জবাব নেই।
কথা বলছ না কেন? আমি দাদু। ওখান থেকে চলে এসো। ও-জায়গাটা ভাল নয়। মেলা কাঁটাগাছ আছে, কাচের টুকরো আছে, ইট আছে। পড়ে যাবে যে!
মেয়েটা তেমনই বিভোর হয়ে হালকা পরির মতো ঘুরে ঘুরে নেচে বেড়াতে লাগল। মহিম শুনতে পেল, মেয়েটা গুন গুন করে কী যেন বলছেও। গান কি? না, গান নয়, অনেকটা স্তোত্রের মতো কিছু। ভাল শোনা যাচ্ছে না।
মহিম ব্যাপারটার অস্বাভাবিকতা হঠাৎ টের পেল। হয়তো মাথার গণ্ডগোল আছে বা আর কিছু। এভাবে মেয়েটাকে রেখে তো চলে যাওয়া যায় না। অন্ধকার ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে। মেয়েটা নিজের বিপদ বুঝতে পারছে না। নিরস্ত্র, টর্চহীন মহিম রায় রাস্তা ছেড়ে ছোট শুখা নালাটা পার হয়ে জমিতে ঢুকল।
সোহাগ! সোহাগ! আমি দাদু। এই যে–বলতে বলতে এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ খপ করে নৃত্যপর মেয়েটার একটা হাত চেপে ধরল সে। সঙ্গে সঙ্গে একটা অস্ফুট আর্তনাদ করে মেয়েটা আছড়ে পড়ে গেল মাটিতে। ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিয়ে গেল মহিম। এ আবার কী হল? মূর্ছা গেল নাকি?
হাঁটু গেড়ে পাশে বসে মেয়েটাকে একটু নাড়া দিয়ে সে ডাকছিল, সোহাগ! দিদিভাই! কী হয়েছে তোমার?
মেয়েটার গায়ে জবজব করছে ঘাম। গায়ের পোশাক ভিজে সপসপ করছে। শরীরে একটা কাঁপুনিও উঠে আসছে। হঠাৎ অস্ফুট বিড়বিড় করে স্তোত্রপাঠের মতো কী যেন বলে যেতে লাগল মেয়েটা। কিছু বোঝা গেল না।
কী করবে মহিম? ভয়ে তার শরীর হিম হয়ে গেল। এই তল্লাটে লোকজনের যাতায়াত নেই, বাড়িঘরগুলোও একটু দূরে দূরে। উলটোদিকে নির্জন আমবাগান। দৌড়ে গিয়ে লোকজন ডেকে আনা যায় বটে, কিন্তু ততক্ষণ এই নিরালায় মেয়েটা অরক্ষিত থাকবে। কাজটা ঠিক হবে না।
একা নিয়ে যেতে পারবে সে? ঊনআশি বছর বয়সের শরীরে কি আর সেই ক্ষমতা আছে? মেয়েটাও তেমন রোগাপটকা নয়। কিন্তু চেষ্টা তো করতেই হবে। কিছুতেই তো ফেলে যাওয়া যায় না।
দু হাতে পাঁজাকোলা করে যখন সোহাগকে তুলতে যাচ্ছিল মহিম তখনই হঠাৎ এক অলৌকিক ঘটনা ঘটল। অলৌকিক! সম্পূর্ণ অলৌকিক! যখন মেয়েটাকে প্রাণপণে তুলতে চেষ্টা করছে তখনই হঠাৎ তার নিজের ভিতরেই ঘটে গেল সেই অলৌকিক।
হঠাৎ যেমন জলভারনম্র মেঘ থেকে অঝোর বৃষ্টি নেমে আসে ঠিক তেমনই বুকের ভিতরে এক রক্তের কলরোল উঠল। সমস্ত শরীর ভেসে গেল মায়ায়। এ তো তারই প্রাণ থেকে প্রাণ পেয়ে জন্মানো মেয়ে, এ যে তারই রেতঃবাহী, শোণিতবাহী একজন! ওরা মানে না। জানে না বলে মানে না। না মানুক, আজ এই সন্ধ্যায় পরম্পরার এক সূত্রপথ উদঘাটিত করে দিল ওই অলৌকিক অনুভূতি। এ সোহাগ, এ তো সে নিজেই, মহিমাদীপ্ত রায়।
শরীর ভেঙে আসছিল মেয়েটাকে তুলতে। ঊনআশি বছরের শরীর তবু হার মানেনি। ধীরে ধীরে পাঁজাকোলে তুলে নিয়ে একটু টলোমলো পায়ে বন্ধুর জমিটা পা চেপে চেপে পার হয়ে মেটে পথে উঠে এল মহিম। হাঁফ ধরে যাচ্ছে, হাত ভেরে আসছে। পারবে কি?
