ঠোঁট উলটে অমল বলে, কী জানি। একদিন এসেছিল। গটমট করে অনেক কথা বলে গেল। সবটা বুঝতে পারলাম না।
মহিম মশারি চালি করে তুলে ফেলে বিছানায় বসে ছেলের দিকে চেয়ে বলল, বুড়ো বয়সের এই একটাই কষ্ট। ছেলেপুলেরা কষ্ট পেলে স্বস্তি থাকে না।
আপনার বয়স কত হল বাবা?
আশি।
অনেক বয়স, না?
হ্যাঁ। অনেক বয়স। সামর্থ্য থাকলে বয়সটা সমস্যা নয়। কিন্তু অপটু হয়ে পড়লে বয়স হল ভেজা কম্বল।
আপনার বয়সে আমি কোনওদিন পৌঁছব না। তার অনেক আগেই আমি যেন বুড়ো থুত্থুরে হয়ে গেছি।
তোর মনে শান্তি নেই বলে ওরকম মনে হচ্ছে।
শান্তি নেই কেন, সেটাই তো খুঁজে বেড়াচ্ছি। কী হল আমায় একটু বলুন তো!
মাথা নেড়ে মহিম বলে, সত্যি কথা বললে বলতে হয়, আমি জানি না। তোর জীবনটা তো অন্যরকম। অনেক বেশি জটিল, ঘটনাবহুল। তার ওপর শিক্ষাদীক্ষা, কালচারাল মিক্স-আপ, সেসব আমি কি আর বুঝতে পারব? তবে জানি, তোর ভিতরে অনেক গাদ জমে আছে। নিজের জোরে ঝাঁকি মেরে উঠে দাঁড়াতে পারছিস না। তাই তোর কষ্ট আড়াল থেকে দেখি। কিছু বলতে ভরসা পাই না।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অমল বলে, আমার জন্য কারও কিছু করার নেই।
শুধু একটা কথা বলার আছে। ভেবে দেখতে পারিস।
কী কথা?
ডিভোর্স জিনিসটা ভাল নয়।
হুঁ।
অনেকক্ষণ বসে রইল অমল। বসে বসে ঘুমিয়ে পড়ল ঘাড় কাত করে।
মহিম করুণ চোখে দৃশ্যটা দেখে ফুলের সাজিটা নিয়ে উঠে গেল বাগানে। অনেক সময়েই তার মনে হয় কূপমণ্ডুক হয়ে এই গাঁয়ে জীবনটা কাটিয়ে দেওয়া ঠিক হল না। দুনিয়াটাকে আরও একটু জানার আর বুঝবার দরকার ছিল। মানুষের যে কত রকমের জ্বালাপোড়া আছে তার খতেন নিতে পারলে আজ এই অচিন ছেলের জন্য একটা নিদান দেওয়ার মতো বোধবুদ্ধি গজাত।
ফুল তুলে ঘরে এসে মহিম দেখল, চেয়ার ফাঁকা। অমল চলে গেছে।
না, ছেলেটার জন্য তার কিছু করার নেই। মাঝে মাঝে মনে হয় তার শরীর থেকে জন্মালে কী হয়, এই ছেলে যেন কোন আজব দেশের আজগুবি বাস্তবতার মানুষ, নিজের ছেলে বলে চেনা যায় না, ভারা। যায় না। ভাবটা, ভাষাটা অবধি বুঝে উঠতে পারে না মহিম।
.
অন্ধকার কাটেনি এখনও, তবে আবছায়া একটু ঘোলাটে আলো ক্ষীণ আভায় চারদিকের অন্ধকারকে একটু হালকা করেছে মাত্র। তবে কুয়াশা আছে। চারদিকের গাছপালা থেকে টুপটাপ শব্দে ঝরে পড়ছে হিম।
চণ্ডীমণ্ডপ ঘেঁষে এই রাস্তাটা দিয়েই সবাই বাসস্ট্যান্ডে যায়। পথটা একসময়ে খুব জঙ্গুলে ছিল। বর্ষাকালে জলকাদায় হাঁটাই যেত না। সাপ-খোপ, জোঁক বেরোত যখন-তখন। চণ্ডীমণ্ডপটা ভেঙে পড়েছিল প্রায়। পঞ্চায়েত হওয়ার পর রাস্তা বাঁধানো হয়েছে, চণ্ডীমণ্ডপ তৈরি হয়েছে নতুন করে। খুব আনমনে হলেও গাঁয়ের এইসব উন্নতি লক্ষ করে অমল। তাতে ভাল হয়েছে, না মন্দ, তা অমল বলতে পারবে না।
হঠাৎ খুব কাছ থেকে একটা বাজখাঁই গলার আওয়াজে চমকে উঠল অমল। বুকটা ধড়াস ধড়াস।
আরে! বড়ভাই নাকি? কই চললেন মশয়?
