তাহলে তো ভালই। সেঁটে আসবখন।
তাকে দেখেই পান্না এক গাল হাসল, বাব্বাঃ, যা কাজের লোক হয়েছ তুমি! আজকাল টিকিরই নাগাল পাওয়া যায় না।
তোর মতো বসে খেলে আমার চলবে? মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোজগার করতে হয়।
ইস! আমি পড়াশুনো করি না বুঝি! দাঁড়াও না, পাস করেই চাকরি করতে লেগে যাব। পারুলদিকে বলে রেখেছি। ওদের কোম্পানিতেই ঢুকে যাব।
দুর! ও তো মিস্তিরির কাজ। তুই পারবি?
না না, ওদের অফিস ওয়ার্কারও লাগে। এ-গাঁয়ে আমি আর থাকছি না বাবা।
কেন, গাঁ আবার কী দোষ করল?
পান্নার মুখ থেকে হাসি উবে গেল। বড় বড় চোখ করে বলল, জানো না বুঝি? আমাদের নতুন রান্নার লোক সুদর্শন রোজ ভূত নামায়।
বিজু হেসে বলল, তুইও তো একটা ভূত।
যাঃ, বাজে কথা বোলো না। রোজ রাতের বেলা সবাই ঘুমোলে ও নাকি মন্তর পড়ে ভূতেদের নামিয়ে আনে। তখন সারা বাড়ি বোঁটকা গন্ধে ভরে যায়। বাসন্তী, হিমি সবাই গন্ধ পেয়েছে।
বটে!
ভয়ে আমি মরে যাচ্ছি বাবা।
.
৫৪.
ভূত, ভূত, আর ভূত! দুনিয়াতে এত ভূত থাকলে তার চলবে কী করে? কেন যে এত ভূত-টুত চারদিকে আছে বাবা! ভগবান যে কেন ভূতের সৃষ্টি করল কে জানে! পান্নার কান্না পায়। যত নষ্টের গোড়া ওই সুদর্শন। ভূত জিনিসটাকে মাঝে মাঝে দিব্যি ভুলে থাকত পান্না। ওই সুদর্শন এসেই আবার ভূতের তাণ্ডব শুরু করেছে, সবাই বলে রোজ নাকি মাঝরাতে ও ভূত নামায়। মরতে তাদেরই বাড়িতে এসে জুটেছে বিটকেল সোকটা। নিশুতরাতে নাকি এ-বাড়িতে থিকথিক করে তারা। শোনার পর থেকে। দিনরাত রাম নাম করছে পান্না। তবু কি ভয় যায়?
বিজুদা বলেছে, পান্না, তুই কমিউনিস্ট হয়ে যা, তা হলে আর ভূতের ভয় বলে কিছু থাকবে না।
যাঃ, কী যে বলো। কমিউনিস্টের সঙ্গে আবার ভূতের কী?
ওই তো মজা। মানুষ যেমন ভূতকে ভয় পায়, তেমনই ভূত আবার কমিউনিস্টদের ভয় পায়।
দুর! সবসময়ে ঠাট্টা ভাল লাগে না। রাতে আজকাল লেপ চাপা দিয়েও ঘুমোতে পারি না, জানো? বাঁ ধারে হীরা, ডান ধারে মা শোয়, দুজনের মাঝখানে মাথা অবধি লেপ ঢাকা দিয়ে শুয়েও মনে হয়, ওই বুঝি ভূতের হাসি শুনতে পাচ্ছি।
তোর পক্ষে সবচেয়ে ভাল জায়গা কী জানিস? হয় হাসপাতালের কোয়ার্টার, না হয় শ্মশানের ধারে বাড়ি।
ও বাবা গো! তা হলে আমি মরেই যাব।
দুর বোকা! হাসপাতাল বা শ্মশানে কখনও ভূতের উপদ্রবের কথা শুনেছিস? খোঁজ নিলেই দেখতে পাবি কোনও হাসপাতালে একটাও ভূত নেই। কোনও শ্মশানে ভূতের টিকিরও নাগাল পাবি না। কেন জানিস? ও দু জায়গায় এত ভূত যে ভূতে ভূতক্ষয় হয়ে যায়।
তোমাকে বলেছে?
আরে আমি তো একসময়ে ভূতের সন্ধানে ঘুরে বেড়াতাম, জানিস না?
