বউ শুনে বলল, আমার মাজায় যা ব্যথা। ছেলেদের বলে দেখ, ওরা যদি যায়।
বড় ছেলে সবে গ্রিলের একটা কারখানা খুলেছে বাড়িতেই। মহা ব্যস্ত। বলল, দেখছ তো ফুরসত নেই।
ছোট ছেলে এতদিন নেশাভঙের ব্যবসা করত। তারপর গাঁয়ের ভাল ছেলেরা জোট বেঁধে তাকে প্রথমে শাসায়, তারপর উস্তমকুস্তম পেটায়। বিজু ছিল তাদের নেতা। বিজুর ভয়েই এখন ওসব ব্যবসা ছেড়ে সে শাড়ির ব্যবসায় নেমেছে। বলতেই বলল, কালই আমি মংলা হাটে যাচ্ছি। সেখান থেকে শান্তিপুর।
জানাই ছিল। একটুও দুঃখ হল না ধীরেনের। জীয়ন্ত থাকতে থাকতেই নিজের মরাটা কেমন তা বেশ উপভোগই করছিল সে।
কথাটা লতায়পাতায় বেয়ে বেয়ে যার কানে পৌঁছল সে ধীরেনের কেউ নয়। তার গরজও থাকার কথা ছিল না। তবু বিজুই বলল, ভাবছেন কেন ধীরেনখুড়ো, আমি তো রোজ বর্ধমানে যাই। আমার মোটরবাইকের পিছনে চেপে যেতে পারবেন না?
শুনে একগাল হেসেছিল ধীরেন, মোটরবাইক! ওরে বাবা! সে তত বড় ভাল জিনিস! জীবনে কখনও চাপিনি। জন্মের শোধ একবার চেপে নিলে হয়। উরে বাবা, মোটরবাইক যখন ছোটে তখন যেন চারদিকের বায়ুমণ্ডলে একটা মন্থন হতে থাকে।
শুনে বিজু খুব হাসল।
বিজুই নিয়ে গেল। আর সেই যাওয়াটার কথা মরণ অবধি মনে থাকবে ধীরেনের। কানমুখ ভাল করে ঢেকে নিয়েছিল বটে, তবু কী হাওয়া রে বাবা! আর কী স্পিড। এ যেন মাটির ওপর উড়ে যাওয়ার মতোই ব্যাপার। পড়ার মরার ভয় করেনি একটুও। তার মতো মনিষ্যির মরাই বা কতটুকু ঘটনা? উকুন মারার শব্দটুকুও হবে না। ভয় নয়, বরং ভারী অন্যরকম লাগছিল ধীরেনের। একটু দোল খেয়ে খেয়ে ডাইনে বাঁয়ে হেলে দুলে এরকম যাওয়া সে কখনও যায়নি তো। মানুষ যে কত কলই বানিয়েছে। কী যে আছে মানুষের মাথায় কে জানে বাবা! কী বুদ্ধি! কী বুদ্ধি! মানুষকে তার বারবারই প্রণাম করতে ইচ্ছে যায়।
বিজুই ছিল আগাগোড়া তার সঙ্গে। অপারেশনের পর বিকেলে যখন ছেড়ে দিল তখন বিজু বলল, মোটরবাইকে ঝাঁকুনি লাগতে পারে ধীরেনখুড়ো, চলুন আপনাকে গাড়ি করে নিয়ে যাই।
ধীরেন হাঁ করে থেকে বলল, না না বাবা, ওতেই হবে। গাড়ি যে অনেক পয়সা নেবে।
সেসব চিন্তা করতে হবে না। গাড়ি আমার মক্কেলের। আমি তাকে ফোন করে দিচ্ছি।
শেষ অবধি মারুতি গাড়িতেও চড়ল ধীরেন। নিজেকে রাজাগজার অধিক মনে হচ্ছিল তার। আনন্দে চোখে জল আসছিল।
তুমি অনেক করলে বাবা, আমার জন্য। কী যে বলি তোমাকে!
দুর দুর! এসব তো আমাকে করতেই হয় খুড়ো। কতটুকু আর পারি।
কথাটা ঠিক। বিজু মানুষের জন্য করে। সারা গাঁয়ে তার নামে একটা ধন্যি ধন্যি ভাব আছে।
কৃতজ্ঞতায় অভিভূত ধীরেন মারুতি গাড়ির ভিতর থেকে বাইরের দিকে একটা চোখে চেয়ে বুঝল জলে চোখটা আরও ঝাপসা হয়ে গেছে।
ইঁদুরটা আবার ঢুকে গেছে ভিতরে। চৌকির তলায় অন্ধকার জগতে ওদের দিব্যি থাকা। ওদের মতো যদি অন্ধকারেও দেখতে পেত ধীরেন আরও কত কী দেখা যেত!