এই কাকভোরের কুয়াশায় আলো বিশেষ ফোটেনি বটে, কিন্তু লোক চেনা যায়। রসিক বাঙালের গায়ে প্রিন্স কোট, মাথায় কান অবধি ঢাকা রাশিয়ান টুপি, গলায় মাফলার।
অমল কাষ্ঠহাসি হেসে বলল, কলকাতা যাচ্ছি।
আহেন, আহেন। লন, একলগেই যাই।
রসিক বাঙালকে তার কিছু খারাপ লাগে না। লোকটার মনের মধ্যে কোনও ঘুরঘুট্টি নেই, গোলোকধাঁধা নেই। লোকটা পয়সা রোজগার করতে ভালবাসে, খরচ করতে ভালবাসে, খেতে আর খাওয়াতে ভালবাসে। অমল একজন বউ নিয়েই হিমসিম খাচ্ছে, আর এই লোকটা দু-দুটো দুরকমের বউ সামাল দিয়ে দিব্যি বহাল তবিয়তে আছে। সে শুনেছে রসিকের একটা বউ বাঙাল, শহুরে এবং খাণ্ডার। অন্য বউটা ঘটি, গেঁয়ো এবং ভিতু। কী করে সামলায় কে জানে। হয়তো এও একটা প্রতিভা কিংবা এ একরকমের মস্তিষ্কহীনতা। সেটা যাই হোক, অমলের তা নেই।
দাড়িদুড়ি ফ্যালান নাই ক্যান মশয়? শোকাতাপা মাইনষের লাহান লাগে!
নিজের গালের খড়খড়ে দাড়িতে একটু হাত বুলিয়ে নিয়ে অমল বলল, ইচ্ছে হয়নি। আজকাল খেয়ালই থাকে না।
গালখান চকচকা থাকলে মাইনষে খাতির করে, বোঝলেন?
সেটা বোঝে অমল। ফিটফাট থাকার যে দাম আছে সেটা তার মতো আর কে জানে। তবে কিনা, সে সেই যুগ পার হয়ে এসেছে।
সে মৃদু স্বরে বলল, হু।
শীত লাগে না আপনের বড়ভাই?
অমল মাথা নেড়ে বলল, লাগে। শীতটা খুব পড়েছে এবার।
আমার ব্যাগে একখানা আলোয়ান আছে, দিমু আপনেরে?
লজ্জা পেয়ে অমল বলে, আরে না, তার দরকার নেই।
ঘিন্না পাইলেন নাকি বড়ভাই? ধোয়াকাচা আলোয়ান, গন্ধ-গুন্ধ পাইবেন না।
অমল বাঙালের দিকে চেয়ে বলল, আপনি বড় ভাল লোক তো!
কী যে কন বড়ভাই! এই কাল ঠান্ডাটার মইধ্যে আপনের গায়ে তো দ্যাখত্যাছি একখান স্যান্ডো গেঞ্জির মতো সোয়েটার। অসুখ-বিসুখ কইরা ফালাইব। নামডাকের মানুষ আপনে, আপনের লগে লগে যে হাটত্যাছি, কথা কইত্যাছি হেইরে কি কম কথা নাকি?
রসিক দাঁড়িয়ে তার ব্যাগের চেন খুলে আলোয়ানটা বের করল।
বেশ নরম, মোলায়েম নস্যি রঙের ওম-ওলা চাদরখানা গায়ে জড়াতেই ভারী আরাম বোধ করল অমল। বলল, বাঃ, বেশ আলোয়ানটি তো!
আইজ্ঞা, পাঞ্জাবের জিনিস। আলোয়ানটা পরম স্নেহে অমলের গায়ে ঠিকঠাকমতে জড়িয়ে দিতে দিতে রসিক বলল।
