পান্না কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, ওসব বোলো না তো, ভাল লাগে না। মরবে কেন? একদম মরতে পারবে না বলে দিচ্ছি। আজ থেকে কেউ তোমরা আর মরবে না বলে রাখলাম। এখন থেকে সব্বার মরা বারণ।
হেসে পান্নাকে বুকে টেনে নিয়ে বলাকা বলে, ভূতের ভয়ে সবাইকে অমর করে দিলি বুঝি! তা হলে যে বুড়ো বুড়িতে দুনিয়া ভরে যাবে। খুনখুনে থুথুরে বুড়োবুড়ি চারদিকে থিকথিক করবে সেই বুঝি ভাল?
সে আমি জানি না। আজ থেকে সকলের মরা বন্ধ।
দিনের বেলাটা একরকম কাটিয়ে দিতে পারে পান্না। কিন্তু যেই সন্ধেটি হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে এগিয়ে আসে, আর শীতের কুয়াশা মাঠঘাট থেকে সাদাটে শরীর নিয়ে পাক খেয়ে উঠে আসতে থাকে, আর শকুনের ডানার মতো নেমে আসে অন্ধকার তখনই বুকের ভিতরে ভয় খামচে ধরে তাকে।
এ সময়ে যে কেন লোকে এত সত্যনারায়ণের পুজো করে কে জানে বাবা। আজ বাড়িসুদ্ধ সকলের নেমন্তন্ন ছিল মরণদের বাড়িতে। পান্না যাবে না, তার পরীক্ষার পড়া। বলল, তা হলে তোর গিয়ে কাজ নেই। তুই বরং ঘরে বসে পড়। সুদর্শন আছে, বাসন্তী কাজ করছে, তোর বাবাও এসে পড়বে খন। সন্ধে রাত্তিরে তো আর ভয় নেই।
পান্না স্বীকারও হয়েছিল। কিন্তু কে জানত আজই বাসন্তী কাজ সেরে বেলাবেলি চলে যাবে, বাবার আসতে দেরি হবে এবং সুদর্শনের পাত্তা পাওয়া যাবে না! যখন কপাল খারাপ হয় তখনই এরকম সব ঘটনা ঘটে। সন্ধে ছটা নাগাদ পড়া ছেড়ে উঠে কুঁজো থেকে জল গড়ানোর সময় হঠাৎ সে বাড়ির আঙিনায় সন্দেহজনক নির্জনতাটা টের পেল। বারান্দায় এসে বাসন্তীকে ডাকল। তারপর সুদর্শনকে। কেউ সাড়া দিল না। গোটা বাড়িটা ছমছম করছে। সে একা।
কী করে এখন পান্না! ছুটে গিয়ে পাশের বাড়িতে হাজির হবে? তা হলে বাড়ি খালি পড়ে থাকবে। মা টের পেলে কুরুক্ষেত্র হবে। বাড়ি নির্জন হলেও আশপাশের বাড়ি থেকে অবশ্য লোকজনের গলা পাওয়া যাচ্ছে। পথে লোক চলাচলও আছে। কিন্তু সেটা তো কোনও ভরসা নয়। এ বাড়ির মধ্যে সে একা। অসহায়। চারদিকে প্রকৃতির রসায়নে এক অদ্ভুত বিক্রিয়া ঘটে যাচ্ছে। বাস্তবের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে পরাবাস্তব। দিনের বেলায় যারা ঘুমিয়ে ছিল তারা জেগে উঠছে। উঠে আসছে। আর পুবের আকাশে কুয়াশার মায়াজালে জড়ানো পূর্ণিমার চাঁদ ম্যাজিক লণ্ঠনের মতো দুলতে দুলতে একটু একটু করে ওপরে উঠছে ওই।
কী করবে এখন পান্না! খুব জোরে চেঁচিয়ে উঠবে? কেঁদে ফেলবে? অজ্ঞান হয়ে যাবে?
হাই!
