অমল চারদিকে চেয়ে যেন সংবিৎ ফিরে পেল। ভারী অপ্রস্তুত হয়ে বলল, এটা তোদের বাড়ি বুঝি!
হ্যাঁ তো! আপনি চিনতে পারেননি?
অমল একটু হেসে বলল, আসলে আমি পথ-টথগুলো কেমন গুলিয়ে ফেলেছিলাম।
পথ গুলিয়ে ফেলেছিলেন! সে কী!
অমল একটু লজ্জা পেয়ে হেসে বলল, আজকাল খুব অন্যমনস্ক থাকি তো। খুব ভোরে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পথ-টথ সব এলোমেলো হয়ে গেল। তারপর একটা লোক ডেকে এনে এখানে বসাল। বলল, চা খাওয়াবে।
লোকটা কে বলুন তো?
ঠোঁট উলটে অমল বলল, চিনি না। ঢ্যাঙা, রোগামতো। বলল, বাবু, আমি আপনাকে চিনি। আপনি অনেক লেখাপড়া জানেন বলে শুনেছি, আজ আপনার কাছে কয়েকটা কথা শুনব। জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা আমার খুব ভাল লাগে। এই বলে নিয়ে এল।
পান্না হেসে ফেলে বলল, ও তো সুদর্শনদা, আমাদের রাঁধুনি।
তাই হবে। লোকটা খুব বকবক করে, তাই না?
হ্যাঁ। কিন্তু আপনাকে বসিয়ে রেখে সে গেল কোথায়?
বলল, গিন্নিমা এখনও ওঠেননি বাবু, দাঁড়ান, দোকান থেকে আপনার জন্য ভাল বিস্কুট নিয়ে আসি।
আপনি উঠুন তো, বৈঠকখানায় এসে বসুন। আমি চা করে দিচ্ছি।
অমল লজ্জা পেয়ে বলে, তুই দিবি।
হ্যাঁ, আসুন। ইস, আমার যে কী ভীষণ লজ্জা করছে! আপনি দাওয়ায় বসে আছেন! ছিঃ ছিঃ!
তাতে কী হয়েছে। তোদের বাড়ির দাওয়ায় বসলে কি আমার মান যায়? এ-গাঁয়ের ধুলো মেখে বড় হয়েছি। হ্যাঁ রে, রামহরিকাকা, কাকিমা সব ভাল তো?
হ্যাঁ।
কতকাল দেখাসাক্ষাৎ নেই। তোর সঙ্গে সোহাগের খুব ভাব, তাই না?
হ্যাঁ। সোহাগ খুব ভাল মেয়ে।
ভারী আনমনা হয়ে খানিকক্ষণ ভ্যাবলা চোখে চেয়ে থেকে অমল বলল, সবাই ভাল। কিন্তু আমার সঙ্গেই কারও বনল না।
অমল উঠল। বৈঠকখানায় এসে বসল।
আপনি ভীষণ রোগা হয়ে গেছেন অমলদা!
বয়স হচ্ছে। এখন ফ্যাট ঝরে গেলেই তো ভাল।
এই শীতে শুধু একটা সোয়েটার পরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন! শীত লাগে না আপনার! আমি তো সকালে লেপ ছেড়ে উঠতেই পারি না।
হাঁটলে গা গরম হয়ে যায় তো, তাই আর চাদর-টাদর নিইনি।
বসুন, আমি চা করে আনছি।
রান্নাঘরে এসে পান্না দেখল, সুদর্শন ঠোঙায় বিস্কুট এনে চায়ের জল চাপিয়েছে।
সুদর্শনদা! তুমি কী লোক বলো তো! কাকে এনে দাওয়ায় বসিয়ে রেখেছিলে জানো?
সুদর্শন এক গাল হেসে বলে, তা জানি দিদি। সবাই বাবুকে জানে। মাথা-পাগলা আছেন বটে, কিন্তু পেটে মেলা বিদ্যে। তাই তো রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে এলুম। বেভুল ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন।
তোমার আক্কেল যে কবে হবে। বৈঠকখানায় তো বসাতে পারতে! অত বড় মান্যিগন্যি লোককে কি দাওয়ায় বসায়? আমার ঘরের বারান্দায় চেয়ারও তো ছিল?
