মায়ের নাকি হার্টের দোষ ধরা পড়েছে। খুব ভয়ের কিছু নয়। তবে সাবধানে থাকতে হবে। সংসার যুদ্ধ থেকে একটু আলগোছ হতে হবে।
বাবা তাই কদিন ধরে রান্নার জন্য বামুনঠাকুর বা বামনি খুঁজে বেড়াচ্ছে। অবশেষে পাওয়া গেছে একজনকে। বড়মার বাড়ির বামুনঠাকুরের সম্পর্কে ভাই। সে আজ কাজে আসবে। এলে বাঁচে পান্না। একটু হাঁফ ছাড়তে পারে। কদিন হারমোনিয়াম নিয়ে বসেনি, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা নেই। লেখাপড়ায় ফাঁক পড়ছে। মুখ তুলে চারদিকটা দেখারও যেন ফুরসত ছিল না।
ছেলে চলে যাওয়ার পর মা ছেলের ঘরে ঢুকে সব দেখে-টেখে বলল, ওই দেখ, কত করে বললুম, ফুলহাতা সোয়েটারটা নিয়ে যাস। ভুলে ঠিক ফেলে গেছে। দাড়ি কামানোর খুর পড়ে আছে, নতুন মোজা, তিনটে গেঞ্জি, খুঁজলে আরও বেরোবে। আমি যেটা না গুছিয়ে দেব সেটাই ঠিক ফেলে যাবে। বলি ও পান্না, দাদার জিনিসগুলো গুছিয়ে দিবি তো! কী যে করিস তোরা।
সব দোষ এখন পান্নার।
আচ্ছা মা, আমি আবার কবে দাদার জিনিস গুছিয়ে দিই? ওটা তো বরাবর তুমিই করো!
আহা কী কথার ছিরি। আমি করতে পারলে কি আর তোদের ঠ্যাঙের তলায় যাই? আমি গুছিয়ে দিইনি বলেই ছেলেটা এত সব ফেলে গেল, তোরা একটু দেখবি না? সোয়েটারটা নিল না, কলকাতায় গিয়ে শীতে কষ্ট পাবে।
পান্নার চোখে জল এল। ভগবান বলে কিছু নেই। থাকলে এত অবিচার সইতেন কি? দাদার প্রতি মায়ের পক্ষপাত এত প্রকট যে কোনও চক্ষুলজ্জা অবধি নেই। দাদার যে নিজেরই সব গুছিয়ে নেওয়া উচিত ছিল এই সত্যটা মা স্বীকারই করবে না। ছেলেদের প্রতি এই আসকারা মায়েদের চিরকাল চলে আসছে। দাদাকে পান্না ভালবাসে বটে, ভীষণ ভালবাসে, কিন্তু সে একচোখো হতে পারে না।
পান্না মৃদুস্বরে সাহস করে বলেই ফেলল, দাদা নিজে কেন গুছিয়ে নেয়নি বলবে?
মা এমন অবাক হয়ে তাকাল যেন এরকম অদ্ভুত কথা জন্মে শোনেনি। বলল, বিশু গুছিয়ে নেবে? তার কত মাথার কাজ জানিস? আনমনা আলাভোলা ছেলে, তার কি অত সংসারবুদ্ধি আছে? নিজেরা চোখে ঠুলি পরে থাকিস আর অন্যের দোষ খুঁজিস।
ছেলের পক্ষ নিয়ে কী সুন্দর গুছিয়ে কথা বলতে পারে মা। আনমনা, আলাভোলা ছেলে, সংসারবুদ্ধি নেই! পান্নার বেলায় এই দরদটা মার কেন যে উবে যায় কে জানে! গত পরশু পান্নার হাতে গরম ভাতের ফেন পড়ে গিয়েছিল, মায়ের কোনও উদ্বেগই দেখা গেল না। শুনে বলল, এত বড় ধিঙ্গি মেয়ে ভাতের মাড়টা পর্যন্ত গালতে শিখল না এখনও।
দাদাকে ভীষণ ভালবাসে ঠিকই পান্না, কিন্তু মায়ের এই একচোখোমি দেখলে দাদার ওপরেও রাগ হতে থাকে।
ব্যাপারটা দাদাও জানে। পোড়া হাতে কী সব ওষুধ-টষুধ লাগাতে লাগাতে দাদা বলল, কাঁদছিস কেন, সব ঠিক হয়ে যাবে।
মায়ের ব্যাপারটা দেখলি দাদা?
