তুমি কী বললে?
আমি অনেক ভেবে দেখলাম, বাবা ঠিকই বলেছে। আমার বিয়ের আর তেমন প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। এই যে কাজকর্ম নিয়ে সকাল থেকে রাত অবধি কেটে যায় এতেই বেশ আনন্দে আছি। সঙ্গে আর একটা মানুষ জুটলে তারও তো কিছু বায়ানাক্কা থাকবেই। এখন হয়তো আমার আর সেসব সইবে না।
তুমি তা হলে কুমারীই থেকে যাবে?
দুর বোকা! আমি যে হিন্দুমতে সধবা। বর তো দিব্যি বেঁচেবর্তে আছে। আবছা করে হলেও এখনও রোজ সিঁদুর পরি। বামুনের মেয়ে তো, তাই এখনও ওসব ঘুচিয়ে দিতে পারিনি। যদিও সত্যি বলতে শাঁখা-সিঁদুরের মহিমা কিছু আছে বলে মনেই হয় না আমার। সব ভণ্ডামি।
তুমি কিন্তু বেশ লিবারেটেড উওম্যান। সেইজন্যই তোমাকে আমার এত ভাল লাগে।
দুর মুখপুড়ি! পেটে বিদ্যে নেই, মাথায় বুদ্ধি নেই, গতরে খেটে খাই, আমাকে নিয়ে অত বড় বড় কথা বলতে আছে?
বুদ্ধি না থাকলে কি ব্যবসা করতে পারতে? অ্যান্ড ইউ আর আর্নিং এ লট নাউ।
ওরে চুপ চুপ! জোরে বলিসনি। বেশি রোজগার করি শুনলে চারদিকে চোখ টাটাবে। তবে আমার বুদ্ধি বলতে ওইটুকুই, লোকের পছন্দমতো জিনিস বানাও আর টাকা কামাও। ঠাকুরের দয়ায় টাকা কিছু হয়েছে। তোর বিয়েতে তোকে একটা নেকলেস দেব, দেখিস।
যাঃ, বিয়ে কে করবে?
তবে কি পিসির মতো লক্ষ্মীছাড়া জীবন কাটাবি? ও কথা ভাবা ভাল নয়। বরং অল্প বয়সে একটা সুন্দর ভাল ছেলেকে বিয়ে করে ফেল, সুখে থাকবি।
আমার কারও সঙ্গে বনিবনা হবে না পিসি। আমি একটু অদ্ভুত আছি তো।
কে বলল তুই অদ্ভুত?
সবাই বলে। আমার মা-বাবা অবধি।
তোর যেটুকু অদ্ভুত সেটুকুই ভাল। পাঁচজনের মতো গড়পড়তা হয়ে লাভ কী?
তুমি আমার সব কিছুই ভাল দেখ, না?
সন্ধ্যা ম্লান হাসল। তারপর ধরা গলায় বলল, তোর ওপর আমার কেন যে এত মায়া! কে জানে, আর জন্মে বোধহয় আমার মেয়ে ছিলি।
এই কথাটা অনেকক্ষণ রিনরিন করল সোহাগের কানে। অনেকক্ষণ। পিসির হাহাকার, একাকিত্ব, ব্যর্থতা যেন ওই কথার মধ্যে ঘন হয়ে আছে।
বিকেলে পান্না তাকে বলল, তোমাকে বেশ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে।
হাসল সোহাগ, এখানে এলেই আমি ভাল থাকি।
কিন্তু এটা তো একটা ধ্যাধধেড়ে গোবিন্দপুর। ম্যাগো, কী আছে বলো তো এখানে! আমার তো কলকাতায় চলে যেতে ইচ্ছে করে খুব।
আমার ঠিক উলটো। আমার তো কোনও দেশ ছিল না, জানো তো! কোনটা আমার দেশ, দেশ মানে কী তা বুঝতামই না। এক সময়ে আমেরিকা খুব ভাল লাগত। তারপর ফের একটা ভ্যাকুয়াম। মেট্রোপলিটান সিটিগুলো তো কারও দেশ হতে পারে না। তাই কলকাতা কখনও আমার দেশ হয়নি।
আহা, এটা তো তোমার দেশই। কিন্তু আমাদের গ্রামটায় কী আছে বলো!
ওটা একটা ডিসকভারির ব্যাপার। তোমাকে আবিষ্কার করতে হবে।
কীভাবে?
