কিন্তু বিজু খড়কুটো জড়ো হতে দেখলেই সেগুলো ফেলে দিত। তাতে পাখিরা সাময়িক নিরস্ত হলেও হাল ছাড়েনি কখনও। বারবার চেষ্টা করে গেছে। শেষ অবধি হাল ছেড়েছে বিজুই। ছাদের ঘরে সে একদম একা। মাঝে মাঝে মোতি নামের বেড়ালটা এসে বিজুর বিছানায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করে বটে, কিন্তু বিছানায় বেড়ালের অনুপ্রবেশ একদম পছন্দ করে না বলে বিজু মোতিকে তাড়িয়ে দেয়। মোতির অভ্যাসটা খারাপ করেছে বিজুর মা। আদুরে বেড়ালকে বিছানায় নিয়ে শোয়া তার অভ্যাস। বিজু মাকে অনেক বকেও অভ্যাস ছাড়াতে পারেনি। মোতি তবু মাঝে মাঝেই নির্লজ্জের মতো আসে এবং একবার বিজুর ঘরে সন্তান প্রসবের চেষ্টাও করেছিল। শেষ অবধি মোতির উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। ছানাপোনা নিয়ে সে আজকাল নীচেই থাকে। তবে মাঝে মাঝে এসে গম্ভীরমুখে ঘরে একটু হাঁটাহাঁটি করে যায়। সেটা তার অধিকার প্রতিষ্ঠাও হতে পারে, বিজুর ওপর মায়াও হতে পারে।
যাই হোক, বিজুর ঘরে চড়াই বা বেড়াল কিছুই ছিল না। এখন চড়াইপাখিরা বাসা করেছে। বিজুর প্রতিরোধ একটু একটু করে মায়াবশে ভেঙে যাচ্ছিল। কে না জানে মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু হল এই মায়া। আবার কে না জানে মায়াই হয়তো মানুষের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুও।
কিন্তু চড়াইয়ের বাসা থেকে যে বিজুর আর এক অশান্তি শুরু হবে তা কে জানত? ঘরের সর্বত্র পুরীষ ত্যাগ এবং পালকের ওড়াউড়ি তো আছেই। তা ছাড়া মাঝে মধ্যেই ডিম ভেঙে পড়া এবং চড়াইছানার আকস্মিক পতন হল আর এক দুশ্চিন্তার কারণ। প্রথম যে চড়াইছানাটা পড়ে গিয়েছিল সেটাকে সযত্নে বইয়ের তাকের বাসায় পুনর্বাসিত করার চেষ্টা করেছিল বিজু। কিন্তু চড়াইরা বোধহয় পতিতজনকে আর গ্রহণ করে না। তুলে দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ক্রুদ্ধ চড়াইরা সেটাকে ফের ধাক্কা মেরে ফেলে দিল। বারকয়েক পতনের পর অক্কা পেল সেটা। সদ্য-উড়তে শেখা একটা ছানা কীভাবে যেন জখম হয়ে মেঝেয় পড়ে রইল একদিন। হাঁটতে পারে, কিন্তু উড়তে পারে না। তাকে ধরতে গেলেই খাট বা টেবিলের নীচে পালায়। অবশেষে ধরেও জখমটা ঠিক বুঝতে পারল না বিজু। চড়াইপাখি যে কী খায় তাও তার জানা নেই। অগত্যা খানিকটা চাল এনে ছড়িয়ে দিল মেঝেতে। ছোট বাটিতে জল। দেখা গেল পাখিটা জলে একটু-আধটু মুখ দিলেও চাল খাচ্ছে না। কী যে মুশকিল হল বলার নয়।
মাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, হ্যাঁ মা, চড়াইপাখি কী খায় জান না?
কে জানে বাবা কী খায়। পোকামাকড়ই খায় বোধহয়। কেন, চড়াই পড়েছে নাকি?
হ্যাঁ।
সে তো নীচের ঘরেও কতবার পড়েছে।
সেগুলোর গতি কী হয়েছে?
