এইভাবে হাসিঠাট্টায় সেদিনকার মন-খারাপটা উড়িয়ে দিয়েছিল দাদা। কিন্তু নিজের অনাদরটা আজ বড় টের পাচ্ছে পান্না।
আজ আবার মনটা মেঘলা হয়ে আছে। দাদা চলে গেল, আজ আবার পারুলদিও চলে যাবে। ভাল খবরের মধ্যে একটাই। আজ রান্নার লোক আসবে। যদি আসে তাহলে বেঁচে যায় পান্না। একটু আপনমনে থাকতে পারে। মা অবশ্য বলে দিয়েছে, ছেলেছোকরা বামুন হলে চলবে না, বাড়িতে বয়স্কা মেয়ে রয়েছে। বাবুবাবু চেহারা হলেও রাখা যাবে না। মায়ের কি বায়নাক্কার শেষ আছে? রান্না করতে তো আর রাজপুত্তুর আসবে না! আর আজকালকার মেয়েরা আগের দিনের মতো বোকা নয় যে, কাজের লোকের সঙ্গে পালিয়ে যাবে। কিন্তু মাকে কে বোঝাবে সে কথা! মা সেই গত শতাব্দীর চৌকাঠে আটকে আছে। হ্যাঁন্যাতা পুরুষ দেখলেও সোথ মেয়ের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।
আগে চড়াতে হয় ডাল। এ বাড়ির নিয়ম। পরিমাণও বড় কম নয়। এ-বাড়ির চারজন আর কতটুকুই। বা খায়? কাজের লোক তো কম নয়। তিনজন কাজের মেয়ে, দুটো মুনিশ, একটা রাখাল। সকালে ডাল ভাত সবার বরাদ্দ। কলাইয়ের ডাল হলে তিন হাতার জায়গায় পাঁচ হাতা নেবে। আজ কলাইয়ের ডালেরই হুকুম হয়েছে। চারপোয়া ডাল মেপে দিয়েছে মা, কাজের মেয়ে ধুয়ে দিয়েছে। পান্না গ্যাসের উনুনে ডাল চাপিয়ে মৌরির কৌটোটা খুঁজছিল, এমন সময়ে বাইরে থেকে কে যেন বলল, হাই!
ভারী চমকে উঠল পান্না। তারপর অবাক হয়ে বলল, ও মা! সোহাগ! কবে এলে?
মুখখানায় হাসি আছে বটে সোহাগের, কিন্তু ভারী শুকনো দেখাচ্ছে। পোশাক ঠিক আগের মতোই, বাড়তি শুধু একটা চমৎকার রংদার ঢিলা ফিটিং-এর পুলওভার। বোধহয় বিদেশি জিনিস। সোহাগ বলল, কাল এসেছি। তুমি কি রান্না করো আজকাল?
আর বোলো না। মায়ের অসুখ, এ-বাড়িতে আবার খুব শুচিবায়ু। বামুন ছাড়া হেঁসেল ছুঁতে দেওয়া হয় না। তাই খুব খাটুনি যাচ্ছে। চলো, ঘরে বসবে। ডাল সেদ্ধ হতে সময় লাগবে।
দরকার কী ঘরে যাওয়ার। ওই ছোট টুলটা দাও না, এখানেই বসি। ভাল কথা, আমি বসলে আবার তোমাদের কোনও পাপ-টাপ হবে না তো! যদি ছোঁয়া-টোয়া লাগে। ৩৪০
ধ্যাত। তুমি একটা কী বলল তো! তোমরাও তো বামুন।
ভারী অবাক হয়ে সোহাগ বলে, ও হ্যাঁ, তাই তো! আসলে আমার ওসব একদম খেয়াল থাকে না। ঠিকই তো, আমিও তো শুনেছি যে, আমরা ব্রাহ্মণ। তবে ভাই, আমি কিন্তু গোরুর মাংস, শুয়োরের মাংস সব খেয়েছি। তাতে দোষ হবে না তো!
চোখ বড় করে পান্না বলে, খেয়েছ?
অনেক। বিদেশে তো ওসবই রোজ খেতাম।
তোমার মা?
সবাই। দোষ হচ্ছে না তো এখানে বসলে?
আরে না। মা তো আর জানে না যে তুমি ওসব খাও। না জানলে কিছু নয়। কেমন লাগে বলো তো গোরুর মাংস! খুব শক্ত হয়, না? তেতো নাকি?
না না, খেতে খুব ভাল। ভেরি প্যালেটেবল।
ঘেন্না করত না খেতে?
