কেন?
তা জানি না। মোন আমাকে সহ্য করতে পারছে না আর।
সেই দোষটা কি মোনার? তোমার নয়?
আমারই তো দোষ।
যদি জানো তোমার দোষ, তবে শোধরাও না কেন?
অমল মাথা নেড়ে বলল, পারি না।
কেন পারো না?
আর নতুন করে কিছু হওয়ার নেই আমার।
ওসব বোলো না। তোমার মেয়ে এসে পান্নার কাছে অনেক দুঃখ করে গেছে তোমাদের সেপারেশন হয়ে যাচ্ছে বলে। ছেলেমেয়ে দুটোর কথা ভেবেও তো নিজেকে একটু বদলাতে পারো।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অমল বলে, ওরাই বা আমার কে বলো! আমাদের যে সম্পর্কই গড়ে ওঠেনি তেমন করে। সবাই কেমন ছাড়া-ছাড়া, আলাদা-আলাদা। যে যার নিজের শেল-এর মধ্যে গুটিপোকার, মতো আটকে আছি।
তোমাদের কি ইগো প্রবলেম?
কে জানে পারুল! তাই হয়তো হবে।
ঘেন্নার কথা কী জানো? মোনা নাকি বলে গেছে সে তোমাকে আমার জন্যই সন্দেহ করে।
মাথা নেড়ে অমল বলে, হ্যাঁ।
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শত্রু হল সন্দেহ। যদি ওটা এখনই উপড়ে ফেলতে না পারো তা হলে নিউরোসিসে দাঁড়িয়ে যাবে।
তার কি আর কোনও প্রয়োজন আছে পারুল? মোনা তো ডিভোর্সের মামলার জন্য তৈরি হচ্ছে।
শোনো, একজন বাঙালি সাদামাটা গৃহস্থঘরের বউ কি সহজে ডিভোর্সের মামলা করে? এদেশে ডিভোর্সি মহিলার ভবিষৎ বলে কিছু কি আছে?
তা তো আমি জানি না।
জানতে তো কেউ বারণ করেনি। তোমার বিয়ে কেন ভেঙে যাচ্ছে তা জানার চেষ্টা না করে তুমি গাঁয়ে এসে পড়ে আছ কেন?
আজ কি আমাকে বকতে এসেছ পারুল?
হ্যাঁ। তোমার দুঃখের সঙ্গে আমার নাম জড়িয়ে থাকলে কি আমার ভাল লাগার কথা?
সেটা মোনার ভুল।
সবটাই ভুল? যদি তাই হয় তা হলে ঠুনকো ভুলটা ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করোনি কেন? সাধারণ একটা ঘটনাকে জটিল করে তুলছ অমলদা।
আমি কি জট ছাড়াতে পারি?
কেন পারছ না? কেন চেষ্টা করছ না?
কী করব পারুল?
তুমি কলকাতায় ফিরে যাও।
গিয়ে?
চাকরিটা আছে না গেছে?
সহজে যাবে না। বেতন কাটবে হয়তো।
তা হলে আগে চাকরিতে জয়েন করো। লিভ অর ট্রাই টু লিভ নর্মালি।
আমি আর নর্মাল নেই পারুল। আমার মাথা কাজ করে না, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, বিড়বিড় করে কথা কই, হঠাৎ হঠাৎ আচমকা অদ্ভুত সব কথা বলে ফেলি, অদ্ভুত সব আচরণ করি। না পারুল, আমি আর স্বাভাবিক নেই।
পারুল থমকাল, ডাক্তার দেখিয়েছ?
হ্যাঁ। একজন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে মাঝে মাঝে কাউনসেলিং নিতে যেতাম।
কিছু হয়নি তাতে?
হয়। তারপর ফের যেন সব গোলমাল হয়ে যেতে থাকে। না পারুল, এই গহ্বর থেকে আমার আর ওপরে উঠে আসার উপায় নেই।
তুমি কি বাস্তব থেকে পালাতে চাইছ?
মাথা নেড়ে অমল বলে, জানি না।
তবু কলকাতায় ফিরে যাও অমলদা। এখানে পড়ে থাকলে মোনা আরও ক্ষেপে যাবে। এত অবহেলা ওর প্রাপ্য নয়।
তুমি বললে যাব।
আজই যাও।
যাব। তারপর কী করব?
