আর বোলা না নন্দিন।
আজ আমাকে বলতেই হবে। রঞ্জন সুন্দর বটে, কিন্তু সে যেন ময়ূরের পালকের মতো পলকা, উড়ে যায়। সে এক বিবাগী পুরুষ, তার কোনও স্থণ্ডিল নেই। পৃথিবীর আনন্দের সঙ্গেই যেন তার সম্পর্ক। কিন্তু তুমি তো তা নও।
জানি নন্দিন।
পৃথিবীর গভীর দুঃখ, গভীর বিষাদ, গূঢ় অভ্যন্তরের ভিতরে তোমার অবস্থান। এ জীবনকে তুমি মন্থন করেছ ঢের বেশি। মন্থনের হলাহলে জর্জরিত তুমি এক বিষণ্ণ পুরুষ। নন্দিনীকে বিদীর্ণ করেছ তুমি, দ্বিখণ্ডিত করেছ। রঞ্জনকে কী করে আমার সবটুকু দেব আর? বলে দাও।
ক্ষমা করো নন্দিন। এ আমার অজানিত অপরাধ।
তুমি তো লুণ্ঠন করোনি আমাকে। তবে ক্ষমাভিক্ষা কেন?
একদিন কুঁদ ফুলের মালা গেঁথে পদ্মপাতায় ঢেকে এনেছিলে। মনে পড়ে কি নন্দিন?
পড়ে। তুমি বলেছিলে, নিজে পরো। কী অপমান!
আজ বলি, এই সত্যটিও ঢাকা দিয়ে রাখো। ঢাকা থাক, সব বেদনাবহ সত্য আজ ঢাকা থাক।
রঞ্জন আমার চোখের দিকে একপলক তাকালেই বুঝতে পারবে, আমি আর সবটুকু তার নেই। ওগো, রঞ্জনের কাছে যে আমি কিছুই লুকোতে পারি না। আমার বড় ভয় হয়।
কীসের ভয় নন্দিনী?
ভয় হয় যদি আমাকে নিয়ে তোমার আর রঞ্জনের মধ্যে লড়াই বাঁধে।
রঞ্জনের সঙ্গে আমার কোনও লড়াই নেই নন্দিনী। আমি রাজ্য জয় করতে ভালবাসি, আমি খনির গভীর থেকে তুলে আনতে ভালবাসি সোনা, আমি ভালবাসি সম্পদ ও আধিপত্য। তোমাদের মিহিন প্রেমের তৃতীয় কোণ তো আমি নই। যদি তোমাকে লুণ্ঠন করতে চাইতুম তবে সে প্রলয়ঝড়ের মুখে কবেই উড়ে যেত রঞ্জন। আমার লড়াই কার সঙ্গে জানো? পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মল্লবীর, ক্ষ্যাপা ষাঁড়, ক্ষুধার্ত বাঘ, ক্রুদ্ধ সিংহ, মত্ত হাতি কতবার লুটিয়ে পড়েছে আমার পায়ের তলায়। এই সূক্ষ্ম মায়া-দরজার অন্তরাল থেকে তাদের গর্জন আর আর্তনাদ শোনোনি কখনও?
শুনেছি।
কতবার তুমিই বলেছ তোমার রঞ্জন আসবে ভোরের আলোর মতো, বসন্ত সমাগমের মতো, ফুলের সুগন্ধের মতো। রঞ্জন যেখানে যায় সেখানে সবাই জেগে ওঠে, শুরু হয় উৎসব, গান। সে কি আমার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে নন্দিন?
তবু ভয় হয়। কেন জানো?
কেন?
আমার রঞ্জনের সঙ্গে তোমার এক জায়গায় বড্ড মিল।
কীসের মিল?
আমার রঞ্জনের বুকে যে একটুও ভয় নেই। ভয়ের ছায়াটুকু কখনও তাকে স্পর্শ করে না। সে কাউকে ভয় পায় না বলেই তার বিপদ বেশি। শুধু ভাবি, দুজন ভয়হীন মানুষ যখন মুখোমুখি হবে–তুমি আর রঞ্জন–তখন কি প্রলয় হবে!
এই পৃথিবীতে আমি একমাত্র নিজেকেই ভয় পাই। কেন জানো?
কেন?
