চেনা ঘর। হাতড়ে টেবিলের ড্রয়ার খুলে ঘড়িটা বের করল সে। রেডিয়াম ডায়ালের ঘড়ি অন্ধকারে বেশিক্ষণ থাকলে আর ঝলমল করে না, আলো নিভে যায়। ঘড়ির ডায়ালের দিকে চেয়েও তাই সময়টা বুঝতে পারল না সে। হতাশ হয়ে কিছুক্ষণ বসে মশার কামড় খেল।
হঠাৎ নীচে কোথাও দরজার হুড়কো খোলার একটা শব্দ হল। কান খাড়া করে শুনল সে। একটা কাশির মৃদু শব্দ। তারপর কুয়োতলায় জলের শব্দ। বাবা উঠল নাকি? তা হলে এখন ব্রাহ্মমুহূর্ত। ভোর চারটে।
দপ করে আলো জ্বলে উঠল ঘরে। কারেন্ট এল।
খুব বেশি কিছু গোছানোর নেই তার। সম্বল একটা অ্যাটাচি কেস মাত্র। বাড়তি জামা-প্যান্ট অবধি নেই। বাবার দুটো পুরনো ধুতি চেয়ে নিয়ে তাই লুঙ্গির মতো করে পরতে হয় ঘুরিয়েফিরিয়ে। এসবে আর কোনও অসুবিধে হয় না তার। সম্মানে লাগে না। এক সময়ে লাগত। এক সময়ে সে দিনে দুবারও দাড়ি কামিয়েছে। এক সময়ে সে যা ছিল ভাবলে আজকের সে খুব অবাক হয়।
নীচে নামতেই মুখোমুখি বাবা। বাবার হাতে টর্চ। কোথায় যাচ্ছিস?
কলকাতা।
কলকাতা! তা এত ভোরে কেন?
যাই। সকালে যে গাড়ি পাব তাতেই যাব।
এখানে এত ভোরে বাস পাবি কোথায়?
পাব না?
সাড়ে ছটা-সাতটার আগে বাস-টাস পাওয়া যায় না। খামোখা গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।
যেন ভারী সমস্যায় পড়ল অমল এমন উদ্বেগের গলায় বলল, তা হলে?
সকাল সকাল যাওয়ার দরকার নাকি? তা হলে কাল যেতে পারতিস।
অমল অনেক ভেবে বলল, না, সকাল সকাল যাওয়ার দরকার নেই তো! ভাবলাম বেরিয়ে পড়ি, তাই বেরিয়ে পড়েছি।
বরং ঘরে এসে বোস। আর ঘণ্টা দেড়েক পরে বেরোলেই হবে। রাস্তাঘাট এখন অন্ধকার।
অমলের আপত্তি হল না। বাবাকে তার আজকাল ভালই লাগে। সংসারের সাতেপাঁচে নেই, নিজের মনে নিজের ঘরখানায় একাবোকা সময় কাটিয়ে দেয়। বায়নাক্কা নেই। নিজের মনেই পুজো-টুজো করে। কিন্তু বাড়াবাড়ি নেই। সোহাগ তার দাদুকে খুব পছন্দ করে। বলে, এ ম্যান অফ উইজডম। সোহাগ খুব কম লোককেই পছন্দ করে। দুনিয়ার বেশির ভাগ লোককেই সে সহ্য করতে পারে না।
বাবার ঘরটার মধ্যে যেমন ওম তেমনি একটা বেশ প্রাচীনতার গন্ধ। গন্ধটা কী দিয়ে তৈরি তা সে বলতে পারবে না। আসবাব বা জিনিসপত্রের কোনও বাহুল্য নেই। শুধু একখানা চৌকি, একখানা আলনা, দুটো কেঠো চেয়ার, একধারে কুলুঙ্গিতে ঠাকুরের আসন। হ্যারিকেনটা উসকে দেওয়ায় ঘরের দৈন্যদশা প্রকট হল।
বোস।
অমল চেয়ারে বসল।
বউমার সঙ্গে কি বনিবনা হচ্ছে না তোর?
হ্যাঁ।
কী নিয়ে গণ্ডগোল?