বিশু হেসে বলল, আরে, মা তো ওরকমই। তা বলে তোকে যে কম ভালবাসে তা কিন্তু নয়। সব সময়ে কাছে থাকিস বলে চোখে-হারাই ভাবটা নেই। কিন্তু বিয়ে হয়ে যখন শ্বশুরবাড়ি যাবি দেখিস তখন কীরকম আপলা- চাপলা খাবে।
অবাক হয়ে পান্না বলল, ও দাদা! ওটা কী বললি রে? আপলা-চাপলা না কী যেন।
হ্যাঁ তো! আপলা-চাপলা মানে হল আছাড়ি-পিছাড়ি না কী যেন বলে!
এমা! ও তো বাঙাল কথা! কোত্থেকে শিখলি?
বিশু হেসে ফেলে বলে, আরে হয়েছে কী জানিস, আমার রুমমেট বীরভদ্র বলে একটা ছেলে আছে। সে হল কাঠ বাঙাল। সে আমার বেস্ট ফ্রেন্ডও বটে। তার সঙ্গে মিশতে মিশতে অনেক টার্ম শিখে গেছি। এখন মুখে এসে যায়।
খুব হেসেছিল দুজনে।
সেদিন রসিক বাঙাল বড়মার কাছে কার্টসি ভিজিটে এসেছিল। অনেক ফল-টল মিষ্টি সব নিয়ে এসেছিল। এসেই বলল, ঠাইরেন, আমারে পোলার লাহান দ্যাখবেন। যখন যা মনে লয়, যা খাইতে ইচ্ছা করে একবার আমারে কইয়া পাঠাইয়েন। বুড়া কর্তার কর্জ তো আমি জীবনেও শোধ দিতে পারুম না। এইসব হাউমাউ করে বলছে আর বড়মা হাঁ করে চেয়ে আছে। পরে রসিক বাঙাল চলে যাওয়ার পর আমাকে বলল, বাঙালের সব কথা বোঝা যায় না বটে কিন্তু লোকটা বড় ভাল।
বাঃ! তুই তো বেশ বাঙাল কথা বলতে পারিস। উইথ কারেক্ট অ্যাকসেন্ট!
পান্না হেসে গড়িয়ে পড়ে বলে, মোটে পারি না। আমি আসলে অন্যকে খুব ভাল নকল করতে পারি।
তাই দেখছি।
তারপর শোন না, বড়মা যেই বলেছে বাঙাল খুব ভাল লোক অমনই আমি বড়মার সঙ্গে ঝগড়া লাগালুম। বললুম, ও বড়মা, যারা দুটো বিয়ে করে তারা আবার ভাল লোক হয় কী করে? বড়মা বলল, দুর পোড়ারমুখি, দুটো বিয়ে করেছে বলে কি পচে গেছে? বড়মা কিছুতেই মানবে না, আমিও ছাড়ব না। তখন বড়মা হার মেনে বলে, কী জানি বাপু, একালের ছেলেমেয়েরাও তো দুটো-তিনটে করে বিয়ে বসছে শুনি। একটাকে ছেড়ে আর একটাকে ধরে। তোর জ্যাঠা সেইজন্য ডিভোর্সের মামলা নিতে চাইত না। ডিভোর্স করে ফের বিয়ে করাও তো বাপু, বহু বিবাহই, তোরা যার নিন্দে করিস। বরং ডিভোর্স আরও খারাপ, একটাকে তাড়িয়ে আর একটাকে আনে।
ইস, তুই তো বড়মার কাছে গো-হারা হেরে গেছিস তাহলে। হারারই কথা, বড়মা কত বড় উকিলের বউ জানিস? তুই গেছিস তার সঙ্গে লাগতে!
ইল্লি! মোটেই হারিনি। আমি তখন বড়মাকে বলেছি, ও বড়মা, বড় জ্যাঠা যদি আর একটা বিয়ে করে বউ আনত তাহলে কী করতে? তখন বড়মা বলল, ও বাবা, সে আমার সহ্য হত না। গলায় দড়ি দিতুম তাহলে। ব্যস, বড়মা সারেন্ডার করে ফেলল।
