অন্যের লেঙ্গুর ধইরা পইড়া থাকলে তো ওই রকমই হয়।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরেন বলে, যা বলেছ।
আমার বউ কয়, ধীরেন খুড়া কলকবজা খুব ভাল চিনে। খুড়া হাত লাগাইলেই কল কথা কয়। তা হইলে খুড়া, আপনে তো মেলা পয়সা করতে পারতেন!
মাথা নেড়ে ধীরেন বলে, না হে বাপু, গাঁ-দেশে কলকবজার কাজ কোথায়? এই গাঁয়ে তো ওভারহেড ট্যাঙ্কের বালাই ছিল না। পুকুর আর টিউবওয়েল। ইদানীং চার-পাঁচজন করেছে বটে। আমি বোকা তোক তো, তাই যা পারি শিখেছি। কিন্তু কোনওটাই কাজ দেয়নি। কলকবজা বরাবর খুব ভাল লাগত আমার। ইলেকট্রনিক ব্যাপারটা বুঝতে পারি না বটে, কিন্তু সাবেক যন্ত্রপাতি, কলকবজা খানিকটা চিনি। গাঁ-দেশে ও বিদ্যের কদর নেই।
.
সকাল সাড়ে আটটা বাজে। পড়ার ঘর থেকে মরণ বারবার উঁকি মেরে দেখছিল মিস্তিরিরা এসেছে কিনা। মিস্তিরিরা এলে তার সুবিধে হয়। সবাই হুড়োহুড়ি করে পাম্পসেট নিয়ে পড়বে। গোলে হরিবোল দিয়ে সেও উঠে পড়তে পারবে। কিন্তু সেটা আর হয়ে উঠছে না। মিস্তিরিরা আসতে যে কেন এত দেরি করছে কে জানে! বাবা আর ধীরেনদাদু কখন থেকে উঠোনে বসে কথা কয়ে যাচ্ছে।
ওই দিদি নামছে সিঁড়ি দিয়ে। চোখে এখনও ঘুম। দাদা আর দিদি দুজনেই বেলা করে ঘুম থেকে ওঠে। কালও অনেক রাত অবধি টিভি দেখেছে সবাই মিলে। শুধু মরণকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। মরণের নাকি টিভি দেখতে নেই। মরণের কপালটাই এরকম। বাড়িতে একটা নতুন জিনিস এল, অমনি মরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়ে গেল। মরণের অবশ্য দুঃখ নেই। এবাড়ি সে বাড়ি ঘুরে সে ইচ্ছে করলে টিভি দেখতেই পারে। তবে কিনা তার টিভি দেখার বেশি নেশা নেই। তার চেয়ে মাঠঘাট, উধাও আকাশ, পাঁই-পাঁই করে ছুট, তার বেশি ভাল লাগে।
.
নামতে নামতে দিদি একটা হাই তুলল। ঘুম-চোখে চারদিকটা দেখল। ইস্, এখন যদি দিদির মরণের কথা মনে পড়ে তবে বড্ড ভাল হয়। একবার ডাকলেই সে এক লাফে গিয়ে দিদির সঙ্গে জুটে যেতে পারে। তাহলে বাবা আর কিছু বলবে না। মরণ দেখেছে, তার বাঙাল বাবার দিদির ওপরেই একটু বেশি টান। এই যেমন এ-বাড়িতেও বাবা হাম্মিকেই বেশি ভালবাসে, তাকে দুর-ছাই করে।
কিন্তু দিদিও ডাকল না তাকে। কিছুক্ষণ উঠোনে দাঁড়িয়ে চারদিকে চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগল। গায়ে ফুলহাতা সোয়েটার। তার ওপর গরম চাদর। দিদি বলে, ইস, তোদের এখানে এত ঠান্ডা কেন রে? সবই যেন তোদের বেশি-বেশি।
মরণ খুব হি হি করে হাসে। বলে, তোমার বড্ড শীত, না? তাহলে তুমি শীতকাতুরে আছ।
আহা, আর বীরত্ব দেখাতে হবে না। তুই যে চানের সময় রোজ গাঁইগুই করিস!
সেটা ঠান্ডা জলের ভয়ে নয় গো। পুকুরে পড়ে কতক্ষণ দাপাই জান না?
