গাঁয়ের বাড়িতে মক্কেল আসবে না বলে পুজোর পরই বর্ধমানে জি টি রোডের ওপর দোতলায় একখানা ঘর ভাড়া নিয়ে চেম্বার খুলেছে বিজু। কোর্টের পর সেখানেই বসে আজকাল।
সেদিন জনা চারেক লোক ছিল চেম্বারে। মামলামোকদ্দমার ব্যাপার নয়, এরা এমনিই গল্পসল্প করতে আসে। দু-একজনের কেস করেছে বিজু। পাখিটা মরে যাওয়ায় মনটা সেদিন ভাল ছিল না। সে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা চড়াইপাখিদের লাইফ স্টাইল সম্পর্কে আপনারা কেউ কিছু জানেন? আমার একটা সমস্যা হয়েছে। ঘরে চড়াইপাখি বাসা করেছে। কিন্তু মাঝে মাঝে চড়াইয়ের বাচ্চা পড়ে যায়।
একজন আঁতকে উঠে বলল, চড়াইপাখি! ও তো নুইসেন্স মশাই। তাড়িয়ে দিন! তাড়িয়ে দিন! বাসা ভেঙে আঁটাপেটা করে তাড়ান। অতি অসভ্য পাখি। ঘরদোর নোংরা করবে। কোনও কাজের পাখি তত নয়। রাধাকৃষ্ণ বলবে না, দেখতেও হতকুচ্ছিত, পোষ মানাতেও পারবেন না। এক্ষুনি বিদেয় করুন।
ননীবাবু মৃদু একটু প্রতিবাদ করে বললেন, না না, ওরকম করাটা ঠিক হবে না। চড়াইপাখি বাসা করাটা নাকি সুলক্ষণ। সেই বাড়িতে লক্ষ্মীশ্রী থাকে। মা-ঠাকুমার কাছে তাই তো শুনেছি।
বিজু মাথা নেড়ে বলে, আমি ওসব কুসংস্কার মানি না। আমার প্রবলেমটা হচ্ছে হিউম্যানেটেরিয়ান গ্রাউন্ডে।
চড়াই-বিরোধী লোকটা বলে, চড়াইপাখির সঙ্গে আবার হিউম্যানিটি কী মশাই? তাও যদি বুঝতুম যে চড়াইয়ের মাংস খাওয়া যায়। তাও যখন নয় তখন ওদের জন্য হিউম্যানিটি দেখানোর কোনও মানে হয় না। দুনিয়ার নিয়ম কী জানেন? ভাল ভাল জীবজন্তুগুলো সব এক্সটিংট হয়ে যায়, আর নিঘিন্নে, বাজে, ফালতু, নোংরা স্পেসিসগুলো সংখ্যায় বাড়ে। ডোডো পাখি এক্সটিংট না হয়ে চড়াই হলে কী ক্ষতি ছিল বলুন তো!
চড়াইপ্রেমী ননীবাবু এ কথায় ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, যার হিউম্যান ফিলিংস আছে সে সব জীবজন্তুর প্রতিই সিমপ্যাথি ফিল করে। আর চড়াই মোটেই কোনও ভিলেন পাখি নয়। হাত থেকে রসগোল্লা ছো মেরে নেয় না বা ঠোক্কর মারে না। ছোট, নিরীহ একটা পাখির ওপর আপনার যে কেন এত আক্রোশ!
