পুলিশ তাকে কয়েকদিন ধরে জেরা করেছিল। ওরা মারধর বা ধর্ষণ করেছে কিনা তাকে, সম্মোহিত করেছে কি, কোনও গুপ্তবিদ্যা শিখিয়েছে কিনা, কোনও রাজনৈতিক মতবাদ ঢুকিয়েছে কিনা মাথায়, সন্ত্রাসবাদে দীক্ষা দিয়েছে কিনা, ড্রাগ ধরিয়েছে কিনা ইত্যাদি। সে কিছু গোপন করেনি বটে, কিন্তু মনে মনে চায়নি, ওরা পুলিশের হাতে ধরা পড়ুক। পুলিশ বারবারই বলত, দে আর দি ভুডু পিপল। দে প্র্যাকটিস ব্ল্যাক ম্যাজিক।
ওই ঘটনার পরই তার বাবা আমেরিকা থেকে তল্পিতল্পা গুটোতে লাগল। বলল, আর বিদেশে নয়।
গল্পটা তার মুখে সন্ধ্যা অন্তত দশবার শুনেছে। তবু আবার শোনে, আর চোখ গোল করে অবাক হয়ে চেয়ে থাকে তার মুখের দিকে, ধন্যি তোর সাহস!
না পিসি, সাহসের কাজ তো কিছু করিনি! ওরা তো জোর করে ধরে নিয়ে গিয়েছিল।
না রে মেয়ে, তোর সাহসও আছে। ওরা তোকে এখনও চিঠি দেয় বুঝি?
ই-মেল জিনিসটা কী তা অনেক কষ্টে পিসিকে বুঝিয়েছে সোহাগ। আজকাল ব্যাপারটা অনেকটাই বুঝতে পারে সন্ধ্যা। গাঁয়েগঞ্জেও একটা-দুটো করে কম্পিউটার দেখা দিচ্ছে ইদানীং।
হ্যাঁ তো।
কী লেখে রে?
লেখে, পৃথিবীর যেখানেই তুমি থাকো, তুমি আমাদেরই লোক। চিরকাল তুমি আমাদেরই লোক থাকবে। মনে রেখো আদিম মানুষেরাই ঠিকভাবে বাঁচতে জানত। তারাই টের পেত বেঁচে থাকার গভীর আনন্দ। মানুষদের জড়ো করো, সভ্যতার কৃত্রিমতা থেকে দূরে নিয়ে যাও, বাঁচতে শেখাও এক মুক্ত জীবনে। চারদিকে ছড়িয়ে দাও আমাদের আনন্দের বীজ। তোমাকে আমরা ভুলিনি, তুমিও আমাদের ভুলে যেও না।
হ্যাঁ রে, তোকে ওরা আবারও চুরি করবে না তো! চারদিকে আজকাল নাকি খুব ছেলেধরার উৎপাত। মানুষজনকে হুটহাট তুলে নিয়ে যায়।
না পিসি, ওদের অত ক্ষমতা নেই, তবে কে জানে, আজও আমরা আমেরিকায় থাকলে আমিই হয়তো ওদের খুঁজে বের করতাম।
ওমা! খুঁজে বের করে কী করবি?
সোহাগ সন্ধ্যার করুণ মুখ দেখে হেসে ফেলে। মাথা নেড়ে বলে, মাঝে মাঝে উইকএন্ডে গিয়ে ওদের সঙ্গে একটু অন্য স্বাদের জীবন কাটিয়ে আসতাম।
মাগো! এই যে বলিস ওরা ন্যাংটা হয়ে থাকে, যা-তা খায়।
হ্যাঁ তো৷ ওইটেই তো মজা!
দুর পাগলি! তুই একটা কী রে? ওসব অসভ্যদের কথা একদম ভাববি না। শুনলে আমারই কেমন গা গুলোয়। হ্যাঁ রে, তোর শহর-টহর একদম ভাল লাগে না, না? গাঁ-গঞ্জ, গাছপালা ভাল লাগে?
ঠিক ভাললাগা নয় পিসি, প্যাশন। গাছপালার মধ্যে আমার কখনও ভয় করে না। আমাকে যদি সুন্দরবনের বাঘের জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দাও তাহলেও আমার একটুও ভয় করবে না। আমি মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াব।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সন্ধ্যা বলে, তাহলে তোকে ওরা মন্তরই করেছে।
সোহাগ হেসে বলে, করেছেই তো।
তুই সত্যিই মন্ত্র জানিস?
