জিজিবুড়ি, বাবা যদি জানতে পারে, তুমি এসব কথা বলেছ, তাহলে কিন্তু কুরুক্ষেত্র হয়ে যাবে।
ওই দেখ, কী এমন খারাপ কথা বললুম বল তো! তোদের ভালর জন্যই তো বলা, নাকি! বাঙালের কানে কথাটা তুলবি কেন রে বোকা? সেই তো নষ্টের গোড়া। তোদের আর এজন্মে আক্কেল হবে না।
দিদি মোটেই শ্যাওড়াগাছের পেত্নী নয়।
আহা, তবে কি রম্ভা মেনকা নাকি? হাড়গিলে চেহারা, কেলে কুষ্টি, গেছো মেয়েছেলে। এই তো শুনলুম বেলগাছে উঠে নাকি বেল পাড়ছিল। শুনেছিস কখনও মেয়েছেলে বেলগাছে ওঠে? ও হল বামুন গাছ। যে মেয়েছেলে বেলগাছে ওঠে সে হল ডাকিনী-যোগিনী। বুঝলি? কালও তো সন্ধেবেলায় দেখলুম, এলোচুলে ছাদে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সন্ধেবেলা এলোচুলে কারা ঘুরে বেড়ায় জানিস? ডাইনিরা। কোন মন্তরে তোকে বশ করেছে কে জানে। এর পর কোনওদিন দেখব, ভেড়া হয়ে পাছু পাছু ঘুরে বেড়াচ্ছিস।
চোখ ফেটে জল আসছিল মরণের। দিদিটাকে সে সত্যিই খুব ভালবাসে। সে বলল, এখন তুমি যাও জিজিবুড়ি।
যাচ্ছি বাবা যাচ্ছি। মেয়েটাকে বাঙালের ঘরে দিয়ে যে কী পাপই করেছি বাবা, দিনরাত বুকটা ধড়াস ধড়াস করে। বিয়ের ভড়ং করে মেয়েটার মাথা চিবিয়ে খেল। বোকা মেয়ে বুঝতেও পারছে না, দোরগোড়ায় সর্বনাশ এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এখন শক্ত না হলে কি জোতজমি, বিষয়-আশয় কিছু থাকবে? সব ফক্কা হয়ে যাবে একদিন দেখিস। তখন বাবা, আমে-দুধে মিশে যাবে আর তোরা আঁটি চুষবি। আমি হলে কবে কুলোর বাতাস দিয়ে বিদেয় করতুম। হরেন কাঁপালিককে ধরেছি, এখন দেখি সে কী করে। তোর মায়ের বটুয়া থেকে পঁচিশটা টাকা সরিয়ে এনে চুপটি করে আমাকে দিবি ভাই?
টাকা! টাকা দেব কেন?
হরেন চেয়েছে।
শঙ্কিত মরণ জিজ্ঞেস করে, হরেন ঠাকুর কী করবে জিজিবুড়ি?
জিজিবুড়ি ঝেঁঝে উঠে বলল, ওই আঁটকুড়ির ব্যাটার কি আর সাধন-ভজন আছে, নাকি ভক্তি আছে! দিনরাত দিশি মদ চাপান দিয়ে পড়ে থাকে, গাঁজা, চরস, গুলি কোন গুণটা নেই? তার কি আর বাণ-বশীকরণের তেমন ক্ষ্যামতা আছে? তবু জোর ধরে পড়েছি, যদি লেগে যায়। পঁচিশ টাকায় কি আর রাজি হয়! তার খাই অনেক। তবু ঘাড় কাত তো করেছে। এখন দেখা যাক। কাজ না হলে আমিও তো সোজা পাত্রী নই, ঝেড়ে কাপড় পরাব। যা দাদা, টক করে নিয়ে আয়।
ও আমি পারব না জিজিবুড়ি।
ওরে তোদের ভালর জন্যই তো করছি।
বাণ মারা বুঝি ভাল?
যেমন কুকুর তার তেমন মুগুর তো চাই রে ভাই। ওরা কি সোজা ত্যাঁদড়?
না, জিজিবুড়ি, আমি টাকা আনতে পারব না।
তোদের কপালে কী লেখা আছে জানিস? তোবড়ানো বাটি হাতে নিয়ে দোরে দোরে ঘুরে ভিক্ষে করবি। নিজের ভাল যে বোঝে না তাকে কে বোঝাবে বাবা?
