রসিককে ধন্যবাদ দেওয়ার কোনও মানেই হয় না, ওসব রসিক বাঙাল বুঝবে না। কিন্তু অমল ভারী কুণ্ঠিত এবং কৃতজ্ঞ বোধ করছিল। এ লোকটার জন্য কখনও সে কিছু করেনি, কখনও করবেও না হয়তো। কিন্তু আজ তার ভারী ইচ্ছে করছে কিছু প্রতিদান দিতে। সেটা কীভাবে দেওয়া সম্ভব তা অবশ্য মাথায় এল না তার। কিন্তু কুষ্ঠাটা রয়ে গেল।
আসোয়ানখান লইয়া যান বড়ভাই। আপনেরে দিলাম। একরকম নূতনই কইতে পারেন। গায়ে দিলে মাঝেমইধ্যে আমাগো কথা মনে পড়ব।
না না, আমার আলোয়নের দরকার নেই। আপনি জোর করে গায়ে দেওয়ালেন বলে দিলাম।
জানি বড়ভাই, আপনের মেলা আছে।
শাল আলোয়ান তো আমার লাগে না।
আইচ্ছা মশয়, কইলকাতায় গিয়া ফিরত দিলেই হইবে। অখন লন একটু গরম চা খাই দুইজনে। বাস আইতে মেলা দেরি।
আলোয়ান গায়ে দিয়ে এখন আরামের চেয়ে অস্বস্তিই বেশি হচ্ছে অমলের। রসিক তাকে একটা সেকেন্ডহ্যান্ড আলোয়ান দান করতে চাইল কেন? সে কি ওর এতটাই করুণার পাত্র? আচ্ছা বেয়াদব তো লোকটা! মন থেকে কৃতজ্ঞতা আর কুণ্ঠার ভাবটা তো উড়ে গেলই, বরং কান গরম হয়ে উঠছিল অপমানে।
আজকাল নিজের বোধ, বুদ্ধি, আবেগের ওপর কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই অমলের। অপমানের বোধটা তীব্র ঝিঁঝি পোকার মতো আওয়াজ করছিল মাথার মধ্যে। সে অসুস্থ হয়ে পড়বে নাকি?
বাসস্ট্যান্ডে চায়ের দোকান কম করেও চার-পাঁচটা। ভোরবেলার যাত্রীরা এই শীতকালে চা খায় বলে সকালেই দোকানে উনুন ধরানো হয়েছে। খদ্দেরও আছে মন্দ নয়।
আহেন মশয়, শীতলের দোকানে বহি। হ্যায় চা-টা খুব ভাল কইরা বানায়।
শীতলের দোকানের বেঞ্চে বসে পড়ল অমল। তার এখন গরম লাগছে। তার এখন ভাল লাগছে না। বসেই চাদরটা খুলে ফেলে পাশে জড়ো করে রাখল সে। রসিক লক্ষ করল না। সে তখন শীতলকে বোঝাচ্ছে, আমার লগে কেডা বইয়া আছে জাননি শীতল? মস্ত মাপের মানুষ। গ্রামের মানুষ তোমরা, এই মানুষের দাম তোমরা কী বুঝবা! অখন ভাল কইরা চা বানাইয়া খাওয়াও তো বাবুরে।
শীতল দাস একটু বিরক্ত হয়ে বলে, কার কথা কইছেন বাবু? এ যে মায়ের কাছে মাসির গপ্পো। অমলকে আমি এত্তটুকুন বেলা থেকে চিনি। ওদের বাড়ির চেলাকাঠ ফেড়ে দিতুম, মহিমকর্তার সঙ্গে মাছ ধরতে বড় ঝিলে গেছি কতবার। অমল তখন কতটুকু? ব্যাঙাচির লেজ খসল এই তো সেদিন। পাস-টাস করে জলপানি পেয়েছিল, বিলেত গেল, এই তো সেদিনের কথা সব। বিয়েতে নেমন্তন্ন খেয়েছিলুম।
