মনটা বড় দমে গেল মহিমের।
গণ্ডগোলটা কোথায় হল হরিদা?
গৌরহরি মাথা নেড়ে বলেছিলেন, সবটাই গণ্ডগোল, আগাপাশতলাই গণ্ডগোল। মন খারাপ না করে বাড়ি যা। অমলের একটা ভাল দেখে বিয়ে দে।
দেবিকা ফুঁসেছিল খুব, হুঁ, অমন সুন্দরী কত আমার অমলের পায়ে গড়াগড়ি যাবে। কত বড় ঘরের মেয়ে যেচে আসবে। দেখে নিও।
দেখা ছাড়া মহিমের কিছু করারও ছিল না। সংসারের প্রায় কোনও ব্যাপারেই তার মতামতের তোয়াক্কা কেউ করত না কখনও। পারুলের বিয়ের মাসখানেকের মধ্যেই অমল আর তার মায়ে মিলে বিয়ের ব্যবস্থা করে ফেলল। সেই বিয়েতে মহিমের ভূমিকা বরকর্তার মতো ছিল না, ছিল আমন্ত্রিত একজন অতিথির মতোই। বড় ঘরেরই মেয়ে, সুন্দরীও। কিন্তু মহিমের তেমন কোনও আহ্লাদ হল না। বিয়ের পরই ছেলে-বউ উধাও হয়ে গেল বোম্বেতে। তারপর বিদেশে। মুছেই গেল জীবন থেকে। যেমনটা হয়ে থাকে।
আজ তৃষিত চোখে বসে গৌরহরিদার দুই ছেলের পিতৃতর্পণ মন দিয়ে আগাগোড়া দেখছিল মহিম। দুটো ছেলেই নিষ্ঠার সঙ্গে হবিষ্যি করেছে, ন্যাড়া হয়েছে, নাবালক দুটি অনাথের মতো বসে বাবার স্বর্গের পথ পরিষ্কার করার চেষ্টা করছে। প্রচুর দানসামগ্রী, বিরাট আয়োজন। কোথাও কিছু অভাব রাখেনি। দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। স্বর্গের পথ পরিষ্কার না হোক এত ভালবাসার কি দাম নেই নাকি? মহিম মরলে তার ছেলেরাও হয়তো নেড়া হবে। কিন্তু হবে বিরক্তির সঙ্গে। শ্রাদ্ধও কি করবে না? করবে, তবে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে। মনে মনে বলবে, বাপটা মরে বড্ড ফাঁসিয়ে দিয়ে গেছে।
কাকা, অমন চুপটি করে বসে আছেন যে!
চোখ তুলে চোখ দুটো জুড়িয়ে গেল মহিমের। পারুল।
ক্লিষ্ট হেসে বলল, এই বসে বসে দেখছি।
ওসব আপনাকে দেখতে হবে না। বরং ঘরে এসে মায়ের সঙ্গে বসে গল্প করুন।
বুদ্ধিমতী মেয়ে। হয়তো ভেবেছে, বুড়ো মানুষের এই বসে বসে অন্যের শ্রাদ্ধ দেখাটা বোধহয় ভাল হচ্ছে না।
মহিমের চোখে জল আসছিল। বলল, মরার কথা মনে হচ্ছে না মা, ভালবাসার কথা মনে হচ্ছে। হরিদা বড় ভাগ্যবান।
না কাকা, ওসব ভাবতে হবে না। ঘরে চলুন, এখানে যজ্ঞের ধোঁয়া লাগছে আপনার। মুখটাও তো শুকিয়ে গেছে! ডাবের জল খাবেন?