তুমি যে হরেন ঠাকুরকে বাণ মারতে বলেছ, তা বাবাকে বলে দেব।
দুর হ গু-খেগোর ব্যাটা। ছিঃ দাদা, ওসব কি বলতে আছে? আচ্ছা না হয় থাকগে। বলিসনি যেন।
.
৪৯.
লম্বা বাঁশের ডগায় পায়রার মাচান। বাঁশটাকে চিরে তাতে আটকানো হয়েছে কঞ্চির চৌখুপি। পায়রারা এমনই উঁচু জায়গায় বসতে ভালবাসে। দুদিন ধরে খেটেখুটে পায়রাদের বসবার জন্য জিনিসটা বানিয়েছে সুদর্শন। তাদের বাড়িতে নাকি ছিল। একটু মাথা-পাগলা আছে বটে লোকটা। কাক, কুকুর, বেড়াল, পায়রা, চড়াইপাখি সবার ওপর খুব দরদ। এসেছে তো মাত্র কয়েকদিন, এর মধ্যেই বাড়ির আর পাড়ার রাজ্যের বেড়াল-কুকুর তার সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে, রান্নাঘরের সামনে উঠোনে এসে বসে থাকে খাপ পেতে। সুদর্শন তাদের রুটি, বিস্কুট, মুড়ি, চালভাজা যা হোক খাওয়ায়। নিজের বরাদ্দের খাবার থেকেই দেয় বেশির ভাগ।
মা রাগ করে বলে, এ তোমার বড় বাড়াবাড়ি হচ্ছে বাপু। নিজের ভাতটুকুর আধা-আধিই তো দেখছি রোজ কাক-কুকুরকে খাওয়াচ্ছ! বলি অত লাই দেওয়া কি ভাল। লোভ দেখালে রাজ্যের নেড়ি কুকুর এসে আড্ডা গাড়বে।
তা মা, ভূতভুজ্যি বলেও তো একটা জিনিস আছে।
জন্মে শুনিনি বাপু।
চারদিকে উপোসি আত্মা থাকা কি ভাল মা? দিয়ে-থুয়ে খেতে হয়। আজকাল বাবুদের বাড়িতে দানধ্যান উঠে যাচ্ছে, ভূতভুজি নেই, ব্রাহ্মণভোজন নেই, কাঙালিরা একমুঠো ভাত পায় না, ভিখিরিকে ভিক্ষে দেয় না।
মা গজ গজ করে। তার কারণও আছে। এ বাড়িতে দানধ্যানের পাট নেই তেমন। ভিখিরিরা গাঁয়ের বা আশেপাশের মানুষ, তারা বাড়ি চেনে। এবাড়িমুখো বড় একটা হয় না। মা একটু আছে ওইরকম। ব্যাপারটা ভাল না মন্দ তা পান্না কখনও ভেবে দেখেনি। জন্ম থেকেই দেখে আসছে, তারও ওরকমই অভ্যেস হয়ে গেছে, কিন্তু এখন এই উটকো লোকটা এসে কিছু গণ্ডগোল পাকিয়ে তুলেছে। কথাগুলো একটু ক্যাটক্যাটে বটে, কিন্তু বেশ উচিত কথা বলেই পান্নার মনে হয়।
মার ভয় ছিল, লোকটা হয়তো বেশি খাবে। রোগাপানা লোকেরাই নাকি বেশি খায়। কিন্তু দেখা গেল, খাওয়ার চেয়ে খাওয়ানোতেই সুদর্শনের আনন্দ বেশি। তার পাতের ভাত অধিকাংশই যায় কুকুর বেড়ালের পেটে।
রান্নাটা খারাপ করে না। আহামরি না হলেও খাওয়া যায়। একটু দুখে রান্না। তেল-মশলা হাত টেনে দেয়। সেটা এ-বাড়ির হিসেবি মানুষদের পছন্দই।
একদিন মাকে বলল, হ্যাঁ মা, আমরা বীরভূমের লোক, খুব পোস্ত হয় ওদিকে। তা বর্ধমানের লোকে কি পোস্ত খায় না?
মা মুখটা গোঁজ করে বলল, তা খাবে না কেন? আগে খুব হত। এখন পোস্তর যা দাম।
