শোনো, শোনো। তুমি ওরকম নও! তুমি কিছুতেই ওরকম নও। তোমাকে যে আমি আমার মনের ভিতরে চিনতে পেরেছি।
কী চিনতে পেরেছ নন্দিনী?
তুমি ওরকম নও।
আমি কীরকম?
তুমি এক বিশাল পুরুষ। তুমি মহা শক্তিমান। তোমার শাসনে জড় হয়ে থাকে মানুষ। তোমার অতুল ঐশ্বর্য। তবু আমার কেবলই মনে হয় ও তুমি নও। এসবই তোমার খেলনাপাতি। তুমি যেন এক দুরন্ত বালক, খেলায় মেতে আছ। ভুলিয়ে রাখছ নিজেকে। কিন্তু তুমি আবার এক লহমায় সব খেলনা হুটপাট করে দিয়ে উধাও হয়ে যেতে পার। তোমার চোখের ভিতর দিয়ে তোমার গভীর মনের ভিতরে সেই বৈরাগ্যকেও যে আমি দেখেছি।
ওসব তোমার কল্পনা নন্দিন। তুমি আমাকে তোমার মন দিয়ে গড়ে নিয়েছ মাত্র। ও আমি নই। আমার বেলা বইয়ে দিও না। কাজের সময়ে ফাঁক পড়ছে, আমার সময় নেই। তুমি যাও নন্দিনী।
আমি তো বলেইছি তোমার দোরগোড়ায় আজ আমি সারাদিন বসে থাকব। তোমাকে জ্বালাব, কাজ ভণ্ডুল করব, আনমনা করে দেব তোমাকে।
কেন নন্দিন?
তুমি কেন অন্ধকারের রাজা হয়ে থাকবে? তুমি আলোর কেউ নও, আনন্দের কেউ নও? তোমার বন্ধ দরজায় ঘা দিয়ে দিয়ে ফিরে যায় পৃথিবীর আলো, গান, গন্ধ, কেন এই নির্বাসন তোমার?
আমি যা, আমি ঠিক তা-ই।
আচ্ছা, কী করে তোমাকে দেখাই বলো তো!
কী দেখাতে চাও?
আমার মনের মধ্যে যে-তুমিটা বসে আছ তাকে।
সে অলীক, সে মিথ্যে।
একবার যদি তোমার সামনে তাকে আনতে পারতাম।
বৃথা কথায় সময় নষ্ট হচ্ছে। এবার তুমি যাও নন্দিন। গুপ্তচরেরা আমাকে গোপন তথ্য দেবে বলে অপেক্ষা করছে। সেনাপতি দাঁড়িয়ে রয়েছেন আদেশের অপেক্ষায়। কোটাল এসেছেন পরিস্থিতির পর্যালোচনা করতে।
তোমার সারাদিন শুধু ভারী ভারী কাজ।
আমি যে কাজের লোক নন্দিন। আমি তোমার রঞ্জন নই।
তুমি কি রঞ্জনকে কটাক্ষ করলে?
না নন্দিন। আমি তোমাকে বলছি, তোমার রঞ্জন আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠতর জীব। শঙ্কায়, উদ্বেগে, অনিশ্চয়তায় আমার সময় কাটে। অবসরহীন এই জীবনে মাঝেমধ্যে মনে হয় বটে, অন্য রকম হলেও বোধহয় মন্দ হত না। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ে যায়, আমার বিপুল সম্পদ, অমিত শক্তি ও দুর্বার শাসনের কথা। নন্দিন, তোমাদের কত ছুটি, কত অবকাশ, কত গান, কত কথা। কেন আমার কাছে আসো নন্দিন? তোমার জগতে আমার কোনও স্থান নেই। বড্ড বেমানান।
তাই বুঝি?
রঞ্জনকে নিয়ে স্বপ্নের স্রোতে ভেসে যাও নন্দিন। আমাকে ভুলে যাও।
শোনো, শোনো। শ্রবণের কপাট বন্ধ করে দিও না এখনই। আমার কথা যে শেষ হয়নি!
তোমার মনে বুদ্বুদের মতো কথার জন্ম হয়। আমি কি অত কথা কইতে পারি!
