রাষ্ট্রযন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হল তার সম্পদ। বস্তুগত সম্পদ হল পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুতর বিষয়। তুমি কি ভুলে যাও নন্দিন, যে আমি দেশের রাজা? অনেক কিছু থেকে মনকে প্রত্যাহার করে নিই আমি।
আগে বলো, রঞ্জনকে তোমার হিংসে হয় না? একটুও না?
হয়তো হয়। আমার হৃদয়বৃত্তি এতই সামান্য যে ঠিক বুঝতে পারি না।
আমি কতবার মালা গেঁথে এনেছি, তুমি পরোনি। শুধু বলেছ, নিজে পরো। আমার মালা ফিরিয়ে দাও তুমি, তবু আমি তোমার কাছে ছুটে ছুটে আসি। মনে আছে তোমার? একদিন তুমি বলেছিলে, আমার সবটুকু দিয়ে যদি তোমাকে ধরতে চাই, ধরা দেবে কি নন্দিন? বলোনি?
বলেছি।
তুমি কি জানো সেই কথা শুনে আমার সারা শরীরে কাঁটা দিয়েছিল? মন নেচে উঠেছিল তিতিরের মতো। সেদিন সারা বেলা আমি যেন মেঘ হয়ে আকাশে ভেসে বেড়ালুম। কিন্তু জানি, ও তোমার মনের কথা নয়।
হয়তো তখনকার মতো ও আমার মনের কথাই ছিল!
ছিল? সত্যি বলো, ছিল?
বললে তুমি খুশি হবে?
হব না! বলো কী? আমার আধখানা মন যে সবসময়ে তোমার কাছে পড়ে থাকে। বলে দেখ, আমি ফের মেঘের মতো ভেসে বেড়াব।
কথাটা তখন সত্য ছিল। কিন্তু এখন যদি সত্য না থেকে থাকে?
সত্য কি বদলে যায়?
যায় নন্দিন। সংসারে সব সত্যই তো আপেক্ষিক, শর্তনির্ভর। এমনকী প্রেম ভালবাসা এসবও।
ওরকম বোলো না তো। ওরকম নিষ্ঠুর কেন তুমি? ভাল করে নিজের মনের ভিতরে খুঁজে দেখ, কথাটা সত্যিই মিথ্যে ছিল কিনা।
আমার যে সময় নেই নন্দিন। আমার অনেক কাজ। ধ্বজাপুজোর সময় এগিয়ে আসছে।
আমি তো তোমার কাছে দিনে শতেকবার ছুটে আসি একটু কথা কইবার জন্যই। একটু মায়া হয় না তোমার?
মায়া হয় নন্দিন। এ রাজ্যে একমাত্র তুমিই আমাকে একটু দুর্বল করে ফেলেছ। কিন্তু এই দুর্বলতা আমাকে ঝেড়ে ফেলতেই হবে। তুমি যাও নন্দিন।
কথাটা আর একবার বলো।
কোন কথাটা?
ওই যে বললে এ রাজ্যে একমাত্র আমিই তোমাকে দুর্বল করে ফেলেছি। সত্যি? বলো না!
হ্যাঁ নন্দিন। আমি জানি এ-রাজ্যের কোনও মানুষই আমাকে দু চোখে দেখতে পারে না। শ্রমিকরা আমাকে ঘৃণা করে, প্রজারা আমার মুণ্ডপাত করে। কেউ আমার সঙ্গে কথা কইবার স্পর্ধা অবধি দেখায় না। একমাত্র তোমারই কোনও ভয় নেই, সংকোচ নেই, কুণ্ঠা নেই।
কেন নেই তা কি জানো?
না নন্দিনী, জানি না। ওসব নিয়ে ভাববার সময় নেই। তুমি যাও।
বলেছি তো, আজ আমি সারাদিন তোমার দোরগোড়ায় বসে থাকব।
তা হলে যে আমার কাজের ব্যাঘাত ঘটবে। শ্রমিকেরা তাল তাল সোনা বয়ে আনছে আমার ঘরে। সেসব সাজিয়ে-গুছিয়ে তোলা, হিসেব রাখা, সব যে গণ্ডগোল হয়ে যাবে।
যাক। আমি আজ মান করেছি।
অভিমান তার কাছেই করা ভাল যে তার দাম দিতে পারে।
আমার অভিমানের দাম তুমি কেন দিতে পারো না?
