দুপুরে কী খাবে?
নতমুখে অমল বলল, যা হয়।
আমি রাঁধতে যাচ্ছি। বাসুদেব চলে যাওয়ায় বাজারহাট হচ্ছে না। ডিপ ফ্রিজে শুধু খানিকটা মাছ আছে।
ব্যগ্র হয়ে অমল বলল, ওতেই হবে। ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই।
আমি রাঁধতেও ভুলে গেছি। তোমার মুখে রুচবে কি না জানি না।
একসময়ে তোমার রান্নাই তো খেতাম। চিন্তার কিছু নেই।
চিন্তার আছে বইকী! রান্না মনের মতো না হলে আবার হয়তো না বলেকয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে।
অমল নতমুখে বসে রইল।
তোমার একটা চাকরি আছে, সেটা ভুলে যাওনি তো! তারা তোমাকে মোটা মাইনে দেয়। সেখানে তোমার বেশ দায়িত্বের কাজ আছে বলেই শুনেছি। তোমার কি ধারণা তারা এরপর থেকে তোমাকে মুখ দেখে মাইনে দেবে?
অমল একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। কথাটা মিথ্যে নয়। তার কোম্পানি তাকে বিরাট অঙ্কের মাইনে দেয়। কিন্তু চাকরি করার জন্য একটা মোটিভেশন দরকার। সেটা কোথায় যে উবে গেছে কে জানে। তার কেবলই মনে হয় তার আর কিছু দেওয়ার নেই। তার বিদ্যা, তার বুদ্ধি, তার উর্বর মস্তিষ্ক কিছুই আর কাজ করে না।
দয়া করে অফিসে একটা ফোন করো। এই ভদ্রতাটুকু তারা আশা করতেই পারে। পরশুদিন তোমাদের এম ডি ফোন করে তোমার হোয়ারঅ্যাবাউটস জানতে চেয়েছিলেন। আমাকে এক গাদা মিথ্যে কথা বলতে হল।
কী বললে?
বললাম ওঁর বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় দেশের বাড়িতে গেছেন। সেই সঙ্গে এও বলতে হল যে, আমরাও গাঁয়ের বাড়িতে গিয়েছিলাম এবং সেখানে ফোন নেই। ইত্যাদি। ভদ্রলোক বলেছে, ফিরে এসে তুমি যেন ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ করো।
ঠিক আছে।
তোমার ভাল-মন্দ তুমি বুঝবে। কিন্তু আমার মনে হয়, তোমার এখন বয়স হচ্ছে। নিত্যনতুন চাকরি করা তোমার পক্ষে কি ভাল হবে? এরা যদি তোমাকে ছাড়িয়ে দেয় তা হলে কী করবে তুমি? আর একটা নতুন চাকরি তো? সেটা যদি কলকাতায় না হয়ে দিল্লি, বোম্বে বা ব্যাঙ্গালোরে হয় তা হলে আবার এখানকার বাস তুলে আমাদের অন্য জায়গায় গিয়ে সেটল করতে হবে।
এই প্রথম অমল মোনার চোখের দিকে সরাসরি চাইল। চেয়ে রইল। কী বলছে মোনা? তার শেষ বাক্যটায় আমাদের শব্দটা ছিল না? তার মানে কি ডিভোর্সের কথা ভুলে গেছে মোনা? সিদ্ধান্ত বদল করেছে? বুকটা ধুকপুক করছিল তার।
অমল আলটপকা বলে উঠল, আচ্ছা আমরা, মানে আমাদের এই পরিবারে কখনও জন্মদিন বা বিবাহবার্ষিকী করিনি, না?
ভীষণ অবাক হয়ে মোনা তার দিকে চেয়ে রইল। তারপর বলল, হঠাৎ এ কথা কেন?
এমনি, মনে হচ্ছিল।
না, ওসব ফর্মাল ব্যাপার আমার ভাল লাগে না। পার্টি-টার্টি আমার কোনওদিনই পছন্দ নয়। তুমিও তো কখনও বলোনি ওসব করতে।
না না, এটা আমার কোনও অভিযোগ নয়। জাস্ট কৌতূহল। অনেকেই ওসব সেলিব্রেট করে কি না তাই।
ভ্রূ কুঁচকে মোনা বলল, সেলিব্রেশনের কী আছে বুঝি না বাবা। একটা বিশেষ তারিখে জন্মানো বা বিশেষ দিনে বিয়ে করা কী এমন একটা আহামরি ব্যাপার যে বছর বছর সেটার জন্য আহ্লাদ করতে হবে!
