পান্না হাঁ করে শুনছে। তার দুটো হাত শক্ত মুঠি পাকিয়ে আছে। সোহাগকে তার জোয়ান অফ আর্ক বা ঝানসির রানির চেয়ে কম বলে মনে হচ্ছে না।
পরে দাদুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এরকম হয় কি না। দাদু বলেছিল, হতেই পারে। তবে দাদুর ওরকম কোনও অভিজ্ঞতা নেই।
কাউকে দেখতে পেলে না?
না। হয়তো দেখার জন্য আরও কিছু প্র্যাকটিসের দরকার হয়। আমার তো তা নেই।
বিজুদাকে তোমার গল্পটা বলো তো। বিজুদা না কিছু বিশ্বাস করতে চায় না।
তোমার বিজুদা তো একজন হিরো। হিরোরা সহজে হার মানতে চায় না।
বিজুদার ওপর তোমার খুব রাগ, তাই না?
না তো! তবে হিরোদের আমি খুব একটা পছন্দ করি না।
আহা, বিজুদার কী দোষ বলল। তোমার পিছনে বদমাশ ছেলেরা লেগেছিল দেখে আমিই বিজুদাকে বলে দিই। তাই বিজুদা ওদের একটু শাসন করেছিল। আগ বাড়িয়ে তো কিছু করেনি। দোষ তো আমার।
সোহাগ মুখ টিপে হেসে বলে, তুমি বিজুদাকে খুব ভালবাসো, না?
ওঃ, ইয়েস। বিজুদা ইজ এ নাইস নাইস নাইস ম্যান। একদিন ভাল করে আলাপ করলেই বুঝতে পারবে। ওর ঘরে একটা চড়াইপাখি মরে গেল বলে কী মন খারাপ! দুদিন দাড়ি কামায়নি। একটা চড়াইপাখির জন্য কে এত ভাবে বলো!
ওকে! লেট আস লিভ বিজুদা অ্যালোন। জানো তো, এখন থেকে আমরা প্রত্যেক উইকএন্ডে গ্রামে বেড়াতে আসব বলে ঠিক হয়েছে!
ওমা! তাই? আর তোমার মা বাবার সেই ব্যাপারটা?
একটা সেটেলমেন্ট হয়েছে। দে আর নাউ স্লিপিং ইন সেম বেড। পরে কী হবে বলা যায় না। কিন্তু এখনকার মতো ধামাচাপা।
তাই তোমায় আজ ব্রাইট দেখাচ্ছে।
কাঁধ ঝাঁকিয়ে সোহাগ বলে, হবে হয়তো। বড়রা যখন ঝগড়া করে তখন আমার খুব ইম্মাচিওর মনে হয়। কেন ঝগড়া হয় বলো তো!
আমার মা-বাবার মধ্যেও মাঝে মাঝে ঝগড়া হয়। তবে বাবা একদম ঝগড়া করতে পারে না। না খেয়ে বেরিয়ে যায়।
দুজনে খুব হাসল।
এই এত বইখাতা ছড়িয়ে কী করছিলে এতক্ষণ!
পড়ছিলাম। সামনে পরীক্ষা না!
এ মা! তা হলে তো আমি এসে তোমাকে ডিস্টার্ব করলাম।
তুমি এসে আমাকে বাঁচিয়েছ। এ বাড়িতে কী হচ্ছে জানো না তো! সাংঘাতিক কাণ্ড! ভয়ে আমি দিনরাত কাঁটা হয়ে আছি।
মাই গড! কী বলো তো?
আমাদের একজন নতুন রান্নার লোক রাখা হয়েছে। সুদর্শন। লোকটা না নানারকম তন্তরমন্তর জানে। নিশুতরাতে নাকি ভূত নামায়। আর তখন এ-বাড়ির আনাচে কানাচে গিজগিজ করে ভূত।
চোখ গোল গোল করে শুনছিল সোহাগ। বলল, তোমরা ভূত দেখেছ বুঝি?
পাগল! দেখলেই আমি অক্কা পাবো ভয়ে। কিন্তু অনেকে দেখেছে। তারা নাকি বোঁটকা গন্ধও পেয়েছে।
ভূতের কি গন্ধ থাকে?
সবাই তো তাই বলে।
লোকটা ফ্রড নয় তো?
