সকালবেলায় উঠেই সে প্রথম পাখিটার খোঁজ করল। লক্ষ্যহীন, নিয়ন্ত্রণহীন ঘুরপাক খেতে খেতে পাখিটা দরজার কাছ বরাবর গিয়ে নেতিয়ে কাত হয়ে পড়ে আছে। প্রথমে ভাবল মরেই গেছে বোধহয়। কিন্তু ধরতে যেতেই ফের চিড়িক শব্দ করে তার প্রবল ঘুরপাক শুরু করে দিল। জান আছে বটে পাখিটার।
জল ছিল, ভাতও ছিল একটা প্লেটে। পাখিটাকে ধরে খাওয়ানোর চেষ্টা করল সে। খেল না।
পাখিটাকে ফের তার যান্ত্রিক ঘুরপাকে ছেড়ে দিয়ে বসে রইল সে। মা-পাখিটা অপেক্ষা করছিল বোধহয়। সে সরে বসতেই নেমে এসে বাচ্চার কাছে বসল। কিন্তু মাকে দেখেও বাচ্চাটার ঘুরপাক থামল না। মুখে করে দানা জাতীয় কিছু এনেছিল মা-পাখিটা। কিন্তু খাওয়াতে পারল না।
অসহনীয় চিৎকার সহ্য করতে না পেরে নীচে নেমে গেল বিজু।
মা তাকে দেখেই বলে উঠল, কী হয়েছে রে? মুখটা অমন গম্ভীর কেন?
এমনি। কিছু হয়নি।
শরীর খারাপ নয় তো!
না, না, ওসব ঠিক আছে।
কী যে হয় তার মাঝে মাঝে। দেখে ভয় লাগে বাবা।
চা নয়, সকালে এক গ্লাস গোরুর দুধ খেতে হয় তাকে। ছেলেবেলার অভ্যাস। দুধটা কোনওক্রমে খেয়ে সে বাগানে গিয়ে কিছুক্ষণ উদাস মুখে বসে রইল। পাখিটার যন্ত্রণা তাকে সারা রাত বিঁধেছে। একসময়ে তার মনে হচ্ছিল যন্ত্রণাটা তার শরীরের মধ্যেই হচ্ছে।
অনাত্মীয়, ভিন্ন শ্রেণীভুক্ত, নামগোত্রহীন ওই পাখিটার জন্য এই যে টান এটা অ্যানিম্যাল লাভার্সদেরও থাকে। কত লোক রাস্তার কুকুরের জন্য আশ্রয় বানিয়েছে। ওটা বড় কথা নয়। সে আজ বাগানে শীতের রোদ ও ছায়ায় ঘুরতে ঘুরতে আর একটা মহৎ ব্যাপার অনুভব করছিল। সমস্ত পৃথিবী, বিশ্বজগৎ, মহাজগৎ জুড়ে একটা সিস্টেম রয়েছে। তার সঙ্গে সে, ওই চড়াইপাখি, মোতি এবং সবাই ও সব কিছু বাঁধা। কেউ একা নয়, বিচ্ছিন্ন নয়। সব কিছুই সব কিছুর সঙ্গে এক সূক্ষ্ম মাকুর কারসাজিতে পরস্পরের সঙ্গে যোগ হয়ে আছে। ধর্মে এরকমই এক মহা সম্পর্কের কথা বলা হয় বটে। সেটা গাঁজাখুরি হতেও পারে। কিন্তু সম্পর্কও যে একটা আছে–যা মায়া, মোহ, ভালবাসা বা যাই হোক– তাও তো মিথ্যে নয়।
ঘণ্টাখানেক বাদে তার ঘর ঝটপাট দিতে এল কাজের মেয়ে। বিজুর সামনে মেঝের ওপর তখনও পাখিটা অবিরাম চক্কর খাচ্ছে। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। পাখিটা দুপায়ে উঠে দাঁড়াতে পারছে না, উড়তে পারছে না, শুধু আছাড়ি-পিছাড়ি খেয়ে চক্রাকারে ঘুরে যাচ্ছে। যন্ত্রণাটা চোখে দেখা যায় না।
কাজের মেয়েটা ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠল, ও কী গো! ওটা কী মেঝের ওপর?