কী জানি দিদি, ওসব করতে গেলে গিন্নিমা যদি চটে যায়। তাই সাহস করিনি। চা খাওয়াতেও দোনোমোনো করছিলাম। হিসেবের বাড়ি তো!
চিমটিকাটা কথা। তবে গায়ে মাখল না পান্না। বলল, একটা প্লেট দাও, বিস্কুটটা সাজিয়ে নিয়ে যাই।
সুদর্শন একটু দুঃখ করে বলল, ঘরে নিয়ে বসালে দিদি, তা হলে আর বাবুর সঙ্গে কথাটথা হল না। আজকে। দাওয়ায় বসলে দিব্যি কথা হত দুজনে। নাগালের বাইরে নিয়ে ফেললে তো।
থামো তো! উনি হেঁজিপেঁজি লোক নাকি?
ওই তো হয়েছে মুশকিল। এসব লোককে হাতের নাগালে পাওয়া চাঁদ পাওয়ার শামিল। আজ জুতমতো পেয়েছিলুম দিদি, দিলে তুমি সব ভণ্ডুল করে।
তোমার কী কথা বলো তো অমলদার সঙ্গে।
সুদর্শন একটু লজ্জার হাসি হেসে বলে, এই নানা রকম কথাই তো মনে আসে। দু-একটা কথা জিজ্ঞেস করে নিতুম আর কী। এই ধরো নমঃশূদ্রের মেয়ের সঙ্গে পৌণ্ড্রক্ষত্রিয়ের ছেলের বিয়ে হলে সেটা অনুলোম না প্রতিলোম হচ্ছে। তারপর ধরো বলরামের মা বাবার একটু গোলমেলে বিয়ে ছিল, তা হলে বলরামের বর্ণটা আসলে কী হবে। তারপর ধরো…
দুর! তোমার যত আজগুবি কথা। ওসব কি অমলদা জানে নাকি? অমলদা বিলেত আমেরিকায় ছিল, সাহেব মানুষ, সায়েন্টিস্ট। ওসব জাতপাতের খবর রাখার কথাই নয় তার।
কিন্তু দিদি, এও তো সায়েন্স।
তোমার মুণ্ডু। এবার চা-টা ভাল করে বানাও। গুচ্ছের চিনি দিও না যেন, আর লিকার বেশি ঘন করবে না। পাতলামতো হবে।
অ্যাঁ। বলে অবাক হয়ে সুদর্শন কিছুক্ষণ তার দিকে চেয়ে থেকে বলে, ওই কি তোমাদের ভাল চা?
হ্যাঁ তো!
আমরা তো ভাল চা বলতে বুঝি কড়া লিকার, কড়া মিষ্টি, ঘন দুধের গন্ধ।
সে হল গরিবদের চা। বড় মানুষরা কি ওরকম চা খায়?
তুমি তো বলেই খালাস। ওদিকে বাবু কী বলেছে জানো?
কী?
যখন চা খাওয়াবো বলে ধরে আনছিলাম তখন বাবু নিজে থেকেই বলল পানসে চা খেতে পারি না বাপু, চা হবে কড়া লিকার আর খুব মিষ্টি। ওপরে সরের টুকরো ভাসবে। আর মুড়ি ছড়িয়ে দিয়ে সুড়ুৎ সুড়ুৎ করে খাবো।
বলল ও কথা?
হ্যাঁ গো।
তবে তাই করো। কী জানি বাবা, অমলদার হয়তো অন্য রকম রুচি।
পান্না ফিরে এসে দেখল, অমল সোফায় বসে ঘাড় কাত করে ঘুমিয়ে পড়েছে। গভীর ঘুম। চোখের কোলে কালি পড়েছে লোকটার। গালের হনু দুটো উঁচু। কী মলিন বেশবাস। এ লোক যে ওরকম সাংঘাতিক স্কলার ছিল কে বলবে এখন দেখে? বয়সও তো খুব বেশি নয়। চুয়াল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ হবে বোধহয়। কিন্তু এর মধ্যেই যেন কেমন শরীরে যৌবনের টান চলে গেছে, জবুথবু ভাব।
পাশের ঘরে মায়ের ঘুম ভেঙেছে।
ও ঘরে কে রে?
আমি মা!
ও ঘরে কী করছিস?