পারত না। পথে উঠে সোহাগের এলানো শরীরটাকে একটু দাঁড় করাল সে, তারপর নিচু হয়ে ডান কাঁধে পাটকরা চাদরের মতো তুলে নিল সে। তাতে একটু সহজ হল ব্যাপারটা। কিন্তু তবু শরীর দিচ্ছে না। বহুকাল পর গায়ত্রী জপ করতে লাগল মহিম। আর কোনও মন্ত্র তো জানা নেই। গায়ত্রীতে কাজ হবে কি না জানা নেই। অন্তত কিছু একটা চলতে থাকুক ভিতরে। কুলি মজুররাও তো শক্ত কাজের সময় হেঁইও-হেঁইও করে। সেরকমই একটা কিছু ধরা যাক।
পথটুকু পার হতে ঘেমে গেল মহিম। বুকটা যেন ফেটে যেতে চাইছে। এই পরিশ্রম শরীর হয়তো সইবে না। হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হয়ে যেতে পারে। হলে হোক। সারা জীবন কার কোন উপকারে লেগেছে মহিম। আজ এই বাচ্চাটাকে উদ্ধার করে আনতে গিয়ে যদি মরতে হয় তো দুঃখের কিছু নেই।
সন্ধ্যার এক সাপ্লায়ার ছোকরা তার সাইকেলের হ্যান্ডেলে ক্যাম্বিসের ব্যাগে মাল বোঝাই করছিল। মহিম উঠোনে পা দিতেই সে চেঁচিয়ে উঠল, কী হয়েছে জ্যাঠামশাই? দাঁড়ান, দাঁড়ান, আমি ধরছি।
সাইকেল রেখে ছুটে এসেছিল ছেলেটা।
কিন্তু মহিম রায় বারণ করলেন, তুমি ছুঁয়ো না বাছা। এতদূর এনেছি, বাকিটুকুও পারব। তুমি বরং ওর মাকে ডেকে দাও।
নিজের ঘরে এনে বিছানায় সোহাগকে শুইয়ে দিল মহিম। তারপর, চেয়ারে বসে কলকল করে ঘামতে আর কুকুরের মতো হাঁফাতে লাগল। হার্টফেল হওয়ারই কথা। তবু হচ্ছে না এখনও। শরীরটা যন্ত্রণায় অবশ।
খবর পেয়ে দৌড়ে এল মোনা। মোনালিসা না কী যেন নাম বউমার। অমল মোনা বলেই ডাকে। ঘরে ঢুকেই মেয়ের দিকে চেয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল মোনা। দুটো শ্বাস ফেলার সময়টুকু ফাঁক দিয়ে বলল, কী হয়েছে?
পরে শুনো। এখন ওর চোখেমুখে জল দাও। ওই ঘটিতে জল আছে।
মোনার মুখে কোনও উদ্বেগ দেখা দিল না। দেখা দিল চাপা রাগ। চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে গেল, কপালে ভ্রূকুটি, ফর্সা মুখটায় লাল আভা। ঘটিটা তুলে নিয়ে তীব্র আক্রোশে কয়েকটা জলের ঝাপটা মেরে রাগে গনগনে গলায় বলতে লাগল, ইউ আর ডুয়িং দি ভুডু এগেইন, ইউ বিচ… ইউ বিচ… বিচ…
বুকটা শান্ত হচ্ছিল না মহিমের। মস্ত হাঁ করে শ্বাস নিচ্ছিল।
সন্ধ্যা ঘরে ঢুকে এসে তাড়াতাড়ি বাবাকে ধরল, কেমন লাগছে বাবা? ডাক্তার ডাকব?
মহিম মাথা নেড়ে বলল, না। ঠিক হয়ে যাবে।