তা জানি না। আমি শুধু জানি, ফিল করি, এটা আমার জায়গা।
বড় বড় চোখে পান্না বলে, করো?
সোহাগ একটু লাজুক হেসে বলে, এখন করি।
বাবা, এই ভুতুড়ে গাঁ ছেড়ে আমি বরং একটা জমজমাট শহরে চলে যেতে চাই, যেখানে অনেক আলো, অনেক লোকজন, অনেক হইচই।
ভূত যদি থেকেই থাকে তা হলে তাদের মধ্যে তো আমার অ্যানসেস্টররাও থাকবে। তাদের সঙ্গে দেখা হওয়া তো ভীষণ রোমান্টিক।
ওরে বাবা! এখন দাদু এসে সামনে দাঁড়ালে যে আমার হার্টফেল হয়ে যাবে।
দাদু এসে সামনে দাঁড়াল না, পান্নারও হার্টফেল হল না। কিন্তু এই সময়ে দরজায় এসে যে লম্বা ছিপছিপে লোকটি দাঁড়াল তাকে দেখে সোহাগের হঠাৎ বুকের মধ্যে ধক ধক শব্দ হচ্ছিল।
লোকটা গম্ভীর মুখে বলল, ওঃ, সরি।
বলেই ফিরে যাচ্ছিল।
পান্না চেঁচিয়ে উঠল, অ্যাই বিজুদা! কী হচ্ছে? এসো বলছি।
বিজু মুখ ফিরিয়ে বলল, তোরা গল্প করছিস কর। আমি বরং একটু কাকিমার ঘরে যাই।
না না, প্লিজ! একটু এসো। একে তো তুমি চেনো বাবা! অত লজ্জা কীসের?
বিজু বলল, লজ্জা-উজ্জা নয়। তোরা গল্প কর না। টু ইজ কম্পানি, থ্রি ইজ ক্রাউড।
আচ্ছা বাবা, আর অ্যাভয়েড করতে হবে না। প্লিজ এসো।
সোহাগ বিছানায় আধশোয়া হয়েছিল। উঠে বলল, না পান্না, এবার আমি যাব। আপনি আসতে পারেন।
পান্না ধৈর্য হারিয়ে বলে ফেলল, উঃ, তোমাদের দুজনের মধ্যে যে সেই থেকে কী হচ্ছে! আমি আর পারি না তোমাদের নিয়ে। একটা শো-ডাউন করে নাও তো। তারপর ভাব করে ফেল।
বিজু হেসে ফেলল। বলল, শো-ডাউন আবার কীসের? কফি খাওয়াবি? তা হলে পাঁচ মিনিট বসে যেতে পারি। আজ যা শীত পড়েছে।
খাওয়াচ্ছি বাবা, কফির সঙ্গে আর কী খাবে?
আর কিছু না। তোদের ঘরে ঢোকাও এক ঝামেলা, জুতো খুলতে হয়।
আর ফাঁড়া কাটতে হবে না। এসো ভিতরে। এই সোহাগ, কফি খাবে তো!
না, আমি এখন যাবো।
প্লিজ একটু বোসো। আমি আসছি।
বলেই পান্না এক লাফে নেমে ছুট দিল রান্নাঘরে।
সোহাগ মাথা নিচু করে ছিল। পুরুষদের সে কখনও লজ্জা পায় না। তার অনাবশ্যক কোনও সংকোচ বা হীনম্মন্যতা নেই। তবু এই মানুষটার চোখে চোখ রাখতে তার একটু সংকোচ হচ্ছিল।
কেমন আছ সোহাগ?
এটা কি একটা প্রশ্ন হল? ভীষণ বোকা-বোকা ওপেনিং। সোহাগ একটু হাসল। তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, বোধহয় ভালই।
বোধহয় কেন?
আমি বুঝতে পারি না কেমন আছি।
ও।
কথা ফুরিয়ে গেল। হয়তো সূক্ষ্ম একটু অপমানও করে ফেলল সোহাগ। তা হোক। অমন বোকা বোকা প্রশ্ন করে কেন?
বসে বসে পা দোলাচ্ছিল সোহাগ। দেয়ালে একটা টিকটিকি একটা পোকার দিকে এগোচ্ছে। ওই যা! পোকাটা উড়ে দূরে গিয়ে বসল। তার কোনও প্রশ্ন নেই।