বাঙালরা না চেঁচিয়ে কথা কইতে পারে না, তাদের হাসি মানেই অট্টহাসি। রসিকের গলা যেমন বাজখাই, হাসিও তেমন বিকট। সেই হাসিটা হেসে রসিক বলল, খুব চিনছ হে শীতল! আমি কই, বাবুরে ল্যাংটাবেলা থিক্যা তো দেইখ্যা আইতাছ, কিন্তু মানুষটার দাম জাননি? কত বড় বহরের মানুষ হেইটা নি ট্যার পাইছ কোনওদিন? যাউকগা, কথা বাড়াইয়া লাভ নাই। চা-খান একটু প্রেমসে বানাও দেখি।
দুজনের এই ছেলেমানুষি চাপান-উতর শুনতে শুনতে অমলের চিনচিনে অপমানবোধটা উবে গেল। খানিকটা হেঁটে এসেছে বলে শরীরটা গরম হয়েছিল বটে, কিন্তু এখন ভোলামেলা রাস্তার পাশে বসতেই উত্তুরে হাওয়ায় কেঁপে উঠছিল অমল। না, বাঙাল তাকে অপমান করতে চায়নি বোধহয়। আসলে লোকটার আদরের প্রকাশ ওরকমই। কাণ্ডজ্ঞান কম হলেও রসিক লোকটা তেমন খারাপ নয়। এই তো সেদিন তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে বাড়িতে কত যত্ন করল।
আলোয়ানটা ফের গায়ে জড়িয়ে নিল অমল। তার তেমন অপমান লাগছে না আর।
রসিক তার পাশে বসে বলল, বড়ভাই, কিছু মনে কইরেন না, মুখোন শুকনা লাগে ক্যান? কিছু হইছে নাকি?
না, কিছু হয়নি। এমনিই মনটা ভাল নেই।
গ্রামের মাইনষে নানান আকথা-কুকথা কয়।
একটু অবাক হয়ে অমল বলে, কী বলে তারা?
কয় যে আপনের লগে নাকি ওয়াইফের বনে না। মামলা মোকদ্দমার কথাও শুনি! নাকি?
অমল স্নান একটু হেসে বলে, হ্যাঁ।
মাইয়ালোক লইয়া সমস্যা কার নাই মশয়? যত ঝুট-ঝঞ্জাট তো তারাই পাকাইয়া তোলে। তবে কিনা মাইয়ালোক বশ মানলে এক্কেবারে গঙ্গাজল। তারাই তখন বৃষ্টির দিনের ছাতা, শীতের বালাপোশ, গরমের শীতলপাটি। বোঝলেন?
বুঝলাম। তবে আমি তো ওসব পেরে উঠিনি।
ঝঞ্ঝাট কি আমারও কিছু কম গেছে মশয়? মাইরধইরও খাইছি, কিন্তু ডিভোর্স করি নাই। বিয়া করা বউ, তারে ছাড়ুম ক্যান কন? জজসাহেব রায় দিলেই হইব? তা হইলে তো বিষয়সম্পত্তি ছাইড়্যা ল্যাংটা চ্যাংটা হইয়া বিবাগী হইয়া যাইতে হয়। বউও আমার সম্পত্তি, পাজি হউক ব্যাচইল্যা হউক, তারে ছাড়ুম ক্যান?
জোর করে কি রাখা যায়?
আরে মশয়, কথায়ই তো আছে জোর যার মুল্লুক তার। আমি যখন বাসন্তীরে বিয়া করলাম তখন বড়বউ মেলা চিল্লামিল্লি করছিল, উকিলবাড়ি হাঁটাহাঁটিও শুরু করল। আমি তখন কইলাম আমি যদি আরও চাইরটা বিয়াও করি তবু তোমারে ছাড়ুম না। দেখি তুমি কেমনে যাও!
এতটা মস্তিষ্কহীন হওয়া তার পক্ষে সম্ভব কিনা তা একটু ভাবতে গিয়ে হেসে ফেলল অমল। বলল, হা, ওভাবেও হয়তো হয়। গুহামানবদের যুগে হত।
আইজও হয় মশয়। না হইলে আমার দুই সংসার টিক্যা আছে কেমন কইরা। নেন, চা খান। লগে দুইখান মুড়মুড়া বিস্কুট খাইবেন নাকি? টোস্ট বিস্কুট খাইতে কিন্তু আচিমিৎকার।
আচিমিৎকার শব্দটা ভারী নতুন ঠেকল অমলের কানে। বলল, না, কিছু খেতে ইচ্ছে করেছে না। আপনি খান।
