গড়িয়াহাটার মোড় থেকে সে জটিল কলকাতার দৃশ্য দেখল খানিক। চট করে বাড়িমুখো হতে পারল না। শাড়িটার জন্যই বাড়ি যেতে একটু লজ্জা হচ্ছে তার। কোনওদিন এভাবে কিছু উপহার দেয়নি মোনাকে। কী বলবে, কী বলতে হয় বা আনুষ্ঠানিকভাবে কী করে উপহার দিতে হয় তা তো অমল জানে না। তাই পা চলছিল না তার। মোন কি বিদ্রূপের হাসি হাসবে? ঘুষ বলে মনে করবে? গ্রহণ করবে, নাকি ছুঁড়ে ফেলে দেবে আক্রোশে, এইসব জরুরি প্রশ্ন ও সমস্যায় ভারী পীড়িত হচ্ছিল সে।
রসিক বাঙালের কথাকে গুরুত্ব দেওয়াটা কি ঠিক হল?
এর পর যা-ই ঘটুক, তার তো হারানোর কিছু নেই। এই ভেবে সে বাড়ির দিকে পা বাড়াল, গড়িয়াহাট থেকে তার বাড়ি হাঁটাপথ। শীতের রোদে কলকাতা এখনই বেশ তেতে উঠেছে। গাঁয়ে শীত অনেক বেশি। রোদ যেন তেজালো হতেই চায় না। অমল খুব আস্তে আস্তেই হাঁটছিল। মনে মনে একটু প্রস্তুতির দরকার, একটু রিহার্সাল। কিন্তু ইদানীং তার মুখে কথাই আসতে চায় না। অনেক অন্যায় অভিযোগেরও যথাযোগ্য জবাব দিতে পারে না সে।
শোওয়ার ঘরে কন্ডোম পাওয়ার পর তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মোনা। তার গূঢ় সন্দেহ, তার অনুপস্থিতিতে অমল অন্য মেয়েমানুষ এনেছিল ফ্ল্যাটে। অমল সেই অভিযোগের জবাবই দিতে পারল না। আজও রহস্যময় সেই ঘটনাটার সমাধান খুঁজে পায়নি। সমাধান খুঁজে বের করার জন্য মাথাও ঘামায়নি সে। নিজেকে কলঙ্কমুক্ত করার কোনও তাগিদ সে আর অনুভব করে না। সে যা আছে তা-ই আছে, ক্রমে ক্রমে অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। এই অস্ত থেকে আর উদয় হওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।
একটি থান-পরা বুড়ি ভিখিরি তার সামনে এসে মুখপানে চেয়ে হঠাৎ বলল, ও তুমি! তুমি তো বাপু দাও না।
বলে বুড়ি পিছু ফিরল। গড়িয়াহাটার প্রায় সব ভিখিরিকেই মুখ চেনে অমল। তবে কস্মিনকালেও সে কাউকে ভিক্ষে দেয় না। ভিক্ষে করা ব্যাপারটাকেই যে ভীষণ অপছন্দ করে।
আজ হঠাৎ মনে হল, এ-দিনটা অন্য রকম হোক। সে ডাকল, ও বুড়ি! ও বুড়ি মা!
বুড়ি একটু অবাক হয়ে ঘুরতেই অমল পকেট থেকে একটা দশ টাকার নোট বের করে বলল, নাও।
বুড়ি বলল, ও বাবা! দশ টাকা!