এই যে আমার বিপুল শক্তি ভিতর থেকে কেবলই ফুঁসে উঠছে, ওই অন্ধ শক্তি সবসময়ে চারদিকটাকে তছনছ করে দিতে চায়। সুন্দর, স্বচ্ছ, শুভ্র, পবিত্র কাউকেই রেয়াত করতে চায় না সে। এই অন্ধ, কাণ্ডজ্ঞানহীন বিপুল শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন। তোমার রঞ্জন যখন আসবে তখন আমাকে সতর্ক করে দিও।
শুনে আরও ভয় করছে আমার।
রঞ্জনের আগমনের আগাম বার্তা তোমার কাছে তো পৌঁছে যাবেই। তুমি আমার দরজায় করাঘাত করে বলে যেও সে কোন পথ দিয়ে আসবে। আমি সে পথ থেকে প্রহরা তুলে নেব, মসৃণ ও নিরাপদ করে দেব তার আবির্ভাব। বিষাণ বাজবে, প্রতিহারীর ঘোষণা শোনা যাবে। তোমার ভয় নেই নন্দিন। এখন যাও। আমাকে কাজ করতে দাও।
.
এটা কি ইমপ্রুভমেন্ট অন রবীন্দ্রনাথ? নাকি রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ তার? নাকি বিকল্প রক্তকরবী? সে নিজের লেখাটা পড়ে কিছুতেই বুঝতে পারল না কেন লিখল, কেন লিখতে গেল। লেখাটা বারবার পড়ল সে। এর ভিতরে কে আছে? কেউ কি আছে তার চেনা? মোনা, পারুল, কিংবা আর কেউ? সে নিজে? যাই হোক এই ভুসিমাল নিয়ে তো কেউ আর রিসার্চ করবে না।
এখন কবোষ্ণ দুপুর। তার ভীষণ খিদে পেয়েছে। এই একটা জিনিস সে ভীষণ টের পায়। খিদে, একটা আগ্রাসী খিদে তার শরীরে, পাকস্থলীতে মন্থনদণ্ডের মতো পাক দিয়ে ওঠে। তখন বড্ড মাথা গরম হয়ে যায়। কেন কেউ তাকে খেতে দিচ্ছে না বলে একরকম অবোধ অভিমান হতে থাকে।
ব্লাড সুগার হয়নি তো? সে শুনেছে ব্লাড সুগারের একটা লক্ষণ ঘন ঘন ভীষণ খিদে পাওয়া। শরীরের খবর সে তো রাখে না। কত জট পাকিয়ে আছে ভিতরে কে জানে।
কিছুক্ষণ বিছানায় চিৎপাত হয়ে পড়ে রইল অমল। সে কি আজ সকালে কিছু খায়নি? খিদেটা পেটের মধ্যে বেড়ালের মতো হাঁচোড়-পাঁচোড় করছে কেন? একটু ভাবতেই অবশ্য মনে পড়ল, আজ সকালে সে রুটি আর আলুভাজা খেয়েছিল। ঘড়িতে এখন মোটে সাড়ে এগারোটা। এত তাড়াতাড়ি খিদে পাওয়ার কথা নয়। পেটের খোঁদলটায় হাত রেখে সে কিছুক্ষণ চোখ বুজে রইল।
অমলদা! ডাক শুনে কেঁপে উঠল অমল। এ নিশ্চয়ই বিভ্রম। চোখ চাইলেই এই মধুর বিভ্রম ভেঙে যাবে।
অমলদা, তুমি কি ঘুমোচ্ছ?
অমল চোখ মেলল। মুখে একটু হাসি ফুটে উঠল তার।
না। কী চেহারা হয়েছে তোমার বলো তো! কতকাল দাড়ি কামাওনি? চুল আঁচড়াওনি!
অমল উঠে বসল, বোসো পারুল।
বসবার জন্য আসিনি। ঝগড়া করার জন্য এসেছি।
ঝগড়া! বলে অমল স্মিতমুখে মাথা নেড়ে বলল, আমি কি ঝগড়া করতে জানি? কীসের ঝগড়া পারুল?
কী শুনছি বলো তো!
অমল চোখ নত করে বলল, কী শুনছ?
তুমি আর মোনা নাকি ডিভোর্সের মামলা লড়ছ?
আমি তো মামলা লড়ছি না। মোনা লড়ছে।
