সন্ধ্যা হঠাৎ এবার মোনার দিকে ফিরে বলল, ওভাবে জল ছিটোচ্ছ কেন মেজো বউদি? বিছানাটা যে ভিজে যাচ্ছে!
মোনা তীব্র বেগে ঘুরে দাঁড়িয়ে ধমকে উঠল, তা নিয়ে তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না। গেট আউট ফ্রম হিয়ার…
সন্ধ্যা ফুঁসে উঠে বলল, অত মেজাজ দেখাচ্ছ কেন? বিছানাটা ভিজে যাচ্ছে, তাই বলেছি। খারাপ কথা বলেছি কিছু?
মোনা তেমনই বিষাক্ত গলায় বলে, মেয়েটার চেয়ে বিছানাটা বেশি হল? ক্রাঙ্ক হেড কোথাকার?
সন্ধ্যা ছাড়বার পাত্রী নয়, সমানে গলা তুলে বলল, বাঃ বেশ তো! আমার বুড়ো বাবা তোমার ন্যাকা মেয়েকে ঘাড়ে করে বয়ে নিয়ে এল, আর এখন একেবারে দরদ উথলে উঠছে! একটু আগে তো মেয়েকেই গালাগাল করছিলে।
বেশ করেছি। তুমি তোমার কাজে যাও।
আমি কোথায় যাব সেটা আমি বুঝব। এটা আমার বাবার ঘর। আমাকে যদি সইতে না পার তাহলে তুমি নিজের ঘরে যাও। আমাকে যেতে বলার তুমি কে?
ঝগড়া থামানোর জন্য যে দুজনের মাঝখানে পড়ে সামাল দেবে সেই শক্তিও নেই মহিমের। অসহায়ভাবে সে দেখছিল, যেন দুটো বনবেড়াল কথা দিয়ে আঁচড়াআঁচড়ি কামড়াকামড়ি করছে। সে একবার হাতটা তুলল। দুর্বল হাতটা পড়ে গেল ধপাস করে।
.
০৫.
হরিহরপাড়ার কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে, গাছগাছালির আড়াল-আবডালে ঢাকা পড়তে পড়তে এবং ফের প্রকাশ পেতে পেতে যেন একটা চিরুনির ভিতর দিয়ে ওই আসছে রসিক বাঙাল। পরনে কালচে পাতলুন, তাতে হলদে জামাটা গোঁজা, হাতে অ্যাটাচি কেস।
চৌধুরীদের পুকুরে আজ টিকিট কেটে মাছ-ধরার কম্পিটিশন। কাতারে লোক হুইল ছিপ নিয়ে বসে গেছে। মেলা লোক জুটেছে মাছ ধরা দেখতে। ভিড়ে ভিড়াক্কার। সকাল থেকেই জায়গাটায় থানা গেড়ে ছিল মরণ। খানিকক্ষণ মাছ ধরা দেখে সঙ্গীসাথীদের সঙ্গে একটু বল খেলল। খিদে চাগাড় দেওয়াতে বাড়ি-মুখোই ফিরছিল সে। তখনই দূর থেকে দেখল রসিক বাঙাল আসছে। আজ বুধবার, বাঙালের আজ আসার কথা নয়। তার মানে কলকাতায় ঝগড়া হয়েছে। ঝগড়া করে এলে রসিক বাঙালের মেজাজ বড্ড তিড়িক্কি থাকে।
সুতরাং মরণ ছুট লাগাল। বাড়িতে গিয়ে মাকে আগাম জানান দেওয়া দরকার। আর জিজিবুড়িকেও তাড়াতে হবে। বেরোবার সময়ে দেখে এসেছে, জিজিবুড়ি উঠোনে বসে হাপড়হাটি বকে মরছে। জিজিবুড়ির হল অভাবের সাতকাহন। সব সময়ে এটা চাই, সেটা চাই। রসিক বাঙাল জিজিবুড়িকে দু চোখে দেখতে পারে না।
মরণ অঙ্কে চল্লিশের বেশি পায় না বটে, কিন্তু দৌড়ে বরাবর ফার্স্ট হয়। ক্লাবঘরের খেলার মাঠ পেরিয়ে সে চোখের পলকে চাটুজ্যে বাড়ির উঠোন দিয়ে শর্টকাট মেরে নিজেদের বাড়ির উঠোনে ঢুকেই চেঁচাল, বাঙাল আসছে! বাঙাল আসছে!
জিজিবুড়ি পানের বাটা কোলে নিয়ে রোদে বসে ছিল। মুখে দোক্তা দেওয়ার পর জিজিবুড়ির চোখে যেন আরামের তন্দ্রা চলে আসে। চেঁচানি শুনে জিজিবুড়ি চমকে উঠে বলে, আ মোলো! আজ আবার বাঙাল এল কেন?
