একটু অবাকই হয়েছিল মহিম। ওরা কস্মিনকালেও কেউ এখানে আসে না। দু মাস চার মাস পরে হয়তো কখনও অমল এসে হাজির হয়, এক বেলা থেকেই চলে যায়। হয়তো চেনা দিয়ে যায়, সৌজন্য বজায় রাখে। অমল এলেও পরিবার কখনও আনে না। তাই ওদের সঙ্গে ভাব বা ভালবাসা কিছুই হল না। আত্মীয়তা বা রক্তের সম্পর্ক ইত্যাদি ব্যাপারগুলো ক্রমেই বস্তাপচা বর্জ্য ধারণা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একদিন হয়তো বাপ-ছেলের সম্পর্কও ঘুচে যাবে। যাবে কেন, যাচ্ছেও ক্রমে ক্রমে। শ্বশুর, ভাসুর, দেওর, ননদ এসব শব্দ থাকবে শুধু ডিকশনারিতে। সেটা মহিম এই জীবনেই টের পেয়ে যাচ্ছে।
বউমাটি এসে প্রথম দিন তাকে একটা প্রণাম করেছিল। খুব ভক্তিভরে নয়, পা দুটো ভাল করে ছোঁয়ওনি, একটু ভান করেছিল মাত্র। ব্যস, তারপর সেই যে আলগোছ হল, তারপর আর মুখোমুখিই হল না একই বাড়িতে থেকেও। নিজেরা নিজেরা থাকে, নিজেদের মধ্যেই ইংরিজিতে কথা কয়, ঝগড়া টগড়ার শব্দও কানে আসে।
মহিমাদীপ্ত রায় নামে যে ছেলেটি একসময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরিজিতে এম এ পাস করেছিল তাকে আজকের মহিম রায় বলে চেনা মুশকিল। না, দুটো লোক এক নয়। মহিমাদীপ্তর দীপ্তি আর মহিমা দুটোই অস্তাচলে গেছে। এখন এই যে মহিম রায় নামে লোকটি এ এক গেঁয়ো ভিতু মানুষ, দেখলে মুখ্যু বলেই ধরে নেবে মানুষ। মুখ্যু ছাড়া আর কী? কবে দু পাতা অংবং ইংরিজি পড়েছিল তার জোরে কি আর বিদ্বান বলে পরিচয় দেওয়া যায়। লোকে ভুলে গেছে, মহিম রায় নিজেও ভুলে গেছে। কোন তোরঙ্গের অন্ধকারে লজ্জায় মুখ লুকিয়ে পড়ে আছে সার্টিফিকেটখানা।
তবে ওই ডিগ্রির জোরে রেলে চাকরি পেয়েছিল মহিম রায়। শিয়ালদার ক্রু ইন চার্জ। কিন্তু বেশিদিন চাকরিটা করে উঠতে পারেনি। বদলির চাকরি, ঘুরে ঘুরে কয়েক জায়গায় বদলি হওয়ার পর শরীর খারাপ হতে লাগল, পেটে জাপ্পো আমাশা। বাবা বলল, চাকরির দরকার নেই, জোতজমি যথেষ্ট আছে, গাঁয়ের হাই স্কুলে ইংরিজির মাস্টারও দরকার। এলেই হয়।
সেই চলে আসা। কিছুদিন হাই স্কুলে ইংরিজি পড়িয়েছিল। তারপর বিদ্যাচর্চা সেই যে থেমে গেল আর চালু হয়নি।
ভুলেই গিয়েছিল সবাই, হঠাৎ বুঝি একদিন সন্ধ্যার মনে পড়ে গেল যে, তার বাবা ইংরিজিতে এম এ পাস। একদিন সন্ধেবেলা সে এসে হামলে পড়ল, ও বাবা, তুমি কী গো!
কেন, হলটা কী রে?
ওরা যে অত কটর কটর করে ইংরিজি বলে আমাদের দিনরাত জব্দ করছে, আর তুমি চুপ করে বসে আছ! তুমি না ইংরিজিতে এম এ পাস!
তাতে কী হল?
মুখের ওপর দুটো ইংরিজি কথা শুনিয়ে দিতে পারো না ওদের?