সেটা ঠিক করে নাও এখন থেকে।
মাথা নেড়ে অমল বলে, ওটা পারি না। আমাকে কেউ যদি চালিয়ে নিয়ে যেতে রাজি থাকে একমাত্র তা হলেই আমি চলতে পারি। সে খেতে বললে খাব, শুতে বললে শোব, চলতে বললে চলব, বলতে বললে বলব, চুপ করে থাকতে বললে চুপ থাকব। আমার এখন ঠিক এরকমই একজনকে চাই।
পারুল হাসল, তা হলে তো তুমি লক্ষ্মী ছেলে!
হ্যাঁ পারুল। আমি যা করতে চাই সব ভণ্ডুল হয়ে যায়। পদে পদে ভুল করে বসি। তাই আই ওয়ান্ট টু বি ডোমিনেটেড বাই সামওয়ান।
সেই সামওয়ান যদি মোনাই হয়!
নয় কেন? কিন্তু মোনা কি হবে? মোনা তো আমাকে চায় না। বরং বলো, তুমিই তোমাকে চাও না।
৫১-৫৫. ভোরের কাছাকাছি
৫১.
গভীর রাত, না ভোরের কাছাকাছি তা বুঝতে পারছিল না অমল। তবে পাখিদের শব্দ নেই। চারদিক নিঃঝুম। আর হিমযুগের মতো শীত। আজকাল দিক ঠিক রাখতে পারে না সে। জানালা বন্ধ করে শোওয়ার অভ্যাস নেই বলে পায়ের দিকের জানালাটা খোলা রেখে দিয়েছিল সে। এখন ঘুম ভেঙে একটু ভেবে দেখল যে, ওটাই উত্তর দিক। আর সেইজন্যই এত হিম হয়ে আছে ঘরখানা।
হাতে ঘড়ি নেই। কটা বাজে বুঝতে পারছিল না সে। সময়ের বোধ তার ভিতরে আজকাল কাজ করে না। আগে করত। আগে ঘড়িতে বাঁধা জীবন ছিল তার। কখনও অফিসে যেতে দেরি হয়নি, অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফেল হত না, ট্রেন বা প্লেন কখনও মিস করেনি সে। এখন সেই লোকটাকে আর চেনা বলেই মনে হয় না। মনে হয় ওটা পূর্বজন্ম।
অন্ধকারে উঠে বসল সে। সকালে সে কলকাতায় যাবে। কেন যাবে, গিয়ে কী হবে তা সে পরিষ্কার বুঝতে পারছে না। মোনা ডিভোর্সের মামলা করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। ডিভোর্সই বা করতে চায় কেন? তারা যেমন পরস্পরকে মনে মনে প্রত্যাখ্যান করে এক ফ্ল্যাটেই বসবাস করছে ডিভোর্স কি তার চেয়ে বেশি কিছু লাভজনক হবে? এও তো ডিভোর্সই। এবং তারা যে যা খুশি করতে পারে। বিয়ে বা সম্পর্ক না মানলেই তো হয়। কোর্টকাছারি করার দরকারই বা কী। একগাদা পয়সা খরচ এবং অনভিপ্রেত পাবলিসিটি। মোনা আর তার মধ্যে বন্ধনই তো নেই, তা হলে এই ভাগভিন্ন হওয়ার পরিশ্রমই বা কেন?
লজিকটা খুঁজে পায় না অমল। ডিভোর্সের প্রয়োজন সম্পর্কে সে তেমন অবহিত নয়। তবু সে কলকাতা যাবে। কিছু সইসাবুদ করতে হবে হয়তো। করে দেবে অমল। তারপর মোনা সরে যাবে। তারপর কী হবে তা অমল জানে না।
উঠে সে বাতি জ্বালতে গিয়ে দেখল, বাতি জ্বলছে না। বাতি কেন জ্বলছে না সেটা খুব অবাক হয়ে বুঝতে চেষ্টা করল সে এবং অনেকক্ষণ পরে বুঝতে পারল, এখানে প্রায়ই সুইচ টিপলে বাতি জ্বলে না। এখানে লম্বা লম্বা লোডশেডিং হয়। তা হলে সেটা বুঝতে এত সময় লাগল কেন তার?