তাহলে গাঁইগুঁই করিস কেন?
তোমরা আছে বলে রোজ মা আমাকে সাবান মাখায় যে!
ওমা! আমরা না থাকলে তুই বুঝি সাবান মাখিস না?
না তো! সাবান মাখতে বিচ্ছিরি লাগে।
আর তেল মাখতে লাগে না বুঝি? রোজ তো দেখি চানের আগে কলুর মতো জ্যাবজ্যাবে করে সর্ষের তেল মাখিস! মা গো, সর্ষের তেল যা বিচ্ছিরি জিনিস
মরণের মুখ শুকিয়ে গেল। সর্ষের তেল কি খারাপ জিনিস দিদি?
খারাপই তো! বিচ্ছিরি গন্ধ। সর্ষের তেল মাখলে রংও কালো হয়ে যায়!
মরণ দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়ে বলে, ঠিক তো! তাই আমি কালো, না দিদি?
পুঁটি টেরছা চোখে তার দিকে একটু চেয়ে বলল, তুই অবশ্য তেমন কালো নোস। সাবান মাখছিস বলে বেঁচে গেছিস। হ্যাঁ রে, তুই তো সাঁতার জানিস!
হ্যাঁ তো।
কী করে শেখে রে?
আমি তো বাবার কাছে শিখেছি। বাবা একদিন ধরে মাঝপুকুরে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিল। হ্যাঁচোড় প্যাঁচোড় করে হাত-পা দাপিয়ে কোনওরকমে পাড়ে আসতেই বাবা বলল, এই তো সাঁতার শিখে গেছিস। ব্যস, সেই শিখে গেলাম।
ও বাবা! আমি পারব না। ডুবে যাবো।
গাঁয়ের মেয়েরা কেমন করে শেখে জানো?
কেমন করে?
বুকে কলসি নিয়ে।
দুর! ওটাও আমি পারব না। বুকে কলসি চেপে জলে নামলে লোকে হাসবে।
সব মেয়েই তো তাই করে।
তোদের গাঁয়ের মেয়েগুলো যা বোকা!
কেন, আমাদের পান্নাদি আছে।
পুঁটি হেসে ফেলে বলল, আহা, কথা উঠলেই কেবল পান্নাদি! পান্নাদি তোর মাথাটা খেয়েছে। নিয়ে আসিস, দেখবখন তোর পান্নাদিকে।
পান্নাদি কী সুন্দর নাচে, গায়।
জানি তো কেমন নাচ আর গান! রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে নাচে ত! ও সবাই পারে। আর নিশ্চয়ই নাকি সুরে প্যানপ্যান করে গায়!
দিদির ভঙ্গি দেখে ফের হি হি করে হাসল মরণ। বলল, তবে দাদা পুজোর ফাংশনে পান্নাদির গান শুনে বলেছিল, পান্নাদি নাকি ভাল গায়।
নাক সিঁটকে পুঁটি বলে, ও গানের কিছু বোঝে?
বাঃ, দাদা যে গায়! সবাই প্রশংসা করে।
পুঁটি হেসে ফেলে বলে, তবেই হয়েছে। ওই যদি তোদের কাছে ভাল গান হয় তবে পান্নাদি তো এখানকার লতা মঙ্গেশকরই হবে।
হ্যাঁ দিদি, তুমি বুঝি আরও ভাল গাও?
পুঁটি মাথা নেড়ে বলে, না রে, আমি গান জানিই না। তবে শুনতে ভালবাসি। আমার কাছে গাদা গাদা গানের ক্যাসেট আছে।
গাও না কেন?
আমি পারি না।
নাচ জানো?
না তো! ওসব আমার আসেই না।
.
দিদিটা যে একটু পাগলি মতো আছে তা আগেই বুঝে গিয়েছিল মরণ। নাচ-গান না জানলেও দিদি দৌড়ঝাপে ভারী ভাল। দুদিনে গাছে-টাছে উঠতে শুরু করে দিল। এই কুল পাড়ছে, এই পেয়ারা পাড়ছে, কদবেলের গাছেও উঠে গেল একদিন। মরণ ভয়ে মরে।
