পারুলের চোখে জল দেখে অবাক হল না পান্না। বাপের বাড়ি ছেড়ে যেতে কোন মেয়ের না কষ্ট হয়! পাশের ঘরে জামাইবাবু আর ছেলেমেয়েদের গলা পাওয়া যাচ্ছিল। অনেকদিন পর বাবাকে পেয়ে ছেলেমেয়েদের কথা শেষ হচ্ছে না। এ-ঘরে একলাটি পারুল।
তাকে দেখে হেসে স্নিগ্ধস্বরে বলল, আয়, কাছে বোস এসে।
গাড়িটা নতুন কিনলে বুঝি তোমরা! কী সুন্দর গাড়ি।
তোর জামাইবাবু কিনেছে। বেশি শখশৌখিনতা তো নেই, তাই বেশি আপত্তি করিনি। এককাড়ি টাকা অবশ্য বেরিয়ে গেল।
তা যাক পারুলদি। তোমার তো অভাব নেই।
পারুলের চোখে জল, মুখে মিটি মিটি হাসি। একটু চুপ করে থেকে বলল, কাউকে বলতে নেই, কিন্তু কথাটা চেপে রাখতে পারছি না।
কী কথা গো?
পারুল এক অপরূপ চোখে তার দিকে চেয়ে বলল, কাল রাতে কী স্বপ্ন দেখলাম জানিস?
কী গো?
বাবা আমার পেটে এসেছে।
.
৪৮.
সিগারেট ছেড়ে কি শেষে নস্যি ধরলে নাকি হে বাঙাল?
আর কইয়েন না খুড়া। মাঝখানে কাশের লগে ছিটা ছিটা রক্ত পড়ছিল। ডাক্তার দেইখ্যাই সিগারেট বন্ধ কইরা দিল। ত্রিশ বচ্ছরের নেশা ছাড়ন কি সোজা? ধুয়া বন্ধ হইতেই কেবল ঘুমে ধরে, মাথা কাম করে না।
ওঃ, বিড়ি সিগারেটে নেশা বড় জব্বর। আমাকেও খুব জ্বালিয়েছে। তা নস্যি কেমন জিনিস বলল
সিগারেটের কাছে লাগে না। কিছুদিন খইনিও খাইছিলাম। জুইত হইল না, বোঝলেন! মেলা ডলাডলি করতে হয়।
দাও দেখি এক টিপ, নিয়ে দেখি।
লন, লন। দুই একটা হাইচ্চো মারলে মাথা পরিষ্কার হইয়া যাইবো। •
ধীরেন কাষ্ঠ এক টিপ নিল দু আঙুলে চেপে। তার সবই চলে। এই দেহ যে কী চায় সব সময়ে তার দিশা পাওয়া যায় না। সব রকম রসই শরীরকে দিয়ে দেখে ধীরেন। তার সবই সয়। কাটোয়ায় কিছুদিন সাধুসঙ্গ হয়েছিল। তখন গাঁজাও চাপান দিয়েছে। জিনিস খারাপ নয়। শরীর গরম হয়, খিদে বাড়ে, দুনিয়াটাকে ভারী ভাল লাগে। একসময়ে গাঁয়ের বড়লোক ছিল পীতাম্বর। বাপের সুদের কারবার ছিল, দোহাত্তা পয়সা। বাপ লোপাট হওয়ার পর কদিন খুব ফুর্তি লুটেছিল বটে। তখন তার মোসাহেবি করে কয়েকদিন খুব হুইস্কি ব্র্যান্ডি চলেছিল ধীরেনের। কিছু খারাপ লাগত না। সঙ্গে ছোলার চাট থাকত, কঁচা পেঁয়াজ, মাংসের বড়া। সে একটা দিনই গেছে। তবে বেশি দিন নয়। বছর না ঘুরতেই পীতাম্বরের বাবার পয়সা উবে গেল, তখন তার হা-ভাত জো-ভাত। ধীরেন দেখল মদ সে খেয়েছে বটে, কিন্তু নেশায় ধরেনি। মদের উৎস বন্ধ হতেই সে আবার যেমন-ধীরেন তেমন-ধীরেন হয়ে গেল।
গোটা চারেক হাঁচি হল ধীরেনের। মাথায় বেশ একটা ঝাঁকুনি লাগল। আর একেবারে ব্রহ্মরন্ধ পর্যন্ত একটা ঝিলিক তুলে দিয়ে গেল এক টিপ নস্যি।
নাকের জলটা ঝেড়ে নিয়ে ধরা লগায় ধীরেন বলল, বেশ জিনিস বাপু। কখনও পরখ করা হয়নি বটে। বেশ ঝাঁঝ আছে কিন্তু, ওঃ, এক টিপেই একেবারে নাকের জলে চোখের জলে অবস্থা।
ওই প্রথম প্রথম একটু ঝাঁকি দেয়। তারপর দেখবেন ম্যান্দামারা জিনিস। ভুসিমাল। তবু লগে লগে রাখি। তামুকপাতা তো, একটু সাইকোলজিক্যাল এফেক্ট হয় বোঝলেন?