পালাও জিজিবুড়ি, এসে পড়ল বলে।
তড়িঘড়ি উঠতে গিয়ে কোলের পানের বাটা ঠনাৎ করে পড়ে গেল উঠোনে। খোলা কৌটো থেকে সুপুরির টুকরো ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে, চুন লেপটাল, দোক্তা ছিটিয়ে গেল।
দ্যাখ দিকিনি কাণ্ড! অমন চেঁচাতে আছে! এখন এসব তোলে কে?
তুলতে হবে না জিজিবুড়ি, পালাও শিগগির।
যাচ্ছি বাপু, যাচ্ছি। দোক্তাগুলো একটু কুড়িয়ে দিবি ভাই? যতীনকে কত বলে বলে তবে আনাতে হয়। দামও কি কম? এই দোক্তাটুকুর জন্যই বেঁচে আছি, প্রাণটা এখনও ওই জন্যই ধুকপুক করে।
তুমি বড্ড বকো জিজিবুড়ি। বাড়ি যাও না, মুক্তাদি কুড়িয়ে তোমাকে দিয়ে আসবেখন।
মাজায় ব্যথা, জিজিবুড়ি তাই একটু বাঁকা হয়ে উঠোনের পিছনভাগে এগোতে এগোতে বলে, দিস কিন্তু পাঠিয়ে ভাই।
দোতলার বারান্দায় এসে মা বলল, কী হল রে? কে আসছে বললি?
বাঙাল আসছে।
মায়ের মুখ শুকোল। বলল, তবে বড়গিন্নির সঙ্গে অশান্তি হয়েছে ঠিক। যা যা পড়তে বস গে। আলায়-বালায় ঘুরিস, টের পেলে আস্ত রাখবে না।
সেটা খুব জানে মরণ। জিজিবুড়িকে রওনা করে দিয়ে সে এক লাফে ঘরে ঢুকে পড়তে বসে গেল। অসময়ে, অ-দিনে বাঙাল আসা মানেই গণ্ডগোল। বই খুলে কান খাড়া করেই বসে রইল সে। পরবর্তী দৃশ্য ও ঘটনাগুলি তার খুব জানা। বাঙাল আসবে, এসে ওপাশের একতলার কোণের ঘরে ঢুকে সোজা গিয়ে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়বে। কারও সঙ্গে একটিও কথা কইবে না। একদম পাথরের মতো চুপ। ওই সময়ে কেউ কাছে যাওয়ার সাহস পায় না। অন্তত আধঘণ্টা মা পর্যন্ত চৌকাঠ ডিঙোয় না। আধঘণ্টা বাদে মা এক কাপ গরম চা নিয়ে গিয়ে টেবিলে রাখবে। তারপর খুব মোলায়েম গলায় বলবে, চা এনেছি।
তার পরেও কিছুক্ষণ শুয়ে থাকবে বাঙাল। মা খুব সন্তর্পণে বিছানার এক পাশে বসে পায়ের ওপর একটু হাত বোলাবে। বাঙাল তখন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলবে। তারপর হু-উ-উম করে একটা অদ্ভুত শব্দ করবে। তারপর উঠে বসবে। তখনও কোনও কথা নেই। বসে বসে কিছুক্ষণ সুড়ুৎ সুড়ুৎ করে চা খাবে। গরম চা যত পেটে যাবে তত মেজাজ শীতল হয়ে আসবে।
মরণের একটা হামা-দেওয়া বোন আছে। সেটা একেবারে নরম তুলতুলে, গোবরের নাদা। মরণ তাকে কোলে-টোলে নিতে পারে না কখনও। সেই বোনটাকে নিয়ে এসে মুক্তা এর পর বাঙালের কোলে ফেলে দেবে। বাঙাল তখন হুঁ-হুঁ-হুঁ-হুঁ করে অদ্ভুত শব্দ করতে করতে মেয়েটাকে খুব আদর করবে। মরণের বোনটাও কে জানে কেন বাঙালের ভীষণ ভক্ত। সে তখন বাঙালের নাক কামড়ে দেবে, কান ধরে টানাটানি করবে। মরণ যখন ছোট্টোটি ছিল তখনও নাকি বাঙালের মেজাজ বিগড়োলে তাকে এনে বাঙালের কোলে ফেলে দেওয়া হত আর বাঙাল ঠিক ওইরকম করে আদর করত তাকে। আর মেজাজ আরও শীতল হয়ে যেত।