বিজু ধমক দিয়ে বলল, চেঁচানোর কী হল তোর! ওটা একটা চড়াইপাখি। জখম হয়েছে। কিছু করতে পারিস?
ফের পাখায় ধাক্কা খেয়েছে বুঝি?
আমি কি পাগল যে শীতকালে পাখা চালাব! পাখা চালিয়ে একটাকে তো তুই-ই মেরেছিলি।
আহা, আমার কী দোষ বলো। পাখিগুলো অমন আহাম্মক হলে আমি কী করব?
এটার জন্য কিছু করতে পারিস?
মেয়েটা পাখিটাকে দুহাতের আঁজলায় তুলে নিয়ে বলল, ওর তো হয়ে গেছে। ঘাড় ভাঙলে কেউ বাঁচে?
ঘাড়ই ভেঙেছে বলছিস?
তাই তো মনে হচ্ছে। মাথা সোজা করতে পারছে না যে। ফেলে দিই গে?
না না। ওই ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটের মধ্যে আপাতত রেখে দিয়ে তুই ঘরটা ঝাঁটপাট দে। তারপর দেখা যাবে।
তোমাদের বাড়িভর্তি বেড়াল ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটা হুলোও রোজ আনাগোনা করে। এটাকে রাখতে পারবে?
দেখা যাক।
রাখা যাবে না সে জানে। বেড়ালে না নিলেও খাদ্য-পানীয় ছাড়া পাখিটা এমনিতেও মরবে। ধীর মৃত্যু। সেটা প্রত্যক্ষ করতে হবে তাকে। বিজু ব্যাপারটা সইতে পারছে না।
কিছু খাওয়ানোর চেষ্টা করবি। ওই যে দুটো কৌটোর ঢাকনায় জল আর ভাত রয়েছে। দেখ না চেষ্টা করে।
মেয়েটা কিছুক্ষণ চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিয়ে বলল, না এ খাচ্ছে না যে। কুশি বাচ্চা এরা কি নিজে খেতে পারে? মায়ের ঠোঁট থেকে খায়।
বিজু সেটা জানে। তাই সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
কোর্টে গিয়েও তার আজ অন্যমনস্কতা কাটল না। তবে অনেকটা সহজ হল। বুকটা হালকাই লাগছিল। কিন্তু যে-ই সন্ধেবেলায় চেম্বারের পর মোটরবাইকের মুখ বাড়ির দিকে ঘোরাল তখনই সে অলক্ষ্য থেকে সেই প্রাণান্তকর আর্তনাদ অগ্রিম শুনতে পাচ্ছিল। মেঝেময় লাট খেয়ে বোঁ বোঁ করে ঘুরছে ভাঙা শরীরের এক পাখি।
মার্সি কিলিং! বাড়ি ফিরে কি পাখিটার যন্ত্রণার অবসান ঘটাতে মেরে ফেলবে ওকে? না, তা পেরে উঠবে না সে।
রাতে ঘরে খুব সাবধানে ঢুকল সে। আলো জ্বালল। ঘরে কোনও শব্দ নেই। মরে গেল নাকি পাখিটা? নিচু হয়ে মেঝের ওপর খুব ক্ষীণ রক্তের দাগ আর আঁশের মতো একটু পালক দেখতে পেল সে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বাইরের দিকের জানালার পাল্লাটা খোলা। মার্সি কিলিং-এর কাজটা হয় মোতি, না হয় আগন্তুক কোনও হুলোই করে গেছে। আপাতত শান্তি। কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধান তো নয়। এ-ঘরে যতদিন চড়াইয়ের সংসার থাকবে ততদিন এই ঘটনা বারবার ঘটবে।
জামাকাপড় পালটে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল বিজু। আজ আর পড়াশুনো করতে ইচ্ছে হল না। মোটে আটটা বাজে।
মা রান্নাঘর থেকে জিজ্ঞেস করল, আবার কোথায় চললি?
দেখি, একটু আড্ডা মেরে আসি।
রাত করিস না।
আরে না। কাকার বাড়ি যাচ্ছি।
তবেই হয়েছে। ওরা ঠিক রাতের খাবার খাইয়ে দেবে। শুনেছি পিঠেপায়েস হয়েছে ও-বাড়িতে।