আমি, আমি তো তোমার রঞ্জন নই নন্দিনী!
আমার অর্ধেক মন জুড়ে যদি রঞ্জন, তো বাকি অর্ধেক মন জুড়ে যে তুমি!
ভুল হচ্ছে নন্দিনী। আমি জানি যে হৃদয় রঞ্জনকে ভালবাসে সেই হৃদয় কখনও এই অন্ধকার গর্ভগৃহের অধিপতিকে ভালবাসতে পারে না।
ভালবাসার তুমি কী জানো?
ভালবাসার আমি কিছুই জানি না নন্দিনী। আমার সব ভালবাসা গিয়ে শেষ হয় আমার চারদিকে তিল তিল করে জমে ওঠা এই সোনার পাহাড়ে। আমি অন্ধকার ভালবাসি, একাকিত্ব ভালবাসি, শক্তিমত্তা ভালবাসি। সংগীতের চেয়েও চাবুকের শব্দ আমার অধিক প্রিয়।
না না, ওরকমভাবে বোলো না। তুমি ওরকম নও কিছুতেই।
আমি কীরকম নন্দিনী?
আমাকে মুখোমুখি পেয়ে একদিন আমার অরণ্যের মতো চুলে দুটো শক্তিমান হাত ডুবিয়ে কী গভীরভাবে চেয়ে ছিলে তুমি আমার চোখের দিকে। সেই দৃষ্টি যে আমি ভুলতে পারি না রাজা। হ্যাঁ, তুমি মস্ত মানুষ, নিষ্ঠুর রাজা, তুমি ভয়ংকর। কিন্তু সেদিন তো আমার একটুও ভয় করেনি!
ভয় পাওনি বলেই ভেবে নিও না যে, আমি ভয়ংকর নই।
তোমাকে যে আমার এক নিষ্পাপ শিশুর মতো লেগেছিল সেদিন। তোমার দুটি চোখের ভিতরে আমি যেন স্নান করে উঠলাম। কী আশ্চর্য গভীর তোমার চোখ, যেন সমুদ্র। তোমার চোখের দিকে চেয়ে আমি সমুদ্রের গভীর কল্লোল শুনতে পেয়েছি, যেন অনেক শঙ্খ বেজে উঠেছিল একসঙ্গে। মনে হয়েছিল তোমার মতো বিশাল পুরুষ আমি কখনও দেখিনি! আর কী ভীষণ একা তুমি!
তুমি আমাকে ভয় পাও না নন্দিনী?
না। তোমাকে যে চেষ্টা করেও ভয় করতে পারিনি। ভয় করলে কি ছুটে ছুটে আসতুম তোমার কাছে?
তোমাকে নিয়েই তো আমার বিপদ নন্দিনী।
কীসের বিপদ?
আমাকে এতকাল সকলেই ভয় পেত। কেউ কখনও আমার দিকে মুখ তুলে তাকানোর সাহসটুকুও দেখায়নি। ওই ভয় থেকেই এসেছে শৃঙ্খলা, ওই ভয় থেকেই এসেছে বিনা প্রশ্নে আদেশ-পালন করা, ওই ভয়ই মাটির গভীর থেকে তুলে আনে তাল তাল সোনা। এ রাজ্যে কখনও বিদ্রোহ হয়নি। কিন্তু নন্দিনী, তুমি যে চারদিকে ভয় ভাঙানিয়া হাওয়া বইয়ে দিচ্ছ!
লোকে তোমাকে ভয় পেলে বুঝি তোমার ভাল লাগে?
লাগে নন্দিনী। আমার সামনে এলে মানুষ কুঁকড়ে যায়, পাঁশুটে হয়ে যায়, বাকরোধ হয়, চোখ বুজে ফেলে–আমি তখন বুঝতে পারি যে, সব ঠিক আছে। আমার কোনও বিপদ নেই। কিন্তু একবার ওদের ভয় ভেঙে গেলেই আমার বিপদ। এক মহা বিস্ফোরণে খানখান হয়ে যাবে আমার যতেক নির্মাণ। উবে যাবে সোনা, অন্তর্হিত হবে সিংহাসন, লোপ পাবে আমার সীমাহীন ক্ষমতা। নন্দিনী, আমি তোমাকে শাসন করার আগেই তুমি আত্মসংবরণ করো। ভয় ভাঙানিয়া হাওয়া বইতে দিও না।
