যারা মাথার কাম বেশি করে তাগো ক্ষুধা কম।
অমল বলল, না না, আমার তো ভীষণ খিদে পায়।
নাকি? ক্ষুধা পাওন ভাল। আমি তো রাইক্ষসের মতন খাই। বড়ভাই, একখান কথা কমু?
বলুন না।
আপনের পোলাপান কয়টা?
দুটো। এক ছেলে, এক মেয়ে।
দুর মশয়, আপনের মতো মাইনষের পোলাপান যত বেশি হয় ততই ভাল।
কেন?
মগজওলা মাইনষের পোলাপানও মগজওলাই হয়। দুঃখের কথা কী জানেন, আমাগো দ্যাশে ছোটলোকগুলারই পোলাপান বেশি হয়। তাতে লাভ কী কন? দ্যাশে ছোটলোকের সংখ্যা বাড়ে।
রসিকের এইসব বৈপ্লবিক কথাবার্তায় একটু হাসে অমল। তারপর মৃদুস্বরে বলে, আমার মগজ এখন আর কাজ করে না।
চা খেয়ে তারা উঠল। বাস আসছে।
ভারী যত্ন করে তাকে হাত ধরে বাসে তুলল রসিক। সকালের বাস বলে এতটা ফাঁকা। তাকে টিকিটটা অবধি কাটতে দিল না রসিক। বলল, আরে মশয়, টিকিটের দাম আর কয়টা পয়সা, হগ্নলেই দিতে পারে। মাইনষের দাম দেই ক্যামনে?
অমল জোরাজোরি করল না। সেটা পণ্ডশ্রম হবে।
বউয়ের লিগগ্যা কী লইয়া যাইবেন মশয়?
অবাক হয়ে অমল বলে, কিছু নেব না তো!
ওইটাই তো ভুল করেন বড়ভাই।
তাই নাকি? কেন বলুন তো!
মাইয়ালোকে জিনিসপত্র পাইতে ভালবাসে। তাগো কাছে খালি হাতে যাইতে নাই। যা হউক একটু কিছু লইয়া যাইতে হয়।
অমল অবাক হয়ে বলে, ওর জিনিসপত্র সব তো ও-ই কেনে, এমনকী আমার জিনিসপত্রও কেনে। আমি কেনাকাটা পারি না।
রসিক হেসে বলে, আপনেরে লইয়া আর পারুম না মশয়। আমার বউও তো গড়িয়াহাট থিক্যা বড় বাজার ইস্তক টানা মাইরা হাবিজাবি কিন্যা ঘরবাড়ি ছিটাল করতাছে। তবু মশয় আমি তার লিগ্যা কিছু না কিন্যা ঘরে ঢুকি না। যেদিন আর কিছু না পারি এক ঠোঙ্গা চিনাবাদাম কিন্যা লইয়া যাই। খুশি হয়, বোঝলেন! খুশি হয়। জিনিসটা বড় কথা না, আসল হইল অ্যাটেনশন। তারে যে ভুইল্যা যাই না এইটা হইল তার প্রমাণ।
তাই বুঝি?
হ বড়ভাই। পিরিতের সার কথাই হইল লেনদেন। যত লেনদেন তত আঠা। লেনদেন ছাড়া পিরিত হইল বন্ধ্যা। বোঝলেন! যতই মিঠা মিঠা কথা কন না ক্যান, শুকনা লাগব। লগে একখান গোলাপফুল গুইজা দেন, দ্যাখবেন মুখে হাসি ফুটছে।
স্ত্রীর জন্য উপহার কেনা এই ব্যাপারটিকেই অমলের মস্তিষ্কহীনতা বলে মনে হয়। ঘুষ ছাড়া সেটাকে আর কী বলা যায়? জিনিসের উপযোগই বা কতক্ষণ থাকে?
বউ কি কম নাকি বড়ভাই? সাক্ষাৎ ভগবতী। মাঝে মাঝে খাণ্ডারনি হইয়া খাড়য় ঠিকই, কিন্তু তারাই তো বাচ্চা দেয়, সংসার বাইন্ধ্যা রাখে। কী কন? কাইজ্যা করে আবার আগলাইয়াও তো রাখে।
বর্ধমানে পৌঁছে আবার তাকে লজ্জায় ফেলল রসিক। অমলের টিকিটও সেই কেটে ফেলল চট করে।
এটা বড় বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে রসিকবাবু।
দুই-চাইরটা টাকা লইয়া মাথা ঘামাইয়েন না বড়ভাই। বড় বড় জিনিস লইয়া চিন্তা করেন। পাবলিকের কি আপনের লিগ্যা কিছু করনের নাই?
