অমল জানে, শাড়িটা ওর পছন্দ হবে না। সে তো আর শাড়ি চেনে না। চোখে যেটা লেগেছে সেটাই কিনে এনেছে। মেয়েদের পছন্দ-অপছন্দের খবর সে আর রাখল কই?
কিন্তু তাকে ভীষণ অবাক করে দিয়ে মোনা শাড়িটা নিরীক্ষণের পর বলল, বাঃ, বেশ পছন্দ আছে তো তোমার!
খারাপ হয়নি তো!
নাঃ, খুব আনইউজুয়াল রং। কাজটাও ভারী সুন্দর। কে পছন্দ করে দিল?
কেউ না।
তুমি নিজেই পছন্দ করলে?
হ্যাঁ।
হঠাৎ আমার জন্য শাড়ি কেনার কী হল?
এমনি। মনে হল, তোমাকে তো কখনও কিছু দিই না।
সেটাই তো আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। হঠাৎ ঘটা করে শাড়ি-টাড়ি দিলে কেমন যেন সন্দেহ হয়।
সন্দেহ! সন্দেহ কীসের মোনা?
অতি-ভক্তি চোরের লক্ষণ কিনা।
চোরা মারটা হজম করে নিল অমল। দুজন মুষ্টিযোদ্ধা যখন লড়ে তখন তারা পরস্পরকে মারে এবং পরস্পরের মার হজমও করে। দুটোই দরকার। শুধু মারতে জানলেই হয় না, অম্লান মুখে মার হজমও করতে পারা চাই।
আমি কিছু ভেবে কিনিনি কিন্তু। হঠাৎ ইচ্ছে হল তাই।
নাকি কেউ বুদ্ধি পরামর্শ দিচ্ছে আজকাল!
অমল ভয় পেল। কথা যেভাবে এগোচ্ছে তাতে মোনা তাকে কোণের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। এরকম চললে হয়তো সে কবুল করে ফেলবে যে, নিজের বুদ্ধিতে সে কাজটা করেনি।
আচ্ছা, একটু চা-টা কিছু কি পাওয়া যাবে? খুব ভোরে বেরিয়েছি, গাড়িতে ভীষণ ঠান্ডা লাগছিল।
মোনা তার দিকে সেকেন্ড দুয়েক চেয়ে রইল। মেয়েদের মন, শত শত্রুতা থাকলেও একটা জায়গায় দুর্বল। তারা যে পুরুষের আশ্রয়দাত্রী এটা শেষ অবধি ভুলতে পারে না।
বাইরের জামাকাপড় বদলাও। চা দিচ্ছি।
আমার খুব খিদেও পেয়েছে।
জানি। পাওয়ারই কথা। হাত-মুখ ধুয়ে খাওয়ার টেবিলে বোসো।
তুমি কি বাড়িতে একা? ওরা কই?
দুজনেই স্কুলে গেছে। বাসুদেব তিন দিনের ছুটি নিয়েছে।
ওঃ, তাহলে?
তাহলে কী?
চা-টা করবে কে?
কেন, আমি কি নুলো, না অচ্ছুৎ?
কষ্ট হবে।
বাব্বাঃ, আমার কষ্টের কথা ভেবে তেরাত্তির ঘুম হবে না বোধহয়?
তা নয়।
একা ঘরে আমাকে আবার ভয় হচ্ছে না তো! ঘাড় মটকে দিই যদি!
অমল হাসল। বলল, তোমাকে ভয় কীসের?