শব্দগুলো জানি। মুখস্থ হয়ে গেছে। কিন্তু অর্থ জানি না।
মন্ত্র পড়লে কী হয়?
শব্দগুলো উচ্চারণ করতে করতে মাথাটা কেমন ধোঁয়াটে হয়ে যায়। তারপর কেমন যেন শরীরে সাড় থাকে না।
জ্বলজ্বলে চোখে সন্ধ্যা চেয়ে থেকে বলে, আমাকে শেখাবি?
কেন শেখাব না? সত্যি শিখবে?
সন্ধ্যা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে একটু ভাবল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, না বাবা, কী থেকে কী হয়ে যাবে। মাথা গুলিয়ে গেলে আমার ব্যবসা লাটে উঠবে। তখন খাব কী বল? একা মানুষ, কে দেখবে আমাকে! সংসারের তো ভরসা নেই। যতদিন বাবা আছে ততদিনই সংসারের সঙ্গে সম্পর্ক। বাবা চোখ বুজলে ঠিক তাড়িয়ে দেবে।
কেন পিসি, ওভাবে বলছ কেন? বড়মা, জেঠু এরা তো কত ভাল।
সন্ধ্যা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, সে তোদের কাছে ভাল। লোক বুঝে লোকে ভাল হয়, বুঝলি? এখনও তত বড় হোসনি, সংসারের সব প্যাঁচ বাইরে থেকে বুঝতে পারবি না। তার ওপর আমার তো আবার পোড়া কপাল, স্বামীর বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে! শ্বশুরবাড়ি ফেরত মেয়েদের কেউ ভাল চোখে দেখে না। সবাই ভাবে, নিশ্চয়ই চরিত্রের দোষ ছিল, না হলে ঝগড়ুটে বজ্জাত, নইলে গোপন রোগ আছে, না হলে বাঁজা, নইলে তাড়াবে কেন! এদেশে যত দোষ তো মেয়েদের ঘাড়েই চাপে কিনা। এসব এখন বুঝবি না, বড় হলে তখন টের পাবি। সাধে কি আর উদয়াস্ত খেটে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি।
মুখটা করুণ হয়ে গেল সোহাগের। বলল, হ্যাঁ পিসি, তুমি লেখাপড়া করলে না কেন?
সন্ধ্যা হেসে ফেলে বলল, ওরে আমি হলাম অমল রায়ের অপদার্থ বোন। একই মায়ের পেটে জন্মে তোর বাবার কী মাথা! আর আমার মাথায় গোবর। রোজ চেঁচিয়ে পড়া মুখস্থ করেও আকবরের বাবার নাম মনে থাকত না। কী ভাল লাগত জানিস? আজকালকার মেয়েরা শুনলে হাসবে। আমার ভাল লাগত সংসার করতে। মায়ের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে সংসারের যাবতীয় কাজ করতাম। খুব ভাল লাগত। মনে হত নিজের সংসার যখন হবে তখন এমন গুছিয়ে কাজ করব যে, বাড়িতে লক্ষ্মীশ্ৰী ফুটে থাকবে। বেশি আশা করেছিলাম তো, তাই সংসারই হল না আমার।
আচ্ছা পিসি, তুমি তো আবার বিয়ে করতে পারো!
মাথা নেড়ে সন্ধ্যা বলল, না রে পারি না। ভাইঝি হলেও তুই তো আমার বন্ধুর মতোই হয়ে গেছিস। তোকে লুকোব কেন? আমার চেহারাটা তো কারও নজরে পড়ার মতো নয়! তার ওপর বয়সও তো বসে নেই। একজন ঘুরঘুর করে আসে, বিয়ের কথাও বলে। সে আমাদের স্বজাতি বামুন নয়। বাবাকে তার কথা বলেছিলাম। বাবা শুনে চুপ করে অনেকক্ষণ ভেবে বলল, দ্যাখ মা, ট্র্যাডিশন যদি ভাঙতে চাস ভাঙবি। তোর জীবনটা তো স্বাভাবিক নয়। কিন্তু কী জানিস, এক ধাপ নেমে যদি বাঁচতে পারিস তবে নামার একটা অর্থ হয়। ভাল করে ভেবে দ্যাখ, বিয়েটা এখন তোর কতটা প্রয়োজন। যদি তেমন প্রয়োজন না বুঝিস তবে খামোখা ঝঞ্জাট ডেকে আনবি কেন?