না মা, ওসব দরকার নেই।
তাহলে বরং আপনাকে এক কাপ চা দিই।
হাতে চায়ের কাপ নিয়ে অভিভূতের মতো বসে রইল মহিম। এইটুকু সমাদরও যেন অনেক। অমলের সঙ্গে পারুলের বিয়েটা হয়নি বলে আজ বিশ বছর বাদে নতুন করে বুকটা ব্যথিয়ে উঠছিল তার। চায়ে চুমুক দেওয়া হল না। হাতে ধরা চায়ের কাপ ঠান্ডা হয়ে গেল, বুকের ভিতরটা হল না। একটা চাপা-পড়া আগুন বহুকাল বাদে ধীইয়ে উঠল।
সারাদিন আজ শ্রাদ্ধবাড়িতেই কেটে গেল মহিম রায়ের। গৌরহরিদা নেই, না থেকেও বাড়ির সর্বত্র ছড়িয়ে আছেন। মরে যাওয়ার পরও এক একটা মানুষ বহুকাল থেকে যায়। ধ্যানে, শোকে, মনে পড়ায়, শূন্যতায় সে বারবার জীয়ন্ত হয়ে ওঠে। কারও কারও মরার পরেও মরে যেতে অনেক সময় লাগে।
সন্ধের পর ফিরছিল মহিম। বেলা ছোট হয়ে গেছে, টক করে বড্ড অন্ধকার হয়ে যায়। টর্চটাও আনেনি সঙ্গে। চোখের তেমন জোর নেই আজকাল। বেগুনক্ষেতের পাশ দিয়ে মেটে রাস্তা ধরে আনমনে ধীর পায়ে হেঁটে ফিরছে মহিম। বিষণ্ণতায় সামান্য নুয়ে-পড়া শরীর।
হঠাৎ আবছা আঁধারে একটা সাদা ছায়ামতো ঝোপঝাড় থেকে বেরিয়ে এসে আবার অন্ধকারে দ্রুত মিলিয়ে গেল। থমকাল মহিম। কে ওটা? আবার সাদা ছায়ামতো কী যেন দুলে উঠল সামনে। লহমায় মিলিয়ে গেল।
কে? কে রে?
কেউ জবাব দিল না। সামনে বুক সমান ফণীমনসার আড়াল। তার ওপাশে ফটিক কাঞ্জিলালের পতিত জমি। ফটিক বাড়ি করবে বলে জমিটা কিনে ভিতপুজো অবধি করেছিল। তারপর বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে আমগাছে ফাঁসি দিয়ে মরে। বাড়িটা আর হয়নি। জমিটা আগাছায় ভরা। মাঝখানে অভিশপ্ত আমগাছটা ঝুপসি হয়ে দাঁড়িয়ে। সাপ-খোপের আড্ডা। লোকে অশরীরীর ভয়ও পেত আগে। ফটিক নাকি ওখানেই গেড়ে বসে আছে, জ্যান্ত লোকদের মরার জন্য ডাকাডাকি করে।
মহিমের ভূতের ভয় নেই। কিন্তু সাদাটে ছায়াটা কীসের তা বুঝতে পারল না। এ সময়ে কুয়াশা একটু হয় বটে, কিন্তু কুয়াশা তো ছুটে বেড়াবে না। চোখেরই ভুল হল কি?
মহিম রায় গুটি গুটি আরও কয়েক পা এগোল। না, চোখের ভুল নয়। ফটিকের পতিত জমিতে বাস্তবিক একটা সাদা মূর্তি দু হাত দুদিকে পাখির ডানার মতো ছড়িয়ে দিয়ে ধীরে ঘুরে ঘুরে ঢেউ হয়ে নেচে বেড়াচ্ছে। শিউরে উঠল মহিম। কত ইট কাঠ পড়ে আছে জমিতে, কত আগাছার দুর্ভেদ্য জঙ্গল। সাপ খোপ এবং হীন দংশক প্রাণীদের আড্ডা। কোনও মানুষ এই সন্ধেবেলা ওখানে যায় পাগল না হলে?
কে? কে রে ওখানে?
মূর্তিটা যে মেয়েছেলের তাতে সন্দেহ নেই। মহিম স্তম্ভিতের মতো দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখতে লাগল। মেয়েটা ঢেউয়ের মতো শরীর বইয়ে দিচ্ছে, নানা বিভঙ্গে হেলে যাচ্ছে ডাইনে বাঁয়ে পিছনে। ঝুঁঝকো আঁধারে বোঝা যাচ্ছে গলা থেকে গোড়ালি অবধি একটা সাদা পোশাক পরে আছে মেয়েটা।
হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল এরকম একটা পোশাক কয়েকদিন আগে সোহাগকে পরতে দেখেছিল মহিম। পোশাকটার ওপর জরির বুটি আছে। নিজের নাতনি, কিন্তু ওর সঙ্গে ভাল করে পরিচয়ই নেই মহিমের। ওরা কথাটথা বিশেষ বলতে চায় না কারও সঙ্গে। একটা কঠিন, নীরব দূরত্ব বজায় রাখে। কিছুদিন আগে অমল হঠাৎ একদিন এসে ওদের পৌঁছে দিয়ে গেল। বলে গেল, ওরা এখন কিছুদিন এখানেই থাকবে। মেয়ের নাকি একটু চেঞ্জ দরকার। খরচের টাকাপয়সাও দিয়ে গেল দাদা কমলের হাতে।