গতি আর কী হবে। মোতিই মুখে করে নিয়ে গিয়ে ফেলে দিয়ে আসে।
মোতিটা একটা যাচ্ছেতাই তো।
তা ওকে দোষ দিয়ে কী হবে। যার যা স্বভাব। বরং ধানুকে জিজ্ঞেস কর। ওরা আদিবাসী, কাকপক্ষী খুব চেনে।
ধানুর বয়স বছর কুড়ি-বাইশ। কালো, রোগাটে চেহারা। সে চেঁকি, উদুখল আর কাঁচাকুচির জন্য বহাল হয়েছে। বেশি কথা কয় না, নিঃশব্দে কাজ করে।
কুয়োপাড়ে ধানু কাপড় কাঁচছিল। ডাক শুনে উঠে এল।
হ্যাঁ রে ধানু, চড়াইপাখিরা কী খায় জানিস?
কেন গো, চড়াই দিয়ে কী হবে?
বল না।
পোকা খায়, ঘাসের বীজ খায়, ভাতও খায়, ওদের কোনও ঠিক নেই।
আমার ঘরে একটা চড়াইপাখি পড়ে গেছে। বাচ্চা পাখি। কী করব বল তো!
সাদা দাঁত দেখিয়ে হাসল ধানু, বলল, ও কি আর বাঁচবে?
কেন বাঁচবে না?
ওম না পেলে বাঁচে না।
দুর, তুই কিছু জানিস না।
বেশি খেতে দিও না কিন্তু, বেশি খেলে তাড়াতাড়ি মরে যাবে। একটু ভাত দাও। আর জল।
তাই দিল বিজু। অনেকক্ষণ সংকোচের সঙ্গে পালিয়ে থেকে অবশেষে পাখিটা এসে ভাত ঠোকরাতে লাগল। জলও খেল। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল বিজু। কিন্তু এ-ঘরে মোতির আনাগোনা আছে এবং তার আগমন-নিষ্ক্রমণের পথ বন্ধ করা প্রায় অসম্ভব। দরজা বন্ধ রাখলে মোতি জানালা দিয়ে আসবে। জানালা বন্ধ রাখলে পাখিদের যাতায়াত বন্ধ হবে। ঘুলঘুলি আছে বটে, কিন্তু তাতে জাফরি দেওয়া বলে পাখি আসতে পারে না। কী যে মুশকিল হল পাখিটাকে নিয়ে।
মোতির হাতে নয়, পাখিটা দিন তিনেক বাদে মরে গেল। ঝি ঘর ঝাট দিতে এসে টেবিলের তলা থেকে মরা পাখিটাকে বের করল। বিজুর চোখে জল এসে গিয়েছিল ঘাড় লটকানো, চোখ ওলটানো পাখিটাকে দেখে। মায়া যে কী সর্বনেশে জিনিস! দুদিন মন খারাপ রইল তার। একটা পাখিকে বাঁচানোর মতো সামান্য এলেমও তার নেই কেন? এই সীমাবদ্ধ জ্ঞান নিয়ে বেঁচে থাকাটা তো একটা ডিসক্রেডিট।
জ্যাঠা তাকে ওকালতিতে জুতে দিয়ে গিয়েছিল। গৌরহরির প্রায় সব আইনের বই-ই নিয়ে এসেছে সে। গৌরহরির ঘনিষ্ঠ এক উকিলের জুনিয়র হয়ে কিছুদিন কাজ করেছে। এখন দু-একটা মামলা নিজেও করে, অবাক কাণ্ড হল গৌরহরির মক্কেলরা আজকাল তার কাছেই আসতে লেগেছে। এক মক্কেল তাকে বলে ফেলল, মশাই, আমি স্বপ্নে দেখেছি, চাটুজ্যেমশাই বলছেন, ওহে বিজুর কাছে যাও, আমি বিজুর ওপরেই ভর করব।
জ্যাঠামশাই ভর করুন বা না করুন বিজু কথাটার প্রতিবাদ করেনি। মক্কেল আসছে, এটাই বড় কথা। সংখ্যায় তারা বেশি নয়, পাঁচ সাতজন, অন্যরাও লক্ষ রাখছে। হাতযশ দেখলে তারাও এসে জুটবে। নিজের ভবিষৎ জ্যাঠামশাইয়ের কল্যাণে খুব একটা অনুজ্জ্বল দেখছে না বিজু। ওকালতি কাজটা তার ভালও লাগে। কলম পেষার চেয়ে ঢের ভাল। উত্তেজনা আছে, থ্রিল আছে, জয়-পরাজয়ের আনন্দ ও দুঃখ আছে। একঘেয়ে তো নয়।
