একটু পরে ডাল ফোটার যে গন্ধটা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল সেটা কলাই ডালের মিষ্টি গন্ধই বটে।
সোহাগ বলল, না, এখন আর অ্যাক্রিড স্মেলটা নেই তো।
বাঁচা গেল বাবা! যা ঘাবড়ে গিয়েছিলাম।
আমি এসে তোমার কাজ নষ্ট করছি পান্না। আজ বরং আমি যাই।
আহা, বোসো না। রান্নাঘরে আমি যে বড্ড একলাটি হয়ে থাকি।
আচ্ছা, পরে আসব। আজ আমরা কলকাতা যাচ্ছি না। হয়তো কাল যাব।
বিকেলে আসবে?
আমার তো সবসময়ে তোমার কাছে আসতে ইচ্ছে করে।
এসো কিন্তু বিকেলে।
আচ্ছা।
সোহাগ চলে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ ভাবল পান্না। ভেবে ভেবে চোখে জল এল। ইস, মা-বাবা আলাদা হয়ে গেলে কী করে থাকবে ওরা? কেন যে ডিভোর্স জিনিসটা উঠে যাচ্ছে না পৃথিবী থেকে? কেন যে মা-বাবারা চিরকালের মতো মিলেমিশে যাচ্ছে না?
লোকটা এল এগারোটা নাগাদ। রোগা, লম্বাপানা, রংটা ফর্সার দিকেই, বয়স চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ হবে। পরনে হাঁটু অবধি ধুতি, গায়ে একটা ফতুয়া, গলায় খুব মোটা সুতোর পৈতে। মুখখানা লম্বা মতো, তাতে একটু বোকা বোকা ভাব আছে। বামুন বলে বাইরের ঘরে বসতে একটা জলচৌকি দেওয়া হয়েছে। নিচুতে বসায় লম্বা হাঁটু দুটো উঠে আছে জোড়া উটের মতো। পাশে একখানা মলিন পুঁটুলি রাখা। নাম সুদর্শন মিশ্র।
মা বাবা দুজনেই বসল তার ইন্টারভিউ নিতে।
পান্নার বাবা তেমন বলিয়ে কইয়ে মানুষ নয়। যা বলার মা-ই বলছিল, তা হ্যাঁ বাপু, বামুন তো বলছ, গায়ত্ৰীমন্ত্রটা জান তো!
হ্যাঁ মা, সে আর বলতে! ওঁ ভূর্ভুবঃ স…
সঙ্গে সঙ্গে কানে হাত চাপা দিয়ে মা ককিয়ে উঠল, থাক থাক। ও মন্তর মেয়েমানুষের শুনতে নেই। কেমন বামুন তুমি, মেয়েমানুষের সামনে গায়ত্রী উচ্চারণ করো!
কী করব মা! যারা ব্রাহ্মণ চায় তারা তো যাচাই করেই নেবে।
বলি রান্না বান্না কী জান?
গেরস্তঘরের রান্না জানি মা, বিরিয়ানি-টিরিয়ানি পেরে উঠব না। সাহেবি কেতার রান্নাও শিখিনি।
আগে কোথায় কাজ করেছ?
রান্নার কাজ নয় মা। এক পাথর ভাঙা কলে ছিলাম, তা সেখানে থেকে অসুখ বাধিয়ে বসলাম।
সে কী গো! টি-বি নাকি?
না। পেটের রোগে ধরেছিল।
দ্যাখ বাপু, রোগ-টোগ থাকলে তা গোপন করে কাজে ঢুকে পোড়ো না আবার।
গরিবের কথা কেউ বিশ্বাস করে না মা, তবে খারাপ লোগ কিছু হয়নি। আমাশা হয়েছিল। খাদানের কাজ তো, শরীর চুঁইয়ে দিতে হয়। ব্রাহ্মণের ধাত তো শক্ত ধাত নয়, সইবে কেন?
আমাদের বাপু, একটু পরিষ্কার বাতিক আছে। হেগো, বাসি কাপড়-চোপড় ছাড়তে হয়। ঠিকমতো হাতমাটি করতে হয়। পেচ্ছাব করে জল নিতে হয়।
ওসব বলতে হবে না মা। আমাদের বাড়িতে রোজ নারায়ণসেবা হত। আজও শরিকদের ভাগে হয়।
তোমাদের ভাগে হয় না বুঝি?
