সেই মেয়েটিই একদিন সোহাগকে তুলে নিয়ে যায়। গাড়ি করে সোজা যে জায়গায় তাকে নিয়ে তুলেছিল মেয়েটি সেটা একটা ভোলা, আবরণহীন মাঠ। কিছু আগাছার জঙ্গল আছে। সেখানে স্বল্পবাস বা নগ্ন বিশ-পঁচিশজন মেয়ে আর পুরুষ। কয়েকটা বাচ্চাও ছিল। সকলেরই বড় বড় চুল, নখ, পুরুষদের দাড়ি আর গোঁফ। দু-চারজন সামান্য জামাকাপড় পরলেও সেগুলো ছিল ভীষণ নোংরা আর ছেঁড়া। কেউ সাবানটাবান মাখত না। কাছে একটা বড় ঝিল মতো ছিল, সেখানেই চান করত। টয়লেট ছিল না। সকলেই প্রকাশ্যে মলমূত্র ত্যাগ করত। খোলাখুলি যৌন মিলনও হত সেখানে, বাচ্চাদের সামনেই। শুধু নারী-পুরুষ নয়, মেয়েতে মেয়েতে, ছেলেতে ছেলেতে। ভয়ে, লজ্জায়, ঘেন্নায় সোহাগ হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলত। ওরা কিছু বলত না তাকে। নির্বিকার। খাবার দিত ভুট্টা সেদ্ধ আর গোরুর মাংস, ফল-টল।
তাকে শেখানো হয়েছিল, এরকমভাবে থাকাই হল ন্যাচারাল লিভিং। এই থাকার মধ্যে কোনও কৃত্রিমতা নেই। আদিম কালের মানুষ এভাবেই থাকত এবং তখনই ছিল তারা সবচেয়ে সুখী।
বৃষ্টি বা রোদ কোনওটা থেকেই তারা আত্মরক্ষার চেষ্টা করত না। নির্বিকারভাবে থাকত। সোহাগকে ন্যাংটো করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখত তারা। বলত, ফিল দি আর্থ, দি উইন্ড, দি অ্যাটমোসফিয়ার। জামা কাপড় জুতো আমাদের সঙ্গে জগতের দূরত্ব সূচনা করে। কিছুদিন এইরকম আদিম জীবনযাপন করলে তুমি প্রকৃতিকে অনেক গভীরভাবে বুঝতে পারবে। ভূমিকম্প হবে কিনা, ঝড়-বৃষ্টি হবে কিনা, বন্যা হবে কিনা তা আদিম মানুষ তাদের অত্যাশ্চর্য অনুভূতি দিয়ে টের পেত, যেমন পায় কাঠবেড়ালি, বানর, টিকটিকি বা পিঁপড়ে। যন্ত্রসভ্যতার দাস হয়ে মানুষ সেই ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। পৃথিবীকে অনুভব করার চেষ্টা করো, তোমার সামনে সত্য উদঘাটিত হবে।
কথাগুলো কিছু বুঝতে পারত না সোহাগ। সে হাঁ করে চেয়ে থাকত। কাঁদত, অস্থির হত, ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ত ঘাসের ওপর। তার শরীরে চুলকুনি হচ্ছিল, দাদের মতো চক্কর দেখা দিচ্ছিল চামড়ায়, চুলে জট, দাঁত মাজতে পারত না বলে মুখে বিচ্ছিরি গন্ধ।
সন্ধের পর ক্যাম্পফায়ার। সবাই বিশাল এক বৃত্ত রচনা করে বসত। মাঝখানে আগুন জ্বলছে। দুর্বোধ্য জঙ্গলের ভাষায় সবাই মিলে কী বলে যাচ্ছে কে জানে। জেনি নামে একটি মেয়ে হঠাৎ উঠে দাঁড়য়ে বিড়বিড় করে মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে ঘুরে ঘুরে শুরু করত নাচ। তার নগ্ন শরীরে আগুনের কাঁপা কাঁপা আলো। বিভোর হয়ে তালহীন ছন্দহীন ঢেউ-ঢেউ একটা নাচে তার শরীর টলতে টলতে ঘুরতে থাকত। ঘুরতে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ ছিটকে পড়ত ঘাসের ওপর। কেউ দৌড়ে যেত না, ধরে তুলত না। নির্বিকারভাবে তাদের সুরহীন মন্ত্র বলে যেতে থাকত।
