পান্না দরজার কাছে গিয়ে চাপা গলায় বলল, অমলদা এসেছে।
অমলদা আবার কে?
আহা, অমলদাকে চেনো না?
মহিম ভাসুরঠাকুরের ছেলে?
হ্যাঁ।
ও মা! এত সকালে কী ব্যাপার? কিছু হয়েছে নাকি?
না, না, কিছু হয়নি। এমনি এসেছে।
এত সকালে!
চা খেয়ে চলে যাবে।
বউয়ের সঙ্গে কী যেন গোলমাল শুনছিলুম।
আস্তে মা। শুনতে পাবে।
দরজাটা আবজে দে না। কাছে আয়।
দরজাটা সাবধানে ভেজিয়ে আধো-অন্ধকার ঘরে ঢুকল পান্না। মশারির ভিতর থেকে মা বলল, মাথাটা নাকি একটু খারাপ হয়েছে?
না তো! গাঁয়ের লোকে একটা ছুতো পেলেই রটায়।
তা নয় বাপু। অনেক টাকার চাকরিটাও নাকি ছেড়ে দিয়েছে। গাঁয়ে এসে থানা গেড়ে বসে আছে। এ তো ভাল লক্ষণ নয়। লোকে পুরনো কথা তুলছে।
কী কথা?
ওই যে পারুলকে নিয়ে। পারুলের জন্যেই নাকি পাগল। ওর বউ নাকি সন্দেহ করে এখনও দুজনের সম্পর্ক আছে।
বাজে কথা। পারুলদি কি সেরকম মেয়ে?
কে জানে বাবা কী। তোর অত সাউকারি করতে হবে না। সংসারের মারপ্যাঁচ বোঝার মতো বুদ্ধি কি তোর হয়েছে? নাপতেবুড়ি বলে গেল, পারুলের যে ছেলে হবে তার পিছনে নাকি ওই অমল।
ছিঃ মা, ওসব মনে করাও পাপ।
তা বাপু, বললেই দোষ? কীর্তিটা কি দোষের নয়?
কী করে ভাবলে বলো তো!
ভাবতে আমার বয়েই গেছে। ও আবর্জনা না ঘাঁটাই ভাল। লোকের মুখ তো তা বলে বন্ধ থাকছে না। ওসব লোককে বাড়িতে বেশি ঢুকতে দিতে নেই।
তুমি বড্ড সেকেলে মা। কিছু বোঝো না। কেবল কানে শুনে সব বিশ্বাস করো। পারুলদি কি তেমন মেয়ে বলে তোমার মনে হয়?
সকালবেলাটায় আর মুখ নাড়তে হবে না। ঠাকুর দেবতার নাম এখনও উচ্চারণ করিনি। তোর বাবা এসময়ে গেল কোথায়?
বাবা তো রোজ সকালে মর্নিং ওয়াক করতে বেরোয়।
মর্নিং ওয়াক না ছাই। চাষের মাঠে গিয়ে বসে আছে দেখ গে। খেজুর রস সাঁটছে। কিন্তু এখন অমলের সঙ্গে কথা বলে কে?
আমিই বলছি। সুদর্শনদা চা করছে।
বেশি গলাগলির দরকার নেই। ও মানুষ কিন্তু ভাল নয়। চরিত্রের দোষ আছে।
পান্না একটু রাগ করেই এ-ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে দিল। অমল এখনও নিঃসাড়ে ঘুমোচ্ছে। মাথাটা আরও ঝুলে পড়েছে বাঁ ধারে।
সুদর্শন চা নিয়ে আসার পর পান্না ডাকল।
অমল ঘুম ভেঙে ভারী লজ্জিত হয়ে বলল, ইস, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
আপনি খুব টায়ার্ড, না?
হ্যাঁ। খুব টায়ার্ড। রাতে ঘুম হয় না তো। সেই রাত দুটোয় ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছি।
রাত দুটো!
হ্যাঁ। ঘুম না এলে ঘরে আমার দমবন্ধ হয়ে আসে।
বেরিয়ে কোথায় যান?
কোনও ঠিক থাকে না। বেরিয়ে পড়ি।
কলকাতায় যাবেন না?
যেতে ভয় হয়।
ভয় কেন অমলদা?