কিছু নিয়ে নয়। সব নিয়েই।
বড় বউমার কাছে শুনলাম ডিভোর্সের মামলা করবে। সত্যি নাকি?
হু। সেই রকমই তো কথা।
তুই কি বউমার সঙ্গে ঝগড়া করে এসেছিলি?
ঝগড়া! না, ঝগড়া করিনি তো!
তা হলে চলে এসেছিলি কেন?
ভাল লাগছিল না। ওদের কাছে থাকলে আমার কেবল ভয়-ভয় করে।
ভয় করে?
হ্যাঁ।
ভয় তো করেই লোকের। আমারও তো ভয় হত।
আপনার ভয় হত বাবা? হত না? তোর মাকে ভয় পেতাম, ছেলেমেয়েদের ভয় পেতাম। সব থেকে বেশি ভয় পেতাম তোকে।
আমাকে! বলে ভারী অবাক হয়ে বাবার দিকে চেয়ে থাকে অমল।
তোকে সবচেয়ে বেশি। পরীক্ষায় ভাল ফল-টল করলি। সে এত ভাল যে এ-বংশের কেউ কখনও স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। তার পর তোর নিজের মতামত হল। লোককে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে শিখলি। তখন তোকে এত ভয় হত যে কথাটথা বিশেষ কইতে পারতাম না। মানুষ যখন গৌরব করার মতো কিছু করে তখন তার অহংও বেসামাল হয়ে ওঠে কিনা। একটা জীবন আমারও তো কত ভয়ভীতি নিয়ে কাটল।
ভারী অবাক হয়ে অমল তার বাবার দিকে চেয়ে রইল। তাই তো! বাবা তো মিথ্যে কথা বলছে না। যখন স্কুলে সে ঝুড়ি ঝুড়ি নম্বর পাচ্ছে, যখন মাস্টারমশাইরা তার মেধায় বিস্মিত এবং আপ্লুত তখন তার চারদিকে একটা ভয়, শ্রদ্ধা, সংশয় ও বিস্ময়ের বলয় কি রচিত হয়নি? ঘনিষ্ঠ তুইতোকারির বন্ধুরা পর্যন্ত যেন একটু সন্তর্পণে দূরে সরে যেতে লাগল। তাদের সাধারণ বোধবুদ্ধির জগতে হঠাৎ এক অতি-মগজ আবির্ভূত হওয়ায় তারা কিছুটা হতচকিত। এই তফাতটা সে তার বাড়িতেও টের পেতে শুরু করে। তার ভাইবোনদের ব্যবহারে, মায়ের পক্ষপাতিত্বে তার মেধার পূজা কি তখনই সে টের পায়নি? বাবার সঙ্গেও তখন থেকেই তার দূরত্ব শুরু হয়। সত্যি কথা বাবার বোধবুদ্ধি, পরামর্শ বা উপদেশকে তখন থেকেই সে তুচ্ছতাচ্ছিল্য এবং অগ্রাহ্য করতে শুরু করে। তার বাবা যে ইংরিজিতে এম এ পাস সেটাও বোধহয় সে গুরুত্ব দেয়নি।
হ্যাঁ, এসবই সত্য। কোনও ভুল নেই।
সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাবার দিকে চেয়ে বলল, আজ আমার পতন কি কোনও কর্মফল বাবা?
পতন! পতনের কথা বলছিস কেন?
আমার পতন আপনি দেখতে পান না?
মহিম অবাক হয়ে বলে, পতন আবার কীসের? চাকরি যায়নি তো!
না।
ডিভোর্সের কথা ভেবে বলছিস? সেটা তো আর একতরফা কারও দোষ নয়।
সেটাও বলছি না। আমার মাথাটাই যে ঠিক নেই। কী সব আবোল বোল ভাবি, বলি, আমার সব বোধবুদ্ধি যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। কর্মফল কিনা বুঝতে পারছি না।
তোর চেয়ে অনেক বেশি অকাজ করেও কত লোক দাবড়ে বেড়াচ্ছে। তুই আর এমন কী করেছিস? আজকাল মা বাপকে ভক্তিশ্রদ্ধা করে আর কজন? ওসব নিয়ে ভাববার কিছু হয়নি। বউমার কথা বল। সে কী চাইছে?