জেনি বলত তার ট্রান্স হয়। তার মানে বোঝেনি সোহাগ। জেনি তার দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে থেকে একদিন বলল, তোমাকে দেখে মনে হয় তোমারও হবে। মহান প্রেত যার তার ওপর ভর করে না।
জেনিই শেখাল সোহাগকে তার অদ্ভুত মন্ত্র, নাচ। মিথ্যে বলবে না সোহাগ, ওই অদ্ভুত মানুষদের মধ্যে যে কয়দিন ছিল তার মধ্যে ওই একটা জিনিসই ভাল লেগেছিল তার। অর্থহীন অদ্ভুত সব শব্দ বলতে বলতে ঘুরে ঘুরে নাচ। নাচতে নাচতে হঠাৎ মাথা অন্ধকার করে পড়ে যাওয়া। ওরা বলত ট্রান্স। হতে পারে সোহাগ তখন অপুষ্টিজনিত কারণে দুর্বল বলেই তার মাথা অন্ধকার হয়ে যেত। শুধু শরীর কেন, কেঁদে কেঁদে তার মনটাও তো তখন দুর্বল।
কতদিন তাকে ওই জীবনযাপন করতে হবে বুঝতে পারত না সে। শুধু ভয় পেত, সে জংলি হয়ে যাচ্ছে, অসভ্য বর্বর হয়ে যাচ্ছে, ডাইনি হয়ে যাচ্ছে। নিজের গায়ের চিমসে গন্ধে তার নিজেরই বমি পেত। গা চুলকোতে গেলে বড় নখের কোলে উঠে আসত কালো ময়লা। ওই ভূমিখণ্ডের চারপাশে ছিল র্যাটল সাপ আর কাঁকড়াবিছের আস্তানা। প্রায়ই একটা দুটো সাপ দেখা যেত। ঘাসের ওপর চিড়বিড় করে হেঁটে বেড়াত বিছে। ওরা মারত না। কিন্তু ভয়ে রাতে ঘুমোতে পারত না সে। ঘুমোতে পারত না খোলা আকাশের নীচের ঠান্ডায়। বৃষ্টি হলে তো আরও দুর্দশা।
কতদিন কেটেছিল কে জানে। হিসেব নেই। তারপর একদিন সকালে হঠাৎ একটা হেলিকপ্টার এল। চক্কর দিতে লাগল তাদের মাথার ওপরে। দলের আধবুড়ো একটা লোক আকাশের দিকে চেয়ে বলল, দ্যাট চপার ইজ ব্যাড নিউজ, দে আর লুকিং ফর দ্যাট কিড। ওকে ফেরত দিয়ে এসো, নইলে পুলিশ আমাদের ছিঁড়ে খাবে।
যে মেয়েটি নিয়ে গিয়েছিল তাকে সে-ই দুপুরবেলা গাড়ি করে তাকে তার বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে উধাও হয়ে গেল।
পুরনো অভ্যস্ত জীবনে ফিরে এল সোহাগ। ফিরল, আবার ঠিক ফিরলও না। তার অস্তিত্বের একটা খণ্ড যেন রয়ে গেল ওই উন্মার্গগামী, আধপাগলা, যাযাবর মানুষগুলোর সঙ্গে, যারা পুলিশ তাড়া করলেই নিজেদের অস্থায়ী আস্তানা ছেড়ে ভাগ ভাগ হয়ে পালিয়ে যায়। ফের সংকেতমতো জড়ো হয়ে যায় কোথাও কোনও লক্ষ্মীছাড়া জায়গায়। হয়তো একটা ভুল জীবনই যাপন করে তারা, কিন্তু অবস্থান করে প্রকৃতির খুব কাছাকাছি। খাওয়ার কষ্ট, শীত-গ্রীষ্মের কষ্ট, পোকামাকড় বা মশার কামড়, রোগ ভোগ সব সহ্য করেও একটা আনন্দও কি পায়?
সোহাগ ফিরে এল বটে, কিন্তু সেই সোহাগ নয়। মাত্র কয়েকদিনের এই অদ্ভুত জীবন তাকে বয়ঃসন্ধিতেই যেন সাবালিকা করে দিয়েছিল। ছেলেবেলাটাই যেন হারিয়ে গেল তার। একটু গম্ভীর, একটু বিষণ্ণ, একটু অন্তর্মুখী। ওই বন্ধুর পতিত উষর ভূখণ্ডে, আদিম জীবনযাপনের স্মৃতি সুখকর ছিল না মোটেই। তবু ফিরে আসার পর সে কখনও কখনও একটা আকর্ষণও অনুভব করত ওই জীবনের প্রতি। কেন, কে জানে!