কলকাতাকে ভয় পাই না। ওদের পাই।
কাদের ভয় পান অমলদা?
অমল একটু হেসে বলল, সবাইকে ভয় পাই রে। আমার আত্মবিশ্বাস বড্ড কমে গেছে।
সোহাগ কিন্তু আপনাকে খুব ভালবাসে।
হুঁ।
সোহাগ বলছিল, ওর মন খুব খারাপ।
কেন?
আপনার আর বউদির নাকি সেপারেশন হয়ে যাচ্ছে?
অমল চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ স্থির হয়ে। তারপর বলল, তোরাও শুনেছিস বুঝি?
হ্যাঁ। সেইজন্যই তো আপনি
কথাটা শেষ করল না পান্না। আসলে এতটাও তার বলার কথা নয়। তার হঠাৎ মনে হল সে মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
অমলের অবশ্য তেমন ভাবান্তর হল না।
মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ, মনটা ভাল নেই রে। আমার যে কী হয়েছে তা বুঝতে পারি না। পাগল হয়ে যাচ্ছি কি না কে জানে। গেলে একরকম ভালই। পাগলের তো স্মৃতি থাকে না। মাথার মধ্যে সব উলটোপালটা হয়ে যায়।
কেন পাগল হবেন অমলদা? ওসব ভাববেন না। কলকাতায় ফিরে যান। সব ঠিক হয়ে যাবে।
অমল ভারী সরল চোখে তার দিকে চেয়ে বলল, বলছিস?
হ্যাঁ।
যাব?
হ্যাঁ অমলদা, প্লিজ।
অমল মাথা নেড়ে বলল, বেশ, তুই যখন বললি যাব। অনেক সময়ে ভগবান ছোট ছোট মানুষের ভিতর দিয়ে কথা বলে ওঠেন, জানিস?
.
৫০.
মায়া-দরজায় অকস্মাৎ মৃদু করাঘাত, শুনতে পাচ্ছ?
পাচ্ছি নন্দিন। কী চাও এই অসময়ে?
অসময় কেন হবে? শুনতে পাই তুমি চিরজাগ্রত, চির তৎপর। তোমার কি বিশ্রামের প্রয়োজন হয়?
না নন্দিন। আমার সময় নেই। এখন বিরক্ত কোরো না।
আমি এলে বুঝি তোমার সময় নষ্ট হয়? এই আমি বসে রইলুম তোমার দোরগোড়ায়। এখানে বসে আমি বারবার তোমার দরজায় করাঘাত করব। চেঁচিয়ে গান গাইব, আপন মনে কথা কইব, যতক্ষণ তুমি দরজা না খোলো।
তোমার বুঝি কাজ নেই। কিন্তু আমার যে অনেক কাজ। মাটির অতল থেকে উঠে আসছে সোনা, থরে বিথরে সেসব আমি সাজিয়ে তুলছি। এই বিপুল সম্পদের দায় তো কম নয়! এখন কি আমার অকাজের কথা বলার অবকাশ আছে? তোমার রঞ্জন আসছে, সে তোমার অবকাশ ভরিয়ে দেবে। আমাকে কাজ করতে দাও।
শোনো রাজা, আমার রঞ্জন আসবে বলে কি তোমার হিংসে হয়?
না নন্দিন। আমার তুচ্ছ কোনও হৃদয়দৌর্বল্য নেই। আমি কাজের লোক।
আজ তোমাকে একটা কথা বলব।
আজ নয়। অন্য দিন এসো।
আজ না বললে যদি আর বলার সময় না হয়?
তা হলে বাইরে থেকে বলো, আমি শুনছি।
আমার রঞ্জন আসবে, তবু আমি বারবার তোমার কাছে কেন ছুটে আসি তা বুঝতে পারো না রাজা?
বুঝবার দরকার কী নন্দিন? বাইরে দখিনা বাতাস বয়ে যায়, পূর্ণিমার চাঁদ ওঠে, ফুলের গন্ধে বাতাস মাতাল হয়, আমি সব টের পাই, কিন্তু আমার যে আনমনা হতে নেই।
শুধু কাজ? শুধু সঞ্চয়? শুধু সোনার গারদে আত্মনির্বাসন?