অবাক হয়ে সোহাগ বলে, না তো! ঘেন্না করবে কেন? মিট ইজ মিট, গোরুরই হোক, পাঁঠারই হোক।
আমি বাবা মরে গেলেও খেতে পারব না। আগে তো শুনতাম গোরুর মাংস নাকি ভীষণ শক্ত, তেতো আর এমন গরম যে খেলে গায়ে ফোঁসকা বেরোয়।
সোহাগ হেসে ফেলে বলে, যাঃ, ওসব কিছু হয় না।
তুমি হঠাৎ এলে যে! একা নাকি?
না। মায়ের সঙ্গে এসেছি। বাবা চার-পাঁচ দিন আগে কাউকে কিছু না বলে হঠাৎ চলে এসেছে এখানে।
ওমা! কেন?
ঠোঁট উলটে সোহাগ বলে, গড নোজ।
তাই হঠাৎ সেদিন অমলদার মতো কাকে যেন দেখলাম জানালা দিয়ে। একবার ভাবলাম, অমলদা। তারপর ভাবলাম আর কেউ হবে।
সোহাগ একটু উদাস হয়ে গিয়ে বলল, আমার মা আর বাবা সেপারেট হয়ে যাচ্ছে।
অবাক হয়ে পান্না বলে, সে কী! ডিভোর্স নাকি?
হ্যাঁ।
ওমা! কেন?
মা আর বাবার আন্ডারস্ট্যান্ডিং হচ্ছে না।
পাংশু মুখে পান্না বলল, কী হবে তাহলে সোহাগ?
উই আর ইন এ জ্যাম নাউ।
এ বাবা! ডিভোর্স তো বিচ্ছিরি ব্যাপার!
সোহাগ মলিন মুখেও একটু হাসল, বিচ্ছিরি কেন বলো তো!
মা আর বাবা আলাদা হয়ে যাওয়া কি ভাল? কী হবে তাহলে?
জানোই তো, আমাদের ফ্যামিলিতে কোনও আঠা নেই। যে যার নিজের মতো থাকে। কেউ কারও পরোয়া করে না। কেউ কাউকে ভাল-টালও বাসে না। তবু যদি ডিভোর্স হয় তাহলে আমাদের লাইফ প্যাটার্নটা ভীষণ আপসেট হয়ে যাবে।
তাই তো! কিন্তু হঠাৎ কী হল বলো তো! হঠাৎ ডিভোর্স হচ্ছে কেন?
হঠাৎ হচ্ছে না। অনেকদিন ধরেই ব্যাপারটা তৈরি হচ্ছিল। আমরা আন্দাজ করছিলাম এরকম একটা কিছু হতেই পারে।
দুজনের ঝগড়া হয়েছিল বুঝি?
না। ঝগড়া আজকাল হয় না। তোমাকে তো বলেইছি আমাদের মধ্যে কেমন যেন একটা ঘেন্নার সম্পর্ক। কেউ যেন জোর করে আমাদের একটা কৌটোয় পুরে রেখেছে। আমাদের মধ্যে আসলে কোনও রিলেশনই যেন তৈরি হয়নি। মাঝে মাঝে আমার তো মনে হয় আমরা চারজনই যেন চারজনের কাছে টোটাল স্ট্রেঞ্জার। কেউ কাউকে যেন চিনিই না। তোমার খুব অদ্ভুত লাগছে, না?
হ্যাঁ। আমরা তো কেউ কাউকে ছাড়া থাকতেই পারি না। এই তো আমার দাদা আজ কলকাতায় চলে গেল বলে সকাল থেকে কী ভীষণ মন খারাপ লাগছে।
তোমরা খুব ভাল আছ, তাই না?
পান্না করুণ মুখেও ফিক করে হেসে ফেলে বলল, ঠিক তাও নয়। এই তো একটু আগে মায়ের ওপর ভীষণ রাগ হচ্ছিল। কেঁদেছিও একটু। মা তো ভীষণ পার্শিয়ালটি করে দাদার জন্য। তাই খুব রাগ হয়। কিন্তু ধরো, মাকে ছাড়াও তো আমার চলে না। অসুখ-টসুখ হলে আবার ওই মা-ই তো এসে রাত জেগে পাশে বসে থাকে। আবার দেখ মা আর বাবার মধ্যেও তো মাঝে মাঝে খিটিমিটি হয়, তবু মায়ের হাতের রান্না ছাড়া বাবার মুখে রোচে না। কদিন ধরে আমি যে এত যত্ন করে রাঁধছি তা বাবার মুখ দেখেই বুঝতে পারছি মনের মতো হচ্ছে না।