আক্রোশ-টাক্রোশ নয় মশাই। শুধু বলছি চড়াই এক উৎপাত। এদেশে এত গাছগাছালি আছে তাতে গিয়ে বাসা করে থাক না বাপু। মানুষের ঘরদোরে এসে ছিষ্টিনাশ করার স্বভাব কেন? কই, আর কোনও পাখি তো এমনধারা করে না।
বিজু মৃদু হেসে বলল, তাহলে চড়াই সম্পর্কে আপনারা তেমন কিছু বলতে পারলেন না। আমি একজন চড়াই-বিশেষজ্ঞ খুঁজছি।
চড়াইবিরোধী লোকটা বলল, লোকের আর খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই মশাই যে চড়াইয়ের ঠিকুজি কুষ্টি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করবে।
ননীবাবু বললেন, না না, আছে। আমার এক শালা আছে পাখি-টাখি পোষে। সে বোধহয় বলতে পারবে।
তাকে একবার বলবেন তো আমি একটু দেখা করতে চাই।
বলবখন। সে কাটোয়ায় থাকে। বর্ধমানে এলে–
এর বেশি আর কথা এগোল না।
কিন্তু ঠিক তিনদিন বাদে ফের চড়াই নিয়ে সমস্যায় পড়ল বিজু। একটা বাচ্চা চড়াই পড়ে গেল। ভালরকম চোট পেয়েছে। তীব্র আর্তনাদে ঘর ভরে গেল। সন্ধেবেলা পাখিটাকে হাতে নিয়ে ভাল করে দেখে বিজুর মনে হল, ঘাড় ভেঙে গেছে কিংবা ঘাড়ে ভালরকম চোট হয়েছে।
মেঝেতে ছেড়ে দিলেই পাখিটা যন্ত্রণায় পাখা ঝাপটাতে ঝাপটাতে চরকির মতো পাক খায় আর আর্ত চিৎকার করতে থাকে। হাতে তুলে নিলে চিৎকার বন্ধ হয় বটে, কিন্তু খিচুনির মতো পা টানা দেয়, পাখা ঝাপটানোর চেষ্টা করে। ওর যন্ত্রণাটা বুঝতে পারে বিজু, কিন্তু নিরাময় বা উপশম তো তার জানা নেই। কোনও পক্ষীবিশারদ বা পক্ষীচিকিৎসক হয়তো জানে। সে জানে না। পাখিটাকে নিয়ে অসহায়ের মতো অনেকক্ষণ বসে রইল সে। একটা কৌটোর ঢাকনায় জল নিয়ে মুখের কাছে ধরল। পাখিটা ঠোঁটে একটু জল ছিটকোল বটে, কিন্তু শান্ত হল না। ওকে কি ঘুমের ওষুধ বা পেইনকিলার দেওয়া উচিত? ভেবেই চিন্তাটা কত হাস্যকর তা বুঝতে পারল বিজু। মানুষের ওষুধ খাওয়ালে পাখিটা হয়তো মরেই যাবে।
অনেক রাত অবধি পাখিটাকে হাতে নিয়ে বসে নাস্তিক বিজু ভাবছিল, ঈশ্বর নামক অলীক বস্তুর কাছে ওর প্রাণভিক্ষা করা উচিত কিনা। যুক্তিজালে তার কাছে কোনও ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই ঠিক কথা, কিন্তু মানুষের বস্তুজ্ঞানের সীমানার ওপারটা আজও তো আবছা। ওই আবছায়ায় ঈশ্বর বা ভূতের মতো কেউ নেই তো! থাক বা না থাক, প্রার্থনায় তো দোষ নেই!
না, প্রার্থনা করা উচিত হবে না। সামান্য একটা পাখির জন্য যদি সে নিজের বিশ্বাস ও মত বিসর্জন দেয় তাহলে নিজেকেই তার একদিন ঘেন্না হবে।
নাস্তিক হয়েও দুর্গাপুজো কালীপুজো নিয়ে মাতামাতি করে বলে অনেকে তাকে প্রশ্ন করেছে। সে বলে, দুর্গাপুজো কালীপুজো কোনও ধর্মকর্ম নয় রে। ওটা একটা উৎসব মাত্র। একটা উপলক্ষ করে খানিক ফুর্তি করা।
সারা রাত তো আর পাখি নিয়ে জেগে থাকা যায় না। একসময়ে সে পাখিটাকে মেঝেয় ছেড়ে দিল। পাখিটা অবিরল ঘুরপাক খেতে লাগল যন্ত্রের মতো। সঙ্গে সেই আর্তনাদ।
সারা রাত ভাল করে ঘুমোতে পারল না বিজু। বারবার ঘুম ভেঙে যেতে লাগল। বারবারই মনে হতে লাগল, এত কম জেনে বেঁচে থাকার মানেই হয় না। একটা চড়াইপাখি, নিত্যদিনকার চেনা একটা জীব, তারও ব্যথাবেদনা কমানোর উপায় কেন তার জানা নেই?
