ও দিদি, পড়ে যাবে যে!
অত সোজা নয়।
তুমি বেশ ডানপিটে আছ কিন্তু।
সবাই তাই বলে। তুই কি ভাবিস তুই একাই ডানপিটে?
দিদিটাকে তাই মরণের বড্ড ভাল লেগে গেছে। মাত্র দু-তিন দিনেই সে দিদির খুব কাছ-ঘেঁষা হয়ে গেছে।
খানিকক্ষণ দিদি উঠোনে ঘোরাফেরা করল। কয়েকটা কুকুরছানা এ ওর গায়ে উঠে খেলছিল, সেগুলোকে আদর করল খানিক। তারপর বোধহয় হঠাৎ মরণের কথা মনে পড়ল।
জানালার কাছে এসে বলল, অ্যাই!
মরণ একগাল হেসে বলল, কী দিদি?
এতক্ষণ হা করে জানালার দিকে চেয়ে বসেছিলি কেন রে? তোর পড়া নেই?
হয়ে গেছে তো!
পুঁটি হেসে ফেলে বলে, হয়ে গেছে না হাতি! পড়া ধরলেই তো এখন মুখ শুকিয়ে যাবে।
কোন ভোর থেকে পড়ছি যে!
কেমন পড়ছিস খুব জানি। ওই বুড়োটা কে রে? বাবার সঙ্গে বসে গল্প করছে।
ও হচ্ছে কাষ্ঠদাদু।
কাষ্ঠদাদু! সে আবার কী! কাষ্ঠ মানে তো কাঠ।
দাদুর পদবি কাষ্ঠ যে!
যাঃ!
সত্যি!
হি হি করে হেসে পুঁটি বলে, তোদের গ্রামটাই ভারী মজার। জন্মে কখনও কাষ্ঠদাদু শুনিনি বাপু। লোকটা কী করে?
কিছু করে না। ঘুরে বেড়ায়।
বাঃ, বেশ তো! শুধু ঘুরে বেড়ায়?
কাষ্ঠদাদুই তো আজ আমাদের পাম্পসেট সারাবে। কাষ্ঠদাদুর লোকেরা আসবে বলে বসে আছে।
তাই বল, মিস্তিরি।
না, কাষ্ঠদাদু মিস্তিরিও নয়।
তাহলে মেশিন সারাবে কী করে?
কাষ্ঠদাদু সব জানে। কিন্তু কিছু করে না।
পুঁটি হঠাৎ ভ্রূ কুঁচকে বলল, আচ্ছা আমার নাম যদি সুমনা কাষ্ঠ হত তাহলে কেমন হত বল তো!
বিচ্ছিরি।
সাহার চেয়ে ভালই হত। ইন্টারেস্টিং সারনেম। তুই হতি মরণ কাষ্ঠ।
যাঃ!
অনেক পড়ার ভান হয়েছে। এখন বেরিয়ে আয় তো। চল একটু ঘুরে আসি।
এই ডাকটুকুর অপেক্ষাতেই ছিল মরণ। বইখাতা বন্ধ করে দুটো লাফ মেরে বেরিয়ে এল।
চলো।
কোথায় যাব বল তো! চল আজ তোর পান্নাদিকে দেখে আসি।
চলো তাহলে।
এই যে দিদিটাকে সে এত ভালবাসে, এটা ঠিক হচ্ছে কিনা এ নিয়ে তার একটা ধন্ধ আছে। জিজিবুড়ি মাঝে মাঝে ঘরের পিছন দিয়ে তার জানালায় উঁকি মারে। সেদিন এসে বলল, ওরে মুখপোড়া, অত গাল ভরে ভরে দাদা দিদি বলে যে ডাকিস, ওরা কি সত্যিই তোর কেউ হয়? জন্মে তোদের মতো আহাম্মক দেখিনি বাপু৷ বলি ওদের সঙ্গে অমন নেই-আঁকড়েপনা করতে আছে? মতলব তো জানিস না!
অবাক হয়ে মরণ বলেছিল, মতলব! কীসের মতলব?