আমাদের আর ভাগ-টাগ নেই মা। বেচেবুচে পেটায় নমঃ করতে হয়েছে।
বউ-টউ সব কোথায়?
বিয়ে আর করা হল কই? নিজেরই জোটে না।
বিয়ে করনি, সেও তো এক চিন্তার কথা।
চিন্তা কীসের মা? বিয়ে করিনি বলে পিছুটানও নেই। ঘরের ছেলের মতো যদি রাখেন তাহলে থেকে যাব।
থাকবে তো বাছা, কিন্তু মাইনে কত নেবে?
এ বাজারে কি কমে কিছু হয়? পাঁচশোটি টাকা দেবেন।
বল কী? পাঁচশো টাকায় তো কেরানি রাখা যায়।
সে যুগ আর নেই মা। এই বর্ধমান জেলাতেই এখন পাঁচ-ছ টাকার নীচে মোটা চালটাও পাবেন না। তাও পাইকারি দরে। সর্ষের তেলের কেজি কত জানা আছে তো মা!
তিনশো টাকা দেব। ভেবে দ্যাখ।
মাথা নেড়ে লোকটা বলল, আমারও তো একটা ভবিষ্যৎ আছে। আখেরে টাকা ছাড়া কে আমাকে দেখবে বলুন!
বিস্তর ঝোলাঝুলির পর লোকটা চারশো টাকায় রাজি হল।
সখেদে বলল, কলকাতায় হলে হাজার টাকা হাঁকতাম। এ গ্রামদেশ বলে মাথা নোয়াতে হল।
পুষিয়ে দেব গো সুদর্শন। বছরে একবার ধুতি-জামা পার্বণী তো পাবেই।
ও সবাই দেয় মা, নতুন কথা কী?
রান্না-বান্না বুঝেশুনে কোরো বাপু। আবার আমার জন্য আঝালি মশলা ছাড়া রাঁধতে হবে। ডাক্তার পোড়ামুখোরা বলছে আমার রক্তে চকলেট না কী যেন বেড়েছে।
রামহরি বলে উঠল, কী যে ছাই বল। চকলেট হবে কেন, ও হল কোলেস্টোরাল।
ওই হল বাপু। তা আজ থেকেই লেগে পড়। আমার মেয়েটার রাঁধতে গিয়ে পড়ায় ফাঁক পড়ছে।
পুকুর থেকে হাত-পা ধুয়ে মুড়ি খেয়ে সুদর্শন কাজে লাগবার পর ছুটি পেয়ে হাঁফ ছাড়ল পান্না। এবার তার ছুটি।
মাকে গিয়ে বলল, একটু বড়মার বাড়ি থেকে ঘুরে আসছি মা।
যে-ই রান্নার লোক এল অমনি পাখা মেললে!
অমন করছ কেন? আজ পারুলদি চলে যাচ্ছে না!
মা তবু একটু গজগজ করতেই থাকে। ওসব কানে তুললে বেঁচে থাকাই মুশকিল। পান্না আর দাঁড়াল না, এক ছুটে হাজির হয়ে গেল বড়মার বাড়িতে।
ঢুকতেই থমকাতে হল তাকে। কী সুন্দর ঝকঝকে একখানা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে সদরের সামনে। রং-টা স্টিল গ্রে। চ্যাপটা, লম্বাটে কী যে সুন্দর ডৌল গাড়িটার। কাঁচগুলো ভোলা। ভিতরে নরম, নিচু গদির ওপর টারকিশ ভোয়ালের ঢাকনা। একজন অল্পবয়সি ড্রাইভার পালকের ঝাড়ন দিয়ে যত্ন করে বনেট পরিষ্কার করছে। নাঃ, সত্যিই পারুলদিদের অনেক টাকা। যেমন সুন্দরী, তেমনই ভাগ্যবতী। ভগবান যেন ওকে ঢেলে দিয়েছেন। সাধে কি আর সোহাগ ওকে গডেস বলে! পারুলদিকে আজকাল তারও যেন ঈশ্বরী ভাবতে ইচ্ছে করে।
গাড়ির পিছনে রূপালি অক্ষরে টয়োটা নামটা একবার দেখে নিল পান্না। জাপানি গাড়ি। তার তত হবে না এসব কখনও। তবু পারুলদির তো হয়েছে।