অবাক হয়ে মহিম বলল, কেন রে, ওরা ইংরিজি বলছে বলে আমি কেন ইংরিজি বলতে যাব?
কেন বলবে না শুনি? ওরাও দেখুক, আমরা ওদের চেয়ে কিছু কম নেই।
মায়াভরে একটু হেসেছিল মহিম। তার এই মেয়েটির লেখাপড়ার মাথা ছিল না। ক্লাস সিক্স অবধি উঠতেই গলদঘর্ম হয়ে ইস্তফা দিল। হয়তো সেইজন্য মনে মনে নিজেকে ছোট ভেবে কষ্ট পায়, হিংসেতে জ্বলেও হয়তো একটু।
মহিম রায় স্নিগ্ধ গলায় বলেছিল, তুই কি ভাবিস ওরা ইংরিজি শুনে জব্দ হয়ে যাবে? ব্যাপারটা তা নয় রে।
না বাবা, দিনরাত বড় অপমান লাগছে আমার। ইংরিজিতে আমাদের নিয়ে খারাপ খারাপ কথা বলে, ঠাট্টাইয়ার্কি করে। অন্তত আমরা যে ওদের কথা বুঝতে পারছি সেটা ওদের জানিয়ে দেওয়া দরকার। তাহলে সাবধান হবে, আর বলবে না। যখনই ওরা কেউ উঠোনে নেমে আসবে তখনই এই জানালা দিয়ে তুমি ওদের লক্ষ করে খুব ইংরিজি বলে দিও। দু-চারবার বললেই দেখবে কাজ হচ্ছে।
মহিম রায় কী বলবে ভেবে পেল না। মুখ্যু-সুখ্যু মেয়েটার জীবনে অনেক দুঃখ। তার ওপর এই ইংরিজি না-জানার দুঃখটা চেপে বসায় মাথাটা গরম হয়েছে। জানালা দিয়ে খামোখা ইংরিজি আউড়ে যাওয়ার হাস্যকরতা ও বুঝতেই পারছে না।
সন্ধ্যা বুঝবে না, ইংরিজি কোনও বাধা নয়। ওদের সঙ্গে তাদের দূরত্ব শুধু ইংরিজিই তো রচনা করেনি। করেছে মনোভাব। সেটা সন্ধ্যা বুঝবে না।
মহিম রায় দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল।
সন্ধ্যা ফিস ফিস করে বলল, অত দেমাক দেখাচ্ছে, জানো তো মেয়েটা কলকাতায় একটা কিছু কেলেঙ্কারি করে এসেছে।
কেলেঙ্কারি! কী করেছে?
কিছু একটা হবে। যখন মায়ে মেয়েতে ঝগড়া হয় তখন বুঝতে পারি।
মহিম ক্লান্ত বোধ করে। সন্ধ্যা ওদের পছন্দ করে না বলেই বানিয়ে বলছে বোধহয়। বড় জ্বলুনি হচ্ছে মেয়েটার। কিন্তু এসবের নিদান তো তার জানা নেই।
ঘরে বসে অবশ্য লক্ষ করে মহিম। ছেলেটা, মেয়েটা, বউমা মাঝে মাঝে আলাদা আলাদা উঠোনে নেমে আসে। জানালা দিয়ে দেখে ওদের মহিম। আপনজন বলে মনে হয় না। বহু দূরের মানুষ বলে মনে হয়। ওরা ভাল না খারাপ তা জানে না মহিম। জেনে হবেটাই বা কী? এ-ঘরে কখনও উঁকিও দেয় না তারা। একটা হ্যাগার্ড বুড়ো এক কোণে পড়ে থাকে, উঁকি মারার আছেটাই বা কী?
এই সন্ধেবেলা মেয়েটাকে ফটিকের পতিত জমিতে নেচে বেড়াতে দেখে প্রমাদ গুনল মহিম। সাপে কামড়ালে মরবে যে। এ সময়ে সাপ-খোপ বেরোয়।
কে রে? সোহাগ নাকি তুমি! অ্যাঁ।
কোনও জবাব নেই। নৃত্যের কোনও বিরতিও পড়ল না। যেন শুনতেই পায়নি। উপেক্ষা করছে কি?
শোনো সোহাগ, ওখানে সাপ-খোপ আছে, চলে এসো।
