পরের পনেরো মিনিট তারা কোনও মনুষ্য ভাষায় কথা কইল না। দুজনের মুখ দিয়ে শুধু অদ্ভুত জান্তব সব শব্দ বেরিয়ে এল। কীভাবে হলঘর থেকে শোওয়ার ঘরের বিছানা অবধি এল তারা তাও স্পষ্ট মনে নেই অমলের।
পনেরো মিনিট পরে তাদের দুজনেই সামান্য হাঁফাচ্ছিল। শিথিল বাহুতে তখনও ধরে আছে পরস্পরকে।
মোনা মৃদু হেসে বলল, শোধ হল?
অমল স্নান একটু হেসে বলল, শোধবোধের দরকার কী?
আমি কেমন?
তুমি! তুমি তো ভালই।
এই বয়সেও আমার শরীরে একটুও ফ্যাট নেই, দেখেছ? দুটো ছেলেমেয়ের মা হওয়া সত্ত্বেও!
দেখেছি। তুমি বোধহয় ব্যায়াম করো।
করি। তুমি আমার কোনও খবর রাখে না।
অমল উঠল। দীর্ঘ দিনের পর স্বামী-স্ত্রীর এই হঠাৎ মিলন যে কোনও সমস্যারই সমাধান করতে পারে না তা সে জানে। শরীরে শরীর মিশিয়ে দিলেই কি দূরত্ব ঘোচে? সাহেবরা বলে লাভ মেকিং। আদিখ্যেতা, মিথ্যাচার। সেক্স হ্যাজ নাথিং টু ডু উইথ লাভ। সাহেব শালারা ওসব বোঝে না। ওদের ভালবাসা বড় বেশি লিঙ্গ-নির্ভর। বউ নিয়ে যেমন লোক-দেখানো আশনাই করে, হনিমুনে যায়, তেমনি টপাটপ খারিজও করে দেয় পরস্পরকে।
মোনা আর তার যা সম্পর্ক তাতে কবেই ডিভোর্স হয়ে যেতে পারত, হয়নি, তারা সাহেবদের মতো নয় বলেই।
পাশাপাশি খাট থেকে পা ঝুলিয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল তারা। নগ্ন, চুপচাপ।
খিদে পায়নি?
না তো! এই তো কফি খেলাম।
খোঁপা বাঁধতে বাঁধতে মোনা বলল, তোমাকে শেভ করতে বলিনি, কেন জানো?
কেন?
দাড়ি আর গোঁফে তোমাকে বেশ ভালই লাগছে। দাড়িটা বরং রাখো, তবে ট্রিম করা দরকার।
অমল মোনার দিকে চেয়ে বলল, আমাকে কি তুমি সত্যিই ডিভোর্স করতে চাও?
মোনা একটু গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, তুমি চাও?
আমি! না তো! আমি চাই না।
কেন চাও না? এ সম্পর্ক টিকিয়ে রেখে কী লাভ?
সেটা ভেবে দেখিনি কখনও। কিন্তু মনে হয় সম্পর্ক ভেঙে দিয়েও তো কোনও লাভ নেই।
মোনা উঠে অলস হাতে হাউস কোটটা তুলে নিয়ে বলল, আমি ডিভোর্স চেয়েছিলাম ঠিকই। উকিলের পরামর্শও নিয়েছিলাম। কাগজপত্র তৈরি হচ্ছিল। একদিন বিকেলে সোহাগ বলল, তুমি বাবাকে ডিভোর্স করতে চাইছ, করো, কিন্তু তোমার কি ধারণা তোমাদের দুজনের সম্পর্ক শুধু তোমাদের দুজনকে নিয়েই? স্বামী আর স্ত্রী? তার মধ্যে কি আমরাও নেই? আমাদের এতকাল একসঙ্গে থাকার অভ্যাস নেই? বিয়ের এত বছর পরও যদি তোমাদের মনে হয় যে ইট ইজ এ ফেইল্ড ম্যারেজ তা হলে তার জন্য তো তোমরাই দায়ি। আর সেজন্য তোমাদের প্রায়শ্চিত্ত করা উচিত। ট্রাই এগেইন টু রিকনস্ট্রাক্ট ইট।
বিস্মিত অমল বলল, সোহাগ!