তা তো জানি না। চোখমুখ দেখে তো মনে হচ্ছে বাড়িতে আর কেউ নেই জেনে খুব অস্বস্তিতে পড়েছ।
তা পড়েছে অমল। কিন্তু সেটা তার মুখভাবে প্রকাশ পাচ্ছে জেনে তার আরও দুশ্চিন্তা হচ্ছে, সে বোকার মতো বলল, না না, আমি ভীষণ টায়ার্ড।
মোনার দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারছিল না অমল।
তাকে এই অস্বস্তিতে বেশিক্ষণ রাখল না মোনা। হঠাৎ ঝটকা মেরে মুখ ফিরিয়ে রান্নাঘরে চলে গেল।
অমল শোওয়ার ঘরে এসে পোশাক পালটাল। মস্ত আয়নায় তার প্রতিবিম্ব দেখতে পেল হঠাৎ। দাড়ি-গোঁফ এবং বড় চুলে তাকে বনমানুষের মতো দেখাচ্ছে। তবু ভাল। তার চেহারায় এমনিতে কোনও বৈশিষ্ট্য নেই। তার উচ্চতা সাড়ে পাঁচ ফুটের চেয়েও একটু কম। হিল পরে পাশে হাঁটলে মোনাকেও তার চেয়ে লম্বা লাগে। তার গায়ের রং ময়লা না হলেও ফর্সা নয়। মুখশ্রী নয় আকর্ষক। বন্য পুরুষালি আকর্ষণ তার একটুও নেই। দাড়ি-গোঁফ হওয়ায় বরং একটু কৃত্রিম বন্যতা এসেছে। দাড়ি-গোঁফের একটা আরোপিত গাম্ভীর্যও আছে।
কিছুক্ষণ নিজের প্রতিবিম্বের দিকে চেয়ে রইল অমল। হঠাৎ একটা কণ্ঠস্বরে চমকে উঠল সে। কে যেন বলে উঠল, উই আর ইন ট্রাবল। উই আর ইন এ জ্যাম।
কে বলল কথাটা? ঘরে দ্বিতীয় কেউ তো নেই! তাহলে কি সে নিজে?
হ্যাঁ, কথাটা বোধহয় সেই বলেছে। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে অমল। কী আর করা।
একা এই ফ্ল্যাটে সে আর মোনা। যেন বাঘিনী আর তার শিকার। ছেলে-মেয়েরা থাকলে হয়তো কিছু ডাইভারশন থাকত। তারা নেই, ফলে একা অমলের ওপরেই মোনা তার শব্দভেদী বাণগুলো প্রয়োগ করবে। বড্ড ভয়-ভয় করছে তার। একসময়ে যৌবনে মোনার সঙ্গে তার মাঝে মাঝেই তর্ক বা ঝগড়া হয়েছে। তখন মোনাকে তার ভয় হত না। এখন হয়। এখন সে মানসিকভাবে দুর্বল, শারীরিকভাবেও। তার ভিতরে কোনও লড়াই আর অবশিষ্ট নেই। মোনা দয়া করে যদি তাকে বাক্যবাণ থেকে রেহাই দেয়। এই দয়াটুকু সে হাঁটু গেড়ে বসে চাইবে কি?
বাথরুমে হাতমুখ ধুতে গিয়েছিল অমল। কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থেকে ভাবতে লাগল, স্নান করে নেবে কিনা। সিদ্ধান্ত নিতে বেশ সময় লাগে তার আজকাল। খুব সামান্য বিষয় নিয়েও তার মন দুভাগ হয়ে দুরকম মত প্রকাশ করতে থাকে।
বাথরুমের দরজায় একটু শব্দ।
কে?
তোমার হল? কফি ঠান্ডা হয়ে যাবে যে!
ও আচ্ছা।
সে শাওয়ারটা খুলে নীচে দাঁড়িয়ে গেল। বোধহয় আরও কিছু শীতলতাই তার দরকার।
স্নান করে একরকম ভালই লাগছিল তার। শরীরে একটু কাঁপুনি হচ্ছে বটে, কিন্তু বেশ লাগছে।
বেরিয়ে এসে দেখল, খাওয়ার টেবিলে মোনা কফি সাজিয়ে বসে আছে।
পরোটা আর আলুভাজা খাবে?
অমল হ্যাঁ বলবে কিনা ভাবতে লাগল।
আমি বলি এত বেলায় ভারী জলখাবারের দরকার নেই। বরং একবারে ভাত খেও। এখন বিস্কুট দিয়ে কফি খাও। কেমন?
এই আশ্চর্য সদ্ব্যবহারে বিগলিত হয়ে গেল অমল, বলল, সেই ভাল।
তুমি কি স্নান করলে?
হ্যাঁ।
শীতে কাঁপছ৷ তোমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। গিজারে গরম জল তো ছিল, নাওনি?
না। খেয়াল হয়নি।
আজকাল তোমার মন কোথায় থাকে?
কফি একটু চলকে গেল অমলের। নরখাদকদের দুন্দুভি বেজে উঠল নাকি? ঝলসাবে, তারপর ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে, হাড়গোড় চিবোবে।
