সুদর্শন এক গাল হেসে বলে, কাঁড়ি পোস্ত তো লাগে না। একটু হলেই হয়। রাইসর্ষে মিশিয়ে দিলে দিব্যি পোস্তর মতোই লাগবে খন।
না বাপু, সর্ষেবাটা পেটের পক্ষে ভাল নয়। ও যা হচ্ছে তাই হোক। শীতকালে তো সবজির অভাব নেই। মাছও তো হচ্ছে। পোস্ত না হয় গ্রীষ্মে বর্ষায় করা যাবে।
সুদর্শন বেশ মুখের ওপরেই বলে দিল, আপনারা একটু হিসেবি মানুষ, না?
সুদর্শন আলাপি মানুষ। দু-চারদিনের মধ্যেই দেখা গেল পাড়ার লোকের সঙ্গে দিব্যি ভাবসাব জমে গেছে তার। দুপুরের দিকে খাওয়ার পর পশ্চিমের ঘরের নির্জন বারান্দায় আশপাশের কয়েকজনা আসে বেশ। কথাটথা কয়।
মা বলে, ও সুদর্শন, বলি অত আড্ডা কীসের? এবাড়ি ও-বাড়ি কথা চালাচালি কিন্তু ভাল নয় বাপু।
ধর্মের কথা কি খারাপ কিছু মা?
কী জানি বাপু কী কথা। অত কথায় কাজ কী?
কথা নইলে কি কাজ হয় মা? মানুষের কথাই তো সম্বল।
সুদর্শনকে নানা কারণেই পছন্দ হচ্ছে না মায়ের। ঠিক যেন মাইনে করা কাজের লোকের মতো নয়। একটু ব্যক্তিত্ব আছে, নিজের মতামত আছে, যা-তা বললেই মেনে নেয় না। আবার ঝগড়াও করে না। আসল কথা লোকটা একটু জানেশোনে, একটু যাকে বলে আপারহ্যান্ডও নেয়। ওইটে মায়ের সহ্য হচ্ছে না।
কিন্তু এই ক্ষ্যাপাটে গোছের লোকটাকে পান্নার ভারী পছন্দ। ধারেকাছে এরকম একটা লোক থাকলে মাঝে মাঝে নিজেদের একটু দীন লাগে বটে, কিন্তু ভালও লাগে। একদিন মা একটু বড়মার কাছে বেড়াতে গিয়েছিল। তখন চুপ করে সুদর্শন একজন ভিখিরিকে পাছদুয়ারের কাছে বসিয়ে ভাত দিয়েছিল চাট্টি। পান্না দেখে ফেলেছিল।
ও সুদর্শনদা, ওকে কার ভাগের ভাত দিলে? তোমার ভাগের নাকি? নিজের ভাগটুকু অতজনকে দিলে তুমি যে উপোস করে মরবে!
সুদর্শন এক গাল হেসে বলল, না দিদি, নিজের ভাগেরটা দিইনি। দুজন মুনিশ আজ কাজে আসেনি। তাদেরটাই দিচ্ছি। ভাল করিনি?
পান্না একটু হেসে বলল, ভালই তো। কিন্তু বকুনি খেও না যেন!
সুদর্শনের শাস্ত্রজ্ঞান আছে। রামায়ণ-মহাভারত ভাল পড়া। কে কার মা, কে কার বাপ, কে কার ছেলে এসব তার ভুল হয় না কখনও। সে এ-বাড়িতে আসার পর এ-পাড়ায় একটা রটনা হয়েছে, সুদর্শন লোকটা সাধারণ মানুষ নয়। ওর ভিতরে বিভূতি-টিভূতি কিছু আছে।
কথাটা বলতে এসে একদিন পাড়ার পালগিন্নি মায়ের কাছে খুব ঠোনা খেল। মা বলল, তোমাদের যত অলক্ষুণে কথা। বলি যার বিভূতি থাকে তার কি পেটের রোগ হয়? নাকি পরের বাড়িতে গতর খাটিয়ে খায়?
পালগিন্নি মিনমিন করে বলল, ওঁরা অমন সেজে থাকেন কিনা!