পারতেই হবে। শোনো, তোমাকে আজ আমার একটা কথা বলতেই হবে।
তবে তাড়াতাড়ি বলে ফেল।
তাড়াতাড়ি বলার মতো কথা নয় যে! এক একটা কথা আছে যা খুব ধীরে ধীরে ফুলের পাপড়ির মতো ফুটে ওঠে। তাড়া দিলে হবে না।
আমার সামনে তুলাদণ্ডে সোনার ওজন হচ্ছে। আমার যে এক মুহূর্তও অন্যমনস্ক হওয়ার উপায় নেই।
আজ তোমাকে শুনতেই হবে।
বলো, শুনছি।
না, শুনছ না। এক মুহূর্ত তোমার কাজ ফেলে রেখে আমার কাছাকাছি এসো। চুপটি করে বসো। রাজকার্য অপেক্ষা করতে পারে। কিন্তু আমার কথার যে তর সয় না। একটা কথা মাথা খুঁড়ে মরছে আমার ভিতরে। কতক্ষণ তাকে আটকে রাখতে পারি বলো!
এই কাছে এলুম। এবার বলো।
আমাকে দেখতে পাচ্ছ?
পাচ্ছি নন্দিন। আমি সবাইকে দেখতে পাই, কিন্তু কেউ আমাকে দেখতে পায় না।
বলো তো আমি আজ কোন সাজে সেজেছি!
বাসন্তী রঙের শাড়ি পরেছ। এলোকেশে আলতো একটি মালা জড়িয়ে রয়েছে। কপালে একটি শ্বেতচন্দনের ফোঁটা। মেয়েদের সাজের কোনও মর্মই আমি জানি না। তবু বলি, তোমাকে আজ অপরূপ দেখাচ্ছে। এ সাজ কার জন্য নন্দিন? রঞ্জন আসবে বলে?
কেউ বুঝি তোমার জন্য কখনও সাজেনি?
রাজ-অবরোধে নারীর অভাব নেই। নৃত্য-গীত পটীয়সীরাও আমার মনোরঞ্জন করতে সর্বদাই তৎপর। তবু তোমাকেই বলি নন্দিন, তারা কেউ আমার জন্য সাজেনি কখনও। সাজতে হয় বলে সাজে মাত্র।
তুমি কি জানো আজ রঞ্জনের জন্য নয়, আমি সেজেছি তোমারই জন্য!
বৃথাই সেজেছ। এই অন্ধকূপ থেকে তোমাকে যে আমার কিছুই দেওয়ার নেই।
আমার আছে।
আমি কৃপণ, সঞ্চয়কারী, লোভী, নৃশংস, মদমত্ত এক যন্ত্র মাত্র। নন্দিন, কী দেবে তুমি আমাকে? এই দুই লোভী হাত শুধু পৃথিবীর সম্পদ কেড়ে নিতে চায়! তুমি আমাকে কী দেবে?
কেন বুঝতে পারো না তুমি, আমার অর্ধেক হৃদয় যদি রঞ্জন জয় করে থাকে, বাকি অর্ধেক আমি তো কবেই তোমার দরজার চৌকাঠে রেখে দিয়ে গেছি।
অর্ধেক! অর্ধেক নন্দিন? আমি কখনও অর্ধেক গ্রহণ করিনি। আমি চাই সবটুকু। সবটুকু চাই, নইলে সবটুকুই প্রত্যাখ্যান করি। নন্দিন, তুমি রঞ্জনের জন্য তোমার সবটুকু হৃদয় তুলে রাখো। মরুভূমিতে সিঞ্চন করার মতো বোকা তুমি নও।
আমার প্রগলভতা ক্ষমা করো। দ্বিধাদীর্ণ এই অসহায় নারীর দিকে একবার ভাল করে তাকাও। আমার সবটুকু তো রঞ্জনেরই ছিল। এই নন্দিনী তো রঞ্জনেরই রচনা। জানতুম রঞ্জনই আমার সব। সে আমার গান, আমার আলো, আমার মুক্তি। রঞ্জন যেখানে যায় সেখানেই চারদিক ফুল্ল হয়ে ওঠে।
জানি নন্দিন। রঞ্জনের কথা তুমি অনেক বলেছ।
তবু দেখ, যেদিন তোমাকে দেখলুম, তরাসে কেঁপে উঠেছিল বুক। কী ভয়ংকর বিপরীত তুমি! কী নিষ্ঠুর! কী কঞ্জুষ! কী স্বার্থপর, আত্মসর্বস্ব! আবার দেখলুম, কী প্রবল তোমার শক্তি! ঐরাবতের মতো সামর্থ্য তোমার!রঞ্জন সুন্দর বটে, কিন্তু কবির মতো সুন্দর। আর তুমি! তোমার সৌন্দর্য যেন অন্ধকার কুঁদে তৈরি করা। কী বিশাল, কী স্থির, কী একাগ্র!