ধীরেন বুঝেছে। মাথা নাড়ল। ভিতরের যন্ত্রপাতি একটু ঝাঁকুনি খেয়েছে। প্রায় আশি বছরের পুরনো কলকবজা, কখন কোনটা বিগড়োয় তার ঠিক কী? মানুষ বেশি বুড়ো হলে প্রাণবায়ু যখন-তখন বেরিয়ে যেতে পারে। এই যে চারটে পেল্লায় হাঁচি হল এর যে-কোনও একটা হাঁচির সঙ্গেও তো বেরিয়ে যেতে পারত। দুঃখকষ্টের জীবন, প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেলে একরকম বোধহয় ভালই। তবু কে জানে কেন, ধীরেনের মরতে ইচ্ছে যায় না। জীবনে আর কিছু হওয়ার নেই, জানে। কিছু করার নেই, তাও জানে। কিছু দেখার নেই, উপভোগ করার নেই, সব জানে। তবুমরতে ইচ্ছে যায় না। এ একটা অদ্ভুত ব্যাপারই বটে। আলায়-বালায় অকাজে ঘুরে বেড়ায় সে, কত কী চোখে পড়ে। পোকাটা, মাকড়টা, গাছটা, ফুলটা, পাখিটা, সবই দেখে ধীরেন। বেলা শেষের ঢলানে আলো, কি মাঠের ওপর মেঘের ছায়া, ছেলেদের ফুটবল খেলা সব কিছুই ভারী উপভোগের ব্যাপার তার কাছে। শব্দ-গন্ধ-স্পর্শ কত রকমই তো সবসময়ে তৈরি হচ্ছে চারধারে। এইসব ছোটখাটো ব্যাপারই আজকাল ভারী গুরুতর হয়ে ওঠে তার কাছে। ঘরে কুলুঙ্গির ওপরে চড়াই পাখি বাসা করছে, তাই দেখতে দেখতে চৌপর দিন কেটে যায় তার। পৃথিবীতে নিঃশব্দে যে কত ঘটনা ঘটে যায় মানুষ তা টেরই পায় না।
কই খুড়া, আপনের জোগাইল্যা তো অখনও আইল না?
বর্ধমান থেকে আসবে তো, তাই দেরি হচ্ছে।
কিছু মনে কইরেন না খুড়া, গ্রামের মাইনষের কিন্তু টাইমের ঠিক নাই। ঘটি মাইনষের গায়েগতরে বড় আইলসামি। হেইর লিগ্যাই তো আমি কইলকাতা থিক্যা মিস্তরি আনতে চাইছিলাম। কিন্তু আমার বিদ্যাধরী বউ কয়, না পাম্পের কাম খুড়া করব। আমি কই, খুড়া তো বুড়া হইছে, হায়-হয়রানের কাম কি পারব? কিন্তু হ্যায় শোনে না। তা খুড়া, আপনের বয়স কেমন হইল?
এক গাল হেসে ধীরেন বলে, তা বাপু, বয়সের হিসেব কে আর রাখে! তবে আশির কাছাকাছি হবে বলে মনে হয়। মহিমদারই বিরাশি চলছে। আমার চেয়ে ধরো তিন চার বছরের বড়।
বাপ রে! আশি তো মেলা বয়স খুড়া! এই বয়সে অসুইরা খাটনি কি পারবেন?
খুব হাসল ধীরেন, ও বাঙাল, আমি কি ফুলবাবুটি নাকি? খেটেপিটে টনকো শরীর। তবে চোখটাই যা ঝাপসা। ছানি কাটানোর তারিখটাও দিচ্ছে না ব্যাটারা। কবে থেকে নাম লিখিয়ে বসে আছি।