বুড়িটা একটু ঠ্যাটের মানুষ। আশীর্বাদ-টাশির্বাদ করল না। এরকম ভাল। ভড়ং নেই।
অমল একটু হাসল।
যত বাড়ির কাছাকাছি হচ্ছিল অমল তত অস্বস্তি বাড়ছে। যত নষ্টের গোড়া এই শাড়িটা। এটা না কিনলে অনেক সহজ হত ফেরাটা। কিন্তু যতই যাচ্ছে ততই যেন শাড়িটা বোঝা হয়ে উঠছে। জন্মদিন বা বিবাহবার্ষিকী এসব তাদের নেই। কেন কে জানে প্রথম থেকেই ওসব পালন-টালন করে না তারা। ফলে উপহারের ঝঞ্ঝাটও নেই। পুজো উপলক্ষে কিছু কেনাকাটা করা হয় বটে, কিন্তু সেটা মোনা একাই করে। কেন তারা বিবাহবার্ষিকী বা জন্মদিন পালন করে না সেটাও অমল বলতে পারবে না। কিন্তু অন্যেরা করে এবং অন্যের বিবাহবার্ষিকী বা জন্মদিনে তারা নেমন্তন্নও খেয়েছে।
এমনকী নিজের ছেলেমেয়ের জন্মদিনও পালন করে না মোনা। কথাটা এখন হঠাৎ মনে পড়ায় অমল একটু অবাক হয়। মোন কি একজন সংস্কারমুক্ত মহিলা? তার কি কোনও সেন্টিমেন্ট নেই? এসব প্রশ্ন আগে অমলের মনে আসেনি, আজ এই শাড়ি কেনার সূত্রে এসব অনেক প্রশ্ন মনের তলায় স্থিতাবস্থা থেকে হঠাৎ ভুড়ভুড়ি কেটে উঠে আসছে। মোনাকে হয়তো আর একটু স্টাডি করা উচিত ছিল তার। কাছাকাছি বাস করেও হঠাৎ মোনাকে কেন যে এত অচেনা মনে হচ্ছে।
ফ্ল্যাটবাড়িতে পৌঁছে সে দেখল, গ্যারাজে তার গাড়িটা নিশ্চল পড়ে আছে। গায়ে ধুলোর পুরু আস্তরণ পড়েছে। ড্রাইভারটাকে হয়তো ছাড়িয়ে দিয়েছে মোনা। নইলে সে এসে রোজ গাড়িটা ঝাড়পোঁছ করত।
লিফটে ওপরে উঠতে উঠতে নিজের বোকা-বোকা ভাবটা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করছিল অমল। তাতে আরও বোকা-বোকা লাগতে লাগল নিজেকে।
ডোরবেলের সুইচে হাত দিয়ে আবার একটু দ্বিধা।
তারপর ডোরবেলের মিষ্টি শব্দটা বেজে গেল ভিতরে। ল্যাচ ঘোরানোর শব্দ।
দরজায় মোনা। পরনে হাউসকোট, একটু অবাক চোখ।
দরজাটা ছেড়ে তাকে ভিতরে যেতে দিল মোনা। তারপর দরজাটা প্রায় নিঃশব্দে বন্ধ করে দিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, ওটা কার চাদর গায়ে দিয়ে এসেছ! এটা তো আমাদের চাদর নয়!
চাদরের কথাটা খেয়ালই ছিল না অমলের। মেয়েদের চোখ এড়ানো মুশকিল।
থতমত খেয়ে বলল, রসিকবাবু দিল।
রসিকবাবুটা আবার কে?
গাঁয়ের একজন লোক।
নাক কুঁচকে মোনা বলল, অন্যের চাদর গায়ে দিতে ঘেন্না হল না?
অমল কথাবার্তার এই ঝোঁকটা চালিয়ে যেতে চায়। নইলে সহজ হওয়া যাবে না। মোনার সঙ্গে একমত হয়ে বলল, ঘেন্না করছিল, উনি জোর করে দিলেন।
ওটা খুলে রাখো, কেচে ফেরত দিয়ে দিতে হবে।
অমল সঙ্গে সঙ্গে বাধ্য ছেলের মতো চাদরটা খুলে ফেলল।
শাড়ির বাক্সটা দেখে মোনা অবাক হয়ে বলল, ওটা কী?
অমল খুব কাঁচুমাচু হয়ে বলল, তোমার জন্য।
আমার জন্য!
হ্যাঁ।
আমার জন্য কী?
তোমার জন্য আনলাম।
মোনা কিছুক্ষণ বড় বড় চোখে তার দিকে চেয়ে বলল, কী ওটা?
একটা শাড়ি।
হঠাৎ?
এমনি পছন্দ হয়ে গেল। তাই।
ডিভানের ওপর থেকে বাক্সটা তুলে নিল মোনা। বাঁধন খুলে বাক্সর ঢাকনা তুলে দেখল প্রথমে। তারপর শাড়িটা বের করে আলোয় একটু খুলে দেখে নিয়ে তার দিকে তাকাল।