পেটের কথা সব টেনে বের করতে এয়েচে। তুই তো তোর মায়ের মতোই বোকা। কত বোঝালুম বাসন্তীকে, ওলো, সতীনপো, সতীন-ঝিকে নিয়ে অমন মেতে থাকিনা। একটু রাশ টেনে চল। তা কান দিচ্ছে কথায়? জান চুঁইয়ে ওদের খুশি করতে লেগেছে। বলি দুনিয়ার নিয়ম কি তুই উলটে দিতে পারবি রে আহাম্মক। সতীনের ছায়েরা কখনও আপনা হয়? বরং তোর ভালমানুষি দেখে ঘাড়ে চেপে বসবে।
মৃদু প্রতিবাদ করে মরণ বলল, কী বলছ জিজিবুড়ি! দিদিটা তো ভীষণ ভাল।
ওরে, অমন সেজে থাকে। চোখ দুটো দেখিস, মিটমিটে শয়তানি ঘাপটি মেরে আছে ভিতরে। শুনলুম তো একরাত্তির থেকে চলে যাবে। গেল? আজ তিন দিন গ্যাঁট হয়ে বসে আছে।
মা-ই তো যেতে দেয়নি। বলেছে, এই প্রথম এলে, এখনই যাবে কী? তোমাকে তো ভাল করে দেখলুমই না।
ওই তো, নিজের পায়ে কুড়ুল মেরে বসে রইল। সাধে কি বলি আহাম্মকের গু তিন জায়গায়? ঘটে বুদ্ধি থাকলে প্রথম থেকেই শক্ত হয়ে কোমর বেঁধে রুখে দাঁড়ালে এবাড়িতে মৌরসিপাট্টা গেড়ে বসতে পারত না।
দাদা দিদিকে খারাপ বলছ কেন জিজিবুড়ি? ওরা তো কিছু করেনি!
তুই তো আর একটা হাঁদা গঙ্গারাম। বুঝবি কী করে? ওপর ওপর ভালমানুষি দেখাচ্ছে, তলায় তলায় কাজ সারছে। এই যে আসা-যাওয়া শুরু হল, এ কি ভাল হচ্ছে? খাল বেয়ে কুমির আসছে বই তো নয়। এই যে ঢুকল এই কিন্তু ঢুকে পড়ল। আর বেরোবে ভেবেছিস? ছুতোয়নাতায় এসে হাজির হবে। এখন তো ছানাপোনা পাঠাচ্ছে, এর পর রাঘব-বোয়ালটাও এসে ঢুকবে, বুঝলি? তোর আহাম্মক মাকে দিয়ে পা টেপাবে, দাসীগিরি করাবে। আর তোরা হবি সব চাকরবাকর।
ভয় খেয়ে মরণ বলে, ধ্যাত, কী যে বল না!
দুর মুখপোড়া, ঘটে বুদ্ধি থাকলে ঠিক বুঝতে পারতিস। বাঙালরা সব বশীকরণ বিদ্যে নিয়েই জন্মায়, বুঝলি! ওসব বিদ্যেধর বিদ্যেধরী, এমন ভাবখানা করবে যেন চোখে হারাচ্ছে। দাঁত নখ সব লুকিয়ে রাখছে এখন, বুঝলি? যখন হালুম করে ঘাড়ে এসে পড়বে তখন তোদের আক্কেল হবে।
মরণ কঁদো কাঁদো হয়ে বলে, ওরা মোটেই ওরকম নয়। দিদি তো আমাকে কত ভালবাসে!
আহা আবার গাল ভরে দিদি ডাকা হচ্ছে! তা হ্যাঁ রে, তোর কি দিদির অভাব? তা যা না কুসুমদির কাছে, টগরদির কাছে। তারা দেখিস কত ভাল। মামাতো দিদি সব, এক গাঁয়ে মানুষ, মায়ের পেটের দিদির মতোই তো!
এ কথায় মরণ একটু ভয় খায়। তার মামাতো দিদিদের সে খুব চেনে। এমন ঝগড়ুটে যে বলার নয়। লেখাপড়ার বালাই নেই তাদের। দেখা-সাক্ষাৎ হলে বাঁকা বাঁকা কথা শোনায় খুব। তোরা তো বড়লোক। তোর মা তো বাবুর রাখা-মেয়েমানুষ। বাঙালদের পূর্বপুরুষেরা সব রাক্ষস ছিল… এমনি সব কথা।
মরণ টপ করে বলল, না, আমার দিদির দরকার নেই তো!
আহা, ও কি কথা! দরকার আবার কারও হয় নাকি?
কুসুমদি, টগরদির সঙ্গে মিশতে মা বারণ করেছে।
ওই তো ওর দোষ। আপনার জন ছেড়ে শত্তুরের ভজনা করতে লেগেছে। বলি কী, ওই শ্যাওড়াগাছের পেত্নীটাকে একবার ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে আয় না মামাবাড়িতে। টগর আর কুসুমের মুখে ফেলে দে। দেখবি বিষ একেবারে ঝেড়ে দেবে। গাঁ ছেড়ে পালানোর পথ পাবে না। তোদের ভালর জন্যই বলছি। নিজেরা না পারিস, আমরা সব আপনজনেরা তো আছি, দে না আমাদের হাতে ছেড়ে।