উঠোনের ওধারে দুই বউয়ের মধ্যে একটা চাপা গলার ঝগড়া চলছিল কিছুক্ষণ ধরে। এবার সেটা তুঙ্গে উঠল। প্রায়ই হয়, চুলোচুলি অবধি গড়ায়। আর ভাষা যা ব্যবহার হয় তা কোনও ডিকশনারিতে পাওয়া যাবে না।
হঠাৎ তার বউ তার দিকে ফিরে বলল, শুনলে?
কী শুনব?
বড়বউ বলছে তারা নাকি বাড়ির সবটাই আমাদের কাছ থেকে কিনে নিয়েছে। আমাদের নাকি বের করে দেবে।
ও আর শুনে কী হবে?
ভাল করে খোঁজ নাও। গুণধর ছেলে কোনও বদমাশ উকিলের সঙ্গে সাঁট করে সত্যিই নকল দলিল টলিল কিছু বের করেছে কিনা। আজকাল বড়বউয়ের মুখে প্রায়ই কথাটা শুনছি। ছেলেকে জিজ্ঞেস করলে চুপ করে থাকে। কিন্তু তলে তলে কিছু একটা ঘোঁট পাকাচ্ছে নিশ্চয়ই।
ধীরেন একটু চিন্তিত হয়ে বলল, তাই কি হয়?
আজকাল সব হয়। মাস ছয়েক আগে একবার আমার কাছে বাড়ির দলিল চেয়েছিল। আমি দিইনি। কিছু একটা মতলব আঁটছে তখনই সন্দেহ হয়েছিল। গ্রিলের কারখানা খুলে এখন সাপের পাঁচ পা দেখেছে। কাঁচা টাকা আসছে তো হাতে।
ধীরেন উঠে পড়ল। আয়ুর আর কটা দিনই বা বাকি? মন ভারাক্রান্ত হয়ে থাকলে মূল্যবান সময় লোকসানে যাবে।
কোথায় চললে?
একটু ঘুরে-টুরে আসি।
সারাদিনই তো ঘুরছ। বলি এদিকটাও তো দেখতে হবে।
ধীরেন তটস্থ হয়ে বলে, আমি দেখে কী করব? আমাকে কি কেউ মানে?
তোমাকে মানে না, সে তোমারই দোষ। মানবে কী করে বলো তো! একটু মানুষের মতো হবে তো!
তা তো বটেই।
চুপ করে থাকে বলেই যে তুমি ভালমানুষ তা তো নয়। তোমাকে কি আমি আজকে চিনেছি? এত বড় শয়তান গোটা পরগনা খুঁজলে পাওয়া যাবে না। বাবা তোমার মধ্যে কী দেখেছিল বাবাই জানে।
এসব কথায় যে ধীরেনের রাগ হয় তা নয়। একসময়ে হত বটে, আজকাল আশ্চর্যের বিষয় এইসব গালমন্দের মধ্যে সে নিজেকে একটু একটু আবিষ্কারও করে ফেলে। সে কতখানি শয়তান তার খবর কিন্তু তার বউ রাখে না। ঘোর বর্ষার এক ভুতুড়ে দিনে তার হাতে খুন হয়েছিল মিদ্দার। ঠিক বটে, মিদ্দার খুন না হলে মিদ্দারের হাতে সে খুন হয়ে যেত। যেত তো যেত। তার পরেও এতগুলো বছর বেঁচে থেকে হল কোন অষ্টরম্ভা?
গলা দিয়ে যে এখনও তোমার ভাত নামে এতেই আশ্চর্য হয়ে যাই। নিজের ওপর ঘেন্নাও হয় না তোমার? গলায় দড়ি জোটে না? আবার গিয়ে চোখ কাটিয়ে এলে। বলি চোখ কাটিয়ে হবেটা কী? লেখাপড়া করে ব্যারিস্টার হবে নাকি বুড়ো বয়সে? নাকি পথে পথে ঘুরে ছুঁড়ি দেখে বেড়াবে!
