প্রশ্ন নেই। কিন্তু হয়তো কথা আছে। কী কথা তা মনে পড়ছে না তার। কথা বলতেই হবে এমন কোনও নিয়মও তো নেই। তাকাতেই হবে, এমনও তো নয়। সোহাগ বসে রইল। বিজু বসে রইল। চুপচাপ।
কিন্তু সোহাগের বুকের ভিতরে ধক ধক শব্দটা হয়েই যাচ্ছে। হৃৎপিণ্ড রক্ত পাম্প করে। সুতরাং শব্দ তো হওয়ারই কথা। তফাত হল, অন্য সময়ে শব্দটা সে শুনতে পায় না। এখন পাচ্ছে। তার খারাপ লাগছে না।
আরও একটা সত্য হল, এই লোকটা এসে কাছাকাছি বসবার পর সোহাগের কেন যে ব্যাপারটা ভাল লাগছে। বেশ ভাল লাগছে। ইচ্ছে হচ্ছে এভাবে বসে থাকতে। এরকম লাগার কথা নয়। অথচ লাগছে।
৫৬-৬০. সেদ্ধ ডিম
৫৬.
কাজটা দেখতে সামান্যই। সেদ্ধ ডিম কেটে দু-আধখানা করা। কিন্তু তার মধ্যেও যে কত কারিকুরি আছে সেটা অবাক হয়ে দেখছিল ধীরেন কাষ্ঠ। তার বউ একটা সুতো পায়ের আঙুলে চেপে হাত দিয়ে টান করে ধরে কত সাবধানে হিসেবনিকেশ করে ডিমগুলো কাটছে, একটু হেলদোল নেই, ডিম ছোট-বড় হচ্ছে না। ঠিক মাঝখানটা দিয়ে সুতোর করাতে ভাগ হয়ে যাচ্ছে ডিম। সূক্ষ্ম কাজ। বাহবা দেওয়ার মতো। শুধু কি তাই? সাদা সুতোটার গায়ে ডিমের কুসুম লেগে ভারী সুন্দর একটা রং-ও ধরে যাচ্ছে। রসস্থ মুখে বসে দেখছিল ধীরেন।
একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। এ বাড়িতে আস্ত ডিমের চলনই উঠে গেছে। আধখানা বৈ পুরো আর পাতে পড়ে না। আধখানা ডিম এরা কী করে রাঁধে কে জানে। রান্নার সময় নাড়াচাড়ায় কুসুমটা বেরিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু যায় না। খোলর মধ্যে ঠিক আটকে থাকে। আধখানা ডিম রাঁধতেও মাথা চাই। হাতের কারসাজি চাই। এইসব প্রতিভা ছাড়া কি গরিবের চলে?
একটা ডিম ভাগ করে থালায় রেখেছে তার বউ। ধীরেন ডিম দেখছিল। তখনই লক্ষ করল ডিমটাও দেখছে তাকে। দু-আধখানা ডিম ঠিক একজোড়া চোখের মতো ভারী ফ্যাকাশে নির্বিকার চোখে একটা অপদার্থ লোককে চেয়ে দেখছে খুব। মাপজোক করছে, বুঝবার চেষ্টা করছে লোকটা কেমনধারা। ডিমের এই তাকিয়ে থাকা দেখে ভারী খুশি হচ্ছে ধীরেন। এও একটা ঘটনা। লোকে টেরই পায় না, এরকম কত ঘটনাই সবসময়ে ঘটে যাচ্ছে চারদিকে।
দিন দশেক হল চোখ খুলে গেছে ধীরেনের। আজকাল খুব দেখছে সে। কত রং, কত সূক্ষ্ম ঘটনা, কত শিল্প। ডান চোখের ছানি কাটিয়ে এল বর্ধমান থেকে। সেও এক অশৈলী ব্যাপার। ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়। মানুষকে বড্ড প্রণাম করতে ইচ্ছে যায় ধীরেনের। মানুষ যে কী কাণ্ড ঘটাতে পারে তার কি লেখাজোখা আছে। তার আবছা ভাল চোখটায় কুটুস করে কী একটু করে দিল ডাক্তার, ব্যান্ডেজ খোলার পর ধীরেন অবাক। মরি মরি! সে যে একেবারে আদিগন্ত দেখতে পাচ্ছে। মানুষের এলেম কি কম? যত ভাবে তত মানুষের ওপর ভারী শ্রদ্ধা হয় তার।
অপারেশনের পাঁচদিন পর চেক আপ-এ গিয়েছিল ধীরেন। অল্পবয়সি ডাক্তারবাবুটি দেখে-টেখে বললেন, বাঃ, চোখ তো খুব ভাল আছে!
