সুদর্শন কড়াইশুঁটি দিয়ে একটা নতুন ধরনের ধোঁকার ডালনা রান্না করেছে। রান্নার সময়ে গন্ধে বাড়ি মাত হয়ে যাচ্ছিল। মা একটা টিফিন কৌটোয় খানিকটা ভরে পান্নার হাতে দিয়ে বলল, যা, তোর বড়মাকে দিয়ে আয়। গতকাল একাদশী গেছে, আজ একটু ভাল-মন্দ পেটে যাক। শুনি, আজকাল খাওয়াতে বড্ড অরুচি হয়েছে দিদির।
বলাকা এই শীতে একটু ক্ষীণ হয়েছেন। গায়ে তেল মাখার অভ্যাস নেই বলে একটু খড়িওঠা ভাব থাকেই। টানের সময় তেল-টেল না মাখলে শরীর একটু শুকোয়। বড় ঘরের মাদুরে বসে দুখুরিকে পাশে নিয়ে একটা অ্যাটলাস খুলে আফ্রিকার ম্যাপ দেখছে দুজনে।
ও বড়মা!
তাকে দেখে বড়মার চোখেমুখে যে আনন্দটা ছড়িয়ে পড়ে সেটা বড় ভাল লাগে পান্নার। জ্যাঠামশাই যে কী একাকিত্বের মধ্যে বড়মাকে ফেলে গেছে সেটা পান্না খুব টের পায়। বাড়িটা এত বড় বলেই যেন বড়মার নিঃসঙ্গতাটা বড় বেশি চোখে লাগে। কয়েকজন কাজের লোক ছাড়া ওই দুখুরিই শুধু বড়মার ছায়া হয়ে ঘোরে। দুখুরির বাবা মেয়ের বিয়ে দিয়ে টাকা কামাবে বলে তক্কে তক্কে ছিল। বড়মা অনেক টাকা দিয়ে দুখুরিকে একরকম কিনেই নিয়েছে। বাঙালি এসে মাঝে মাঝে তবু বলে, মেয়ের বারো তেরো বছরে বিয়ে না দিলে দেশে তার খুব বদনাম হবে। বড়মা বলেছে, তোর আবার বদনাম কী রে মুখপোড়া? কোন গুণের মানুষ তুই? আর দুখুরি আবার তোর দেহাতের মেয়ে হল কবে? ওকে আমি বড় করেছি, আমিই বিয়ে দেব। মেয়ে ভাঙিয়ে পয়সা রোজগারের ধান্ধা করবি তো তোকে গাঁ-ছাড়া করে ছাড়ব।
বাঙালি সেটা জানে। তাই আজকাল ঘাঁটায় না। তবে ধানাইপানাই করে মাঝে মাঝে দশ-বিশ টাকা আদায় করে নিয়ে যায়। স্পষ্টই ব্ল্যাকমেল, তবে বড়মা দেয়। শত হলেও বাপ তো।
আয়, আয়, দুদিন আসিসনি কেন রে?
পড়ছিলাম। সামনে পরীক্ষা।
আজকাল ছেলেপুলেদের সারা বছর যে কীসের এত পরীক্ষা থাকে তা বুঝি না বাবা। এই একরত্তি দুখুরিরও শুনি ফি মাসে পরীক্ষা লেগেই আছে। এর পর বই জলে গুলে খাওয়াবে। হাতে ওটা কী রে?
মা পাঠিয়েছে। ধোঁকার ডালনা।
বলাকা হেসে বলে, সুদর্শনের রান্না তো! বড় ভাল রান্নার হাত ছেলেটার।
একটু অভিমান করে পান্না বলে, ছাই ভাল, ও মোটেই নিজে রাঁধে না।
বলাকা অবাক হয়ে বলে, ও রাঁধে না? তা হলে কে রাঁধে?
সেসব আমি বলতে পারব না। গভীর ষড়যন্ত্র আছে।
বলাকা একটু চেয়ে থেকে বলে, ভেঙে বলবি তো মুখপুড়ি! কোনও অনাচার হয়ে থাকলে ও জিনিস তো আমি খাব না। শুনেছিলুম তো সে খুব আচারবিচার মেনে চলে। আগে নিরিমিয্যি বেঁধে আলাদা উনুনে আলাদা কড়াইতে মাছ রাঁধে। সেসব শুনেই তো ওর রান্না খেয়েছি কদিন, কী হয়েছে বল তো!
