আইজ্ঞা। খাওনের ব্যাপারে বাঙালের লগে কেউ পারব না। বাঙালরা আর কিছু না পারুক কাছা খুইলা খাইতে জানে।
শুধু খেতেই জানে না, খাওয়াতেও জানে।