ধীরেন ডাক্তারবাবুটির মুখের দিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে আপ্লুত হয়ে তাকিয়ে ছিল। এরা কি আর মানুষ? এদের ভিতরেই ভগবান ভর করে আছে।
সে বলে ফেলল, ডাক্তারবাবু, আমি কি আপনাকে একটু প্রণাম করতে পারি?
ডাক্তার চমকে উঠে বলল, না না, সে কী? প্রণাম করবেন কেন? ছিঃ ছিঃ, আপনি পিতৃতুল্য মানুষ।
ধীরেন বলল, প্রণাম তো আপনাকে নয়, মানুষকে। মানুষ যে বড় ভাল ডাক্তারবাবু। মানুষ যে বড় ভাল।
ডাক্তার হাসল। বলল, তা তো ঠিকই। কিন্তু প্রণাম করার দরকার নেই। আপনি খুশি হয়েছেন, সেইটেই বড় কথা।
শুধু ডাক্তারবাবুটিই বা কেন? যারা নিজের খরচে তার অপারেশন করিয়ে দিল তারাই কি কিছু কম ভগবান? ট্যাঁকের পয়সা খরচ করে চোখ কাটানো তো সম্ভব ছিল না ধীরেনের।
চোখ খুলে যাওয়ায় এখন দেখার খুব নেশা চেপেছে ধীরেনের। খুব দেখছে চারদিক, মনের সুখে দেখে বেড়াচ্ছে। এই যে ডিমের দুখানা চোখ তার দিকে চেয়ে আছে এটাই তো চোখে পড়েনি এতদিন! ওই যে চৌকির নীচে ডাঁই করা কৌটোবাউটোর ভিতর থেকে একটা ইঁদুর তার ছুঁচলে মুখ বাড়িয়ে চারদিকটা দেখে নিচ্ছে এটাও কি এতদিন নজরে পড়েছে ধীরেনের! মুগ্ধ হয়ে ইঁদুরটার কাণ্ড দেখছিল ধীরেন। চারদিকে পুঁতির মতো চোখ দুটো দিয়ে দেখে নিচ্ছে। মুখখানা কী সুন্দর! কী নিষ্পপ! মুখ থেকে লেজের ডগা অবধি সৌন্দর্য উঁদুরের। লোকে তেমন লক্ষ করে না, করলে বুঝত এত সুন্দর জীব বড় বেশি নেই।
মোট ছটা ডিম কেটে বারো টুকরো করল তার বউ। একেবারে মাথা গুনতি হিসেব। এখন অনেকগুলো ডিমের চোখ তাকে দেখছে। আহা, দেখুক। তাকে তো কেউ বিশেষ চেয়ে দেখে না।
ওই যে তার বউ, এক ঘরে থাকে বটে, কিন্তু তাদের চোখে চোখে কদাচিৎ হয় কি হয় না। বেঁচে থেকেও কেমন করে যেন মানুষ একে অন্যের কাছে মরে যায়। ভেবে ভারী অবাক হতে হয় বটে।
এই যে মরে যাওয়াটা, এটা কিন্তু তেমন খারাপ লাগে না ধীরেনের। আসল মরার পর তো কিছু টের পাওয়া যাবে না। এই জীয়ন্ত মরার মধ্যে একটা মজা আছে কিন্তু।
এই যে চোখ কাটাতে বর্ধমান যাওয়া সেটাও ভারী মজার হল। লায়নস ক্লাব অপারেশনের তারিখ জানিয়ে চিঠি দেওয়ার পর ধীরেন সেটা প্রথমে তার বউ, তারপর দুই ছেলেকে জানিয়েছিল। কেউ যেন তেমন গা করল না। ধীরেনের ছানি কাটার ওপর তো দুনিয়ার কিছু নির্ভর করছে না। কিন্তু একজন সঙ্গীর দরকার ছিল। চিঠিতেও লিখেছে, একজন অ্যাটেনডেন্ট সঙ্গে আনতে হবে।