পান্নার হার্ট বন্ধ হয়ে গিয়েছিল নিশ্চয়ই কয়েক সেকেন্ডের জন্য। পাথরের মতো হয়ে গিয়েছিল সে। অবশ্য বেশিক্ষণ নয়।
ভগবান বলে কিছু একটা তো আছেই। কেউ একজন। নইলে কি এমন হয়? উঠোনে আবছা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সোহাগ।
সোহাগকে দেখলে সে খুশি হয় বটে, কিন্তু আজ সে চিৎকার করে যে লাফটা দিল সেটা শুধু খুশির নয়, উল্লাসের। উঠোনে নেমে সে প্রায় জাপটে ধরল সোহাগকে।
উঃ সোহাগ! বাঁচলাম বাবা! শিগগির ঘরে এসো। একা একা আমার যা ভয় করছিল না।
সোহাগ হেসে ঘরে এল। বলল, একা তোমার ভয় করে বুঝি! ইউ ডোন্ট এনজয় লোনলিনেস।
না বাবা, না। একা থাকতে আমার একটুও ভাল লাগে না।
খুব সুন্দর করে হাসল সোহাগ। বলল, লোনলিনেস-এর মতো এত ভাল আর কী আছে বলে তো! আমার তো একা থাকতেই সবচেয়ে বেশি ভাল লাগে।
তোমার ভাই ভীষণ সাহস। মাঝরাতে উঠে একা একা মাঠেঘাটে ঘুরে বেড়াও। আমি তো ভয়েই মরে যাব।
তোমার খুব ভূতের ভয়, তাই না?
ভূত তো আছেই। পাগল, মাতাল, বদমাশ আমার যে কত ভয়। সবচেয়ে বেশি ভূত।
আমার তো ভূতকে ভীষণ পছন্দ।
মাগো! মরেই যাব। ভূ
ত হল হিস্টরি। আমি যখন মাঝরাতে একা একা ঘুরে বেড়াই তখন আমার সবসময়ে মনে হয়, আমার চারপাশে ওরা সব রয়েছে। হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ। আজ অবধি যারা জন্মেছে এবং মরে। গেছে তারা সবাই। খুব বন্ধুর মতো লাগে তাদের। তারা আশেপাশেই আছে, কিন্তু ডিস্টার্ব করে না, শুধু সঙ্গে থাকে। আমি খুব ফিল করি তাদের। অনেক সময়ে তাদের সঙ্গে কমিউনিকেট করার চেষ্টাও করি।
করো?
হ্যাঁ তো।
কথা বলে তোমার সঙ্গে?
কী জানি? হয়তো বলে। ঠিক বুঝতে পারি না। একদিন মার সঙ্গে খুব ঝগড়া হয়েছিল। রাগ করে রাতে বেরিয়ে গিয়ে আমাদের বাড়ির পাশের বাঁশঝাড়টা পেরিয়ে একটা মাঠের মতো উদোম জায়গায় অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিলাম। সেদিন আমার কেমন যেন একটা আনক্যানি ফিলিং হয়েছিল। খুব মনে হচ্ছিল আমার কাছ ঘেঁবেই কে যেন বসে আছে।
ও মা গো!
ভয়ের কী বলল। পৃথিবীতে তো কত কী আছে আনএক্সপ্লেইনড, আনএক্সপ্লোরড।
চেঁচাওনি?
না। আমার কেমন একটা ঘোরের মতো অবস্থা হল। আমি তখন ফিসফিস করে কথা বলতে শুরু করলাম। জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কে? কী চাও? তুমি কীরকম একজিস্টেন্স? তুমি কি আমাকে দেখতে পাচ্ছ?
কী বলল?
প্রথমে কিছু নয়। তারপর হঠাৎ আমিও একটা হুইসপার শুনতে শুরু করলাম। সামওয়ান ওয়াজ টেলিং মি সামথিং। কিন্তু স্পষ্ট নয়। অস্পষ্ট, স্ট্যাটিকের আওয়াজের মতো। মনে হল যে কথা বলছে সে একটা মেয়ে। কথাগুলো বোঝা যাচ্ছে না ঠিকই কিন্তু যেন খুব জরুরি গলায় বলে যাচ্ছে। মেয়েটা আমাকে কিছু বলতে চাইছে। আমি বুঝতে পারছি না। তখন খুব দুঃখ হচ্ছিল আমার। ওদের ল্যাংগুয়েজ কে আমাকে শেখাবে বলো।