অমল ভদ্রতার লড়াই পারবে না জেনেই আর কথা বাড়াল না।
বেশি ভোরের ট্রেন বলেই ভিড় ছিল না তেমন। কোণের সিটে তাকে ঠেলে বসিয়ে দিয়ে রসিক বলল, এইবার জুইৎ কইরা বইয়া ঠাইস্যা একটা ঘুম দেন। আমিও ট্রেনে উঠলেই ঘুমাই।
কথাটা ভারী পছন্দ হল অমলের। সে খাঁজের মধ্যে মাথা রেখে দিব্যি ঘুমিয়ে পড়ল।
হাওড়ায় যখন নামল তখন সোয়া নটা।
লন, আপনেরে একটা ট্যাক্সিতে উঠাই দিয়া যাই।
আমি ধরতে পারব ট্যাক্সি।
আপনি হজ্ঞলই পারবেন। কিন্তু আমারও তো করন উচিত।
বাবা যেন ছোট ছেলেটিকে আগলে নিয়ে যাচ্ছে এমনভাবেই রসিক তাকে ট্যাক্সিস্ট্যান্ডে নিয়ে এসে বসিয়ে দিল ট্যাক্সিতে। অমল বলল, আপনিও তো বড়বাজারেই যাবেন? চলুন নামিয়ে দিয়ে যাই।
আরে না, আমার তো হাঁটা রাস্তা। একটু মর্নিং ওয়াকও হইয়া যাইব।
অমল আর সাধাসাধি করল না। সে এসব পেরে ওঠে না।
ট্যাক্সি বাড়ির দিকে রওনা হতেই বুকে একটা দুরুদুরু শুরু হল অমলের। সামনেই কি যুদ্ধক্ষেত্র? ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমবেতা যুযুৎসব? কোন ধুন্ধুমার অপেক্ষা করছে তার জন্য? তার মুখের কথা ক্রমে ফুরিয়ে যাচ্ছে। তার মনেও আজকাল কথা আসে না। তার মন কি ধীরে ধীরে বোবা হয়ে যাবে? গেলেই ভাল। গেলেই শান্তি।
বাইরে হিজিবিজি কলকাতা শহর বয়ে যাচ্ছে। সকালের কবোষ্ণ রোদেও বাইরেটাকে বাস্তব মনে হয় না তার।
যেতে যেতে দূরত্ব কমছে। বাঘিনীর গর্জন শোনা যাচ্ছে কি নেপথ্যে? মাটিতে ল্যাজ আছড়ানোর শব্দ? গায়ের গন্ধ? বাতাসে কি বারুদের ঘ্রাণ?
গড়িয়াহাটার কাছে সে চেঁচিয়ে উঠল, থামো! থামো!
তাড়াহুড়ো করে ভাড়া মিটিয়ে নেমে পড়ল সে।
সবে বেলা দশটা। দোকানপাট এখনও খোলেনি। তবু সামনে যে দোকানটা ভোলা পেল তাতেই ঢুকে পড়ল সে। দোকানে এখন ধূপধুনো দেওয়া হচ্ছে। প্রস্তুত নয়। সে শো-কেসে সাজানো শাড়ি দেখতে লাগল। শাড়ির কিছুই বোঝে না সে। কেনেওনি কোনওদিন। তবু দেখতে লাগল।
একটা বাফ রঙের শাড়ির ওপর জমকালো এমব্রয়ডারির কাজটা বেশ পছন্দ হল তার।
এটার দাম কত?
আড়াই হাজার।
অ্যাটাচি কেস খুলে টাকাটা দিয়ে দিল সে।
.
৫২.
শাড়ি কেনাটা একটু নাটকীয় হয়ে গেল নাকি?
তা হোক। তার জীবনে তো কোনও নাটকীয়তা নেই। নিতান্তই ভ্যাতভ্যাতে ঘটনাহীন জীবনযাপন। মদ্যপান ছাড়া নিজের লেভেলকে ছাড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