হ্যাঁ। কথাগুলো আমার কাছে অদ্ভুত শোনাল। তারপর আমি কেবল কদিন ধরে ভেবেছি। তাই তো! স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা তো শুধু তাদের দুজনের নয়। তাদের জড়িয়ে আরও কত কিছু গড়ে ওঠে। সবসময়ে যে ভালবাসা থাকবেই তাও তো নয়। থাকে দায়দায়িত্ব, থাকে কর্তব্য, থাকে নির্ভরতা। সংসার গড়ে তোলা কি কম কথা? দাবার খুঁটি হলে না হয় হাটকে আটকে দেওয়া যায়।
অমল চুপ করে মোনার দিকে চেয়ে রইল। এ কথা ঠিক যে, এই ভদ্রমহিলার প্রতি তার তেমন কোনও আকর্ষণ নেই, একে খুশি করার কোনও উদ্যমও নেই তার, একে গভীরভাবে জানার চেষ্টাও সে কখনও করেনি। তবু মোনা যদি চলে যায় তা হলে একটা অদ্ভুত শূন্যতার সৃষ্টি হবে। সেটা বোধহয় তার ভাল লাগবে না।
মোনা ভারী উদাস গলায় বলে, সোহাগের ধারণা আমি চলে গেলে তুমি বেশি দিন বাঁচবে না, একদিন বলছিল, বাবা তোমাকে ভালবাসে কিনা আমি জানি না, কিন্তু তুমি চলে গেলে বাবা ঠিক মরে যাবে। নিজের দেখাশোনা করার মতো শক্তিই বাবার নেই। না খেয়ে-খেয়ে, অযত্নে শেষ হয়ে যাবে লোকটা। নিজের ভাল-মন্দ বাবা তো বুঝতে পারে না।
নিজেকে ভারী বেকুবের মতো লাগছিল অমলের। এরা তাকে নিয়ে ভাবে তা হলে? একটু হলেও ভাবে! সে তো ধরে নিয়েছিল, সে মরে গেলেও এদের তেমন কিছু যাবে আসবে না।
মোনা বিষণ্ণ মুখে বলল, তুমি আমাকে চাও বা না চাও, আমি তবু ওদের মুখ চেয়ে সিদ্ধান্ত বদল করেছি। আরও কিছুদিন দেখা যাক। কী বলো?
হ্যাঁ, মোনা, আরও কিছুদিন দেখা যাক।
কী করব আমরা?
তা তো জানি না। তুমি যা বলবে আমি তাই করতে রাজি।
লক্ষ্মীছেলে হয়ে গেলে নাকি?
না মোনা। লক্ষ্মীছেলে নয়। আমার মাথা বিভ্রান্ত, বুদ্ধি ঘোলাটে, চিন্তা বিক্ষিপ্ত, আমি নিজে কোনও সিদ্ধান্তই নিতে পারি না আজকাল। আমার মনে হয়, কারও ওপর নির্ভর করাটা এখন বড্ড দরকার, কিন্তু কার ওপর করব মোনা? আমার তো কোনও বন্ধু নেই!
আমারও মনে হচ্ছে তুমি ঠিক স্বাভাবিক নেই।
না। আমি স্বাভাবিক নেই।
মোনা তার দিকে নিবিড় স্নিগ্ধ চোখে চেয়ে থেকে হঠাৎ বলল, একটা সত্যি কথা বলব?
বলো।
ঠিক এখনই কিন্তু তোমাকে আমার সবচেয়ে ভাল লাগছে। এত ভাল কখনও লাগেনি।
.
৫৩.
ব্রহ্মচারী মারা যাওয়ার পর বিজু আর তার ঘরে চড়াইপাখিদের বাসা করতে দিত না। খড়কুটো নিয়ে চড়াইপাখিরা তবু চেষ্টা কিছু কম করেনি। তাদের লক্ষ্য ছিল বিজুর ঘরে সিলিং-এর কাছ বরাবর বইয়ের তাক। বইগুলো তেমন কাজের নয়। কিন্তু বিজুর স্বভাব হল সে কখনও তার পুরনো, বাতিল কোনও বই আজ অবধি ফেলে দিতে পারেনি। এমন কী তার স্কুলের পাঠ্য বই-খাতা সে জমিয়ে রেখেছে। সেগুলোই ওই ওপরের তাকে সাজিয়ে রাখা। চড়াইপাখিদের খুবই প্রিয় জায়গা ওটা। নাগালের বাইরে একটু ঘিঞ্জি, ঘুপসি জায়গায় তারা বাসা করতে ভালবাসে।