সেটা অবশ্য জানে পান্না। বিজুদার দুর্জয় সাহস। ভূত বলে যে কিছু নেই সেটা প্রমাণ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। তখন সত্যিই শ্মশান আর কবরখানায় রাতবিরেতে ঘুরে বেড়িয়েছে অনেক।
অত সাহস কিন্তু ভাল নয়, বুঝলে।
কেন, তোর ভূতেরা কি তাতে চটিতং হবে নাকি? তা হোক না হয়ে আমার ঘাড় মটকাতে আসুক না। আমি তো সেটাই চাই। সুদর্শন ভূত নামায় শুনে ওকে গতকাল চেপে ধরেছিলুম, বুজরুকির আর জায়গা পাওনি? দেখাও তো তোমার ভূত! শুনে ও তো আকাশ থেকে পড়ল। বলল, জন্মে ভূতপ্রেতের কারবার করিনি বাবু। কে যে ওসব গাঁজাখুরি কথা রটায়! ব্রাহ্মণসন্তান জপতপ একটু-আধটু করি বটে, কিন্তু ওসব তান্ত্রিক কারবারে নেই।
আমাদের কাছেও স্বীকার করতে চায় না। কিন্তু সবাই জানে ও ভূতপ্রেত নামাতে পারে। ওকে না তাড়ালে আমি আর এ-বাড়িতে থাকতে পারব না।
এ-বাড়িতে তোর আর থাকার দরকারটাই বা কী? ভাল দেখে একটা কমিউনিস্ট পাত্রকে বিয়ে করে সটকে পড়। কাকাকে বলছি কাগজে বিজ্ঞাপন দিতে। তাতে লেখা থাকবে, সুন্দরী, শিক্ষিতা সপ্তদশী ভূতভীতা পাত্রীর জন্য অনধিক ত্রিশ ব্রাহ্মণ অকাশ্যপ, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বা সরকারি অফিসার এবং কট্টর কমিউনিস্ট পাত্র চাই। হ্যাঁ রে, কমিউনিস্টও তো আবার নানা রকম আছে। তোর কোনটা পছন্দ? সি পি আই, সি পি এম না নকশাল? নকশালের ঝাঁঝ বেশি, ওদের ধারেকাছে ভূত ঘেঁষবে না। নকশালই লিখে দিতে বলি কাকাকে?
পান্না ফিক করে হেসে বলল, ছেলেবেলার মতো আবার চিমটি কাটব কিন্তু। আমি মরছি নিজের জ্বালায়, উনি এলেন ঠাট্টা করতে।
ভাল কথা বললে তো শুনবি না। তা হলে একটা তুক শিখিয়ে দিচ্ছি। যখন ভূতের ভয় পাবি তখন রামনাম না করে কার্ল মার্ক্স কার্ল মার্ক্স করিস, দেখবি তাতে অনেক বেশি কাজ হবে।
কমিউনিস্টরা ভীষণ বাজে লোক হয়।
কী করে বুঝলি?
তোমাকে দেখে।
আহা, আমি আর সাচ্চা কমিউনিস্ট হতে পারলাম কী? একটা ক্যারিকেচার হয়ে রইলাম। সাচ্চা কমিউনিস্ট তো দেখিসনি।
আর দেখে কাজও নেই।
ভূতপ্রেত নামাক আর যাই করুক সুদর্শনের রান্না কিন্তু ফার্স্ট ক্লাস। বুঝলি, কাল একটা পালংচচ্চড়ি রান্না করেছিল, ওরকম ভাল রান্না জম্মে খাইনি। বোধহয় ভূত-টুত ফোড়ন দিয়েছিল, অর্ডিনারি রান্না নয় কিন্তু।
কথাটা মিথ্যে নয়। সুদর্শনের রান্নার ভূয়সী প্রশংসা পান্না তার খুঁতখুঁতে মায়ের মুখে অবধি শুনতে পায়। শুধু রান্নাই নয়, সুদর্শন খুব পয়পরিষ্কার মানুষ। এই চণ্ড শীতেও সকালে উঠে স্নান এবং জপতপ না করে হেঁশেল ছোঁবে না। মানুষটা লোভী নয়, হাতটান নেই। ফলে সুদর্শনের পাল্লা খুব ভারী। একা পান্না তাকে তাড়ানোর কথা ক্ষীণভাবে বলার চেষ্টা করে বটে, কিন্তু তাতে কোনও ফলোভের আশা সে দেখছে না।