না বাবা, লোকটা তুকতাক জানে ঠিকই। কিন্তু স্বীকার করে না।
সোহাগ ঠাট্টা করল না, হেসে উড়িয়ে দিল না। বরং গম্ভীর মুখ করে বলল, আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবে? আমি ওর কাছ থেকে শিখতে চাই।
তোমার ভাই দুর্জয় সাহস। আমি তো মাকে বলেছি লোকটাকে তাড়িয়ে দিতে।
না, তাড়িও না। এরকম লোক খুঁজলে পাওয়াই যাবে না আর। ডাকো তো লোকটাকে!
কিন্তু সুদর্শনকে ডেকে পাওয়া গেল না। বোধহয় দোকানপাটে গেছে, কিংবা আড্ডা মারছে কোথাও।
.
৫৫.
এতদিন তার কোনও স্বদেশ ছিল না। স্বদেশের বোধও ছিল না। থাকার কথাও নয়। ছেলেবেলায় বাবার সঙ্গে এক দেশ থেকে আর এক দেশে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে তাকে। কখনও ফরাসি, কখনও জার্মান, কখনও ইংরিজি ভাষা বলতে শিখেছে। দুই ভাই-বোন বুঝতেই পারত না কোনটা তাদের আসল ভাষা। হ্যাঁ, ঠিক বটে, তাদের মা-বাবা নিজেদের মধ্যে অনেক সময়েই বাংলা বলত। বিশেষ করে ঝগড়ার সময়। সেই ভাষা তারা অল্প-অল্প বুঝতে পারত বটে, কিন্তু মা বা বাবা তাদের বাংলা শেখানোর চেষ্টাই করত না কখনও। যখন আমেরিকায় সোহাগ স্কুলে ভর্তি হল তখন আমেরিকান ইংরিজি হল তার মাতৃভাষার মতো। আর তখন আমেরিকাকেই তার স্বদেশ বলে মনে হত। দিস ইজ মাই কান্ট্রি কতবার একথা মাকে বলেছে সে। সে বুঝতে পারত তার মা বাবা ঠিকঠাক ইংরিজিটা বলতে পারে না, হোঁচট খায়। বিশেষ করে মা। একদিন সে মাকে বলেছিল, তোমরা এত খারাপ ইংরিজি বলো কেন? মা বলল, আমরা তো তোর মতো আমেরিকান হয়ে যাইনি। আমরা বাপু ভেতো বাঙালিই আছি।
দ্বন্দ্বের শুরু সেখানেও, বুঝতে পারত, সে আমেরিকান হলেও তার মা-বাবা তা নয়। বেশ কিছুদিন এদেশে থাকার পরেও তার মা বা বাবা আমেরিকার অনেক কিছুই বুঝতে পারত না। যেমন জ্যাজ বা রক, যেমন রেয়ার স্টেক বা যৌন ব্যবহার। দুই ভাই-বোনের সঙ্গে মা-বাবার একটা ব্যবধান রচিত হচ্ছিল ধীরে ধীরে। যেন তীরের নোঙর ছেড়ে নৌকো চলে যাচ্ছে মাঝদরিয়ার দিকে।
এতদিনে আমেরিকাই দুই ভাই-বোনের দেশ হয়ে যেত পুরোপুরি। হল না। তার কারণ একটা অদ্ভুত ঘটনা। একটি কালো মেয়ে আসত তাদের বাড়িতে মাঝে মাঝে। আগে যে ছিল তার মায়ের ডোমেস্টিক হেলপ। সাদা কথায় ঝি। মোনার শরীর খারাপ ছিল বলেই রাখা হয়েছিল তাকে। গাড়ি করে আসত, ঘণ্টা দুয়েক অসুরের মতো খেটে কাজকর্ম করে ঘরদোর পরিষ্কার আর ফিটফাট সাজিয়ে রেখে চলে যেত। একদিন তার মা বাবা হিসেব করে দেখল মেয়েটার জন্য প্রচুর ডলার বেরিয়ে যাচ্ছে। মোনা বলল, ওকে ছাড়িয়ে দাও। আমি কাজ করতে পারব। ছাড়িয়ে দেওয়ার পরও যে আসত সোহাগের আকর্ষণে, সবাই ভেবেছিল হয়তো মায়া পড়ে গেছে, তাই আসে।