শুনলে তোমার বিশ্বাস হবে না। বলে কী লাভ?
ওরে, অনাচারের কথা লুকোতে নেই। পাপ হয়। আমি শুদ্ধাচারে থাকি, অনাচার সইবে না।
অনাচার কি না জানি না, তবে ওসব রান্না ওর নিজের বলে আমার বিশ্বাস হয় না। ওসব ওর পোষা ভূতের রান্না।
বলাকা খানিকক্ষণ অবাক হয়ে পান্নার দিকে চেয়ে থেকে মুখে আঁচল তুলে হেসে ফেলে। তারপর বলে, যা, খাওয়ার টেবিলে টিফিনবাটিটা রেখে আমার কাছে এসে বোস একটু।
পান্না তাই করল। বলাকার কাছ ঘেঁষে বসে বলল, তোমার বিশ্বাস হল না তো!
হবে না কেন? খুব বিশ্বাস হয়েছে। তবে ভূতের তো জাত নেই, তাদের রান্না খেলে অনাচার হবে না, কী বলিস?
তুমি ঠাট্টা করছ। ও লোকটা যে ভূত নামায় তুমি বিশ্বাস করো না বুঝি?
কেন বিশ্বাস করব না? যে ভূত নামাতে পারে সে তো মস্ত মানুষ। তাকে রোজ প্রণাম করা উচিত।
ফের ঠাট্টা?
বলাকার সঙ্গে দুখুরিও হাসছিল। বলল, এম্মা, তুমি বুঝি ভূতের ভয় পাও? আমি তো রাতবিরেতে কত কত জায়গায় ঘুরে বেড়াই। একটুও ভয় করে না তো!
তুই তো একটা কিম্ভূত। হ্যাঁ বড়মা, তুমি তো বিশ্বাস করো, না কি? তুমি তো আর বিজুদার মতো নাস্তিক নও।
বিজু কি নাস্তিক নাকি?
ও বাবা, বিজুদা নাস্তিক নয়? বলো কী? ভীষণ নাস্তিক। ভগবান মানে না, ভূতপ্রেত মানে না। আমাকে কী বলেছে জানো? ভূতের ভয় পেলে রামনাম না করে কার্ল মার্ক্সের নাম করতে। ওর মুখে কিছু আটকায় না।
ও ওইরকম সব বলে। সেদিন তো দেখলুম শ্যামল দত্তর বাড়িতে দিব্যি নারায়ণ পুজো করে এল। নাস্তিক বলে মনে হল না তো! শ্যামলদের বাড়িতে যার পুজো করার কথা ছিল সেই পুরুতঠাকুরের ম্যালেরিয়া হওয়ায় বিজুকে ধরে এনেছিল।
সে তো আমাদের বাড়িতেও কতবার করেছে। ও তো বলে দক্ষিণা পাই বলে পুজো করি, ভক্তি টক্তি থেকে তো করি না। বোকা লোকেরা ভগবানের নামে গাঁটগচ্চা দিতে চাইলে আমার কী করার আছে! ও বড়মা, বলো না, তুমি তো ভূতে বিশ্বাস করো। ৩৮৬
ওমা, তা করব না কেন?
তা হলে ভয় পাও না কেন বলো তো!
তা তারা তাদের মতো আছে, ভয় পাওয়ার কী হল? এই তুই আছিস, আমি আছি, গাছপালা, পাখিপক্ষী, গোরু ছাগল যেমন আছে তেমনই তারাও আছে। ভয়ের তো কিছু নেই।
আহা, যদি দেখা দেয় তখন?
অত ভাগ্য কি করে এসেছি রে! তোর জ্যাঠা চলে যাওয়ার পর কি কম চেষ্টা করেছি তাকে একবার চোখের দেখা দেখবার! কত নিশুত রাতে জেগে বসে থেকেছি একা ঘরে। কত ডেকেছি তাকে মনে মনে।
বাবা গো! শুনেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
হ্যাঁ রে, আমি মরলে আমাকে কি তোর দেখতে ইচ্ছে করবে না?