তা তো ঠিকই।
তোমার কি এখন জন্মদিন বা ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি করতে ইচ্ছে হয়েছে নাকি?
আরে না। ফরগেট ইট।
হঠাৎ এমন এক একটা প্রশ্ন করো যে চিন্তায় ফেলে দাও। তোমার হল কী বলো তো!
কিছু হয়নি।
কেউ নতুন কোনও ফর্মুলা দেয়নি তো!
কীসের ফর্মুলা?
গৃহশান্তির!
না, কেউ এ ব্যাপারে কিছু বলেনি আমাকে।
একবার তো শুনেছিলাম আমার জা তোমাকে একটা ফর্মুলা শিখিয়েছিল।
কী বলো তো!
তোমাকে শেখায়নি বউয়ের সঙ্গে এক বিছানায় শুলে ভাব হয়?
অমল সামান্য লজ্জা পেয়ে বল, ওঃ হ্যাঁ, বউদি গাঁয়ের মেয়ে, তার সেকেলে সব ধারণা।
তাই ভাবছিলাম এই নতুন ফর্মুলাটা আবার কেউ শেখাল কি না।
ফর্মুলা নয়। আজ হঠাৎ তোমার জন্য শাড়িটা কেনার পর মনে হচ্ছিল তোমাকে কোনও অকেশনে কিছু কখনও দিইনি। তখনই ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি আর বার্থ ডে-র কথা মনে হল।
তুমি আমাকে আজ খুব অবাক করে দিয়েছ। তোমার হঠাৎ শাড়ি নিয়ে ঘরে ঢোকার দৃশ্যটা আমার অনেক দিন মনে থাকবে।
অমল কফিটা শেষ করে বলল, শাড়িটা কি পছন্দ হয়নি?
সেটা পরের কথা! শাড়ি নিয়ে আসাটাই তো অভিনব ব্যাপার। কত দাম নিল?
আড়াই হাজার।
গড়িয়াহাটার এই দোকানটা দাম একটু বেশিই নেয়।
তা নিক। এটাই তো প্রথম।
হ্যাঁ। তবে তোমার ভয় নেই। শাড়িটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে।
অমল একটু তৃপ্তির হাসি হাসল।
খুশি হয়েছ?
মোনা হঠাৎ করুণ একটু হেসে বলল, খুশিই তো হওয়ার কথা।
কিছুক্ষণ দুজনে চুপচাপ।
তারপর মোনা বলল, ভাবছি শাড়িটার বদলে তোমাকে এখন আমি কী দিই!
অমল ব্যস্ত হয়ে বলে, আরে না, আমাকে আবার তুমি কি দেবে?
মোনা একটু হেসে বলল, আমি তো আর রোজগার করি না যে নিজের পয়সায় তোমাকে কিছু কিনে দেব। যা দেব তা তো তোমার পয়সাতেই কেনা। সে দেওয়ার কথা তো বলিনি।
তা হলে?
তা ছাড়াও কি কিছু দেওয়ার নেই?
অমল একটু ধন্দে পড়ে বলে, কিছু দিও না মোনা, প্লিজ। শোধবোধ হয়ে গেলে কি দেওয়ার আনন্দ থাকে?
একটা রহস্যময় হাসি হেসে মোনা বলল, থাকতেও পারে।
এত দ্রুত ঘটনাটা ঘটে গেল যে প্রস্তুত হওয়ার সময়ই পেল না অমল। চেয়ার থেকে উঠে হঠাৎ একটা ঝলকের মতো তার ওপর এসে পড়ল মোনা। দুটো হাতে গলা জড়িয়ে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরল। ওই আলিঙ্গনের ধাক্কায় ডাইনিং টেবিলের পলকা চেয়ার উলটে পড়েই যেত অমল। মোনাই পড়তে দিল না তাকে। ধরে রইল।