তোমার মুন্ডু। দু-চার পাতা বই পড়েনি তা বলছি না। তা বলে বিদ্যেসাগরও তো নয়। টক করে গাছে তুলে দাও ওই তোমাদের দোষ।
পাড়াটা এখন ফাঁকা। পারুলদি তার নতুন এসি গাড়ি করে চলে গেল জামশেদপুর। সোহাগ আর তার মা ফিরে গেছে কলকাতায়। পান্নার এখন পড়াশুনোর চাপ। হায়ার সেকেন্ডারির সিলেবাস তো কম না। স্কুলেও যেতে হচ্ছে।
সকালবেলায় লেপমুড়ি দিয়ে বিছানায় বসেই পড়ছিল পান্না। এত ভোরে লেপের ওম ছেড়ে উঠতে ইচ্ছেও হয় না। চোখেমুখে জল দেওয়া হয়নি, বাথরুমে যাওয়া হয়নি, দাঁত মাজা হয়নি। আজ একটা ক্লাস পরীক্ষা আছে ইংরিজির। এই একটা বিষয়েই সে বেশি নম্বর পায়। গত মাসে চিরশ্রী তাকে টপকে গিয়েছিল। এবার চিরশ্রীকে টপকানোর জন্য সে প্রাণপণ করছে। পাশেই শুয়ে ঘুমোচ্ছে হীরা। অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমোয়। মা ওকে কিছু বলে না। পান্না জানে এ-বাড়িতে তারই আদর সবচেয়ে কম। সে বেলা পর্যন্ত ঘুমোলে মা কটকট করে কত কথা শোনাত!
আলো আসার জন্য সুমুখের জানালাটা অল্প ফাঁক করে রেখেছিল সে। ওই ফঁকটুকু দিয়ে একটু আগে ডালে লঙ্কা ফোড়নের গন্ধ পেয়েছে সে। সেই ফঁকটুকু দিয়েই হঠাৎ চোখ তুলে সে দেখতে পেল, তাদের রান্নাঘরের দাওয়ায় উসকো-খুসকো চুল, খোঁচা-খোঁচা দাড়িওয়ালা একটা লোক বসে আছে। এখনও রোদ ওঠেনি বলে উঠোনের কমজোরি আলোয় মুখখানা চিনতে পারল না পান্না। এত সকালে কে এল রে বাবা? তাও রান্নাঘরের দাওয়ায় বসা! পাগল-টাগল ঢুকে পড়ল নাকি? পাগলকে তার ভীষণ ভয়।
জানালাটা একটু ফাঁক করে পান্না চেঁচিয়ে ডাকল, সুদর্শনদা! ও সুদর্শনদা! দেখ তো কে এসেছে।
কেউ সাড়া দিল না। লোকটা যেমনকে তেমন বসে রয়েছে।
হীরা বিরক্ত হয়ে পাশ ফিরে বলল, সকালবেলাতে অমন করে চেঁচাচ্ছিস কেন? ঘুমটা ভেঙে গেল।
চেঁচাব না! কে একটা উটকো লোক ঢুকে পড়েছে বাড়িতে।
কে আবার ঢুকবে! ভিখিরি-টিকিরি হবে বোধহয়। সুদর্শনদার তো অনেক পুষ্যি।
মনে হচ্ছে পাগল।
যাঃ!
হ্যাঁ রে, কেমন যেন চেহারা।
হীরা আবার ঘুমোল।
পান্নার পড়া মাথায় উঠল। সে লেপ ছেড়ে উঠে জানালার কাছে গিয়ে উঁকি মেরে দেখতে গিয়ে চমকে উঠল। অমলদা না! এত সকালে অমলদা এসে রান্নাঘরের দাওয়ায় বসে আছে কেন? এ মা! ছিঃ ছিঃ! কত বড় মানুষ!
গরম চাদরটা টেনে গায়ে জড়িয়ে চটি পায়ে গলিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এল পান্না।
অমলদা! আপনি দাওয়ায় বসে আছেন কেন?
অমল তার দিকে তাকাল। সে তাকানোর মধ্যে কোনও স্মৃতি নেই। ভ্যাবলা চোখ। তাকে চিনতে পারছে না।
অবাক হয়ে অমল বলল, তুমি কে বলো তো!
ও মা! আমাকে চিনতে পারছেন না? আমি পান্না। রামহরি চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে।
