চোখ খোলা রেখে, চালি করা নীল মশারির পর্দায় সে নানা দৃশ্যের প্রক্ষেপ ঘটাতে থাকে। নানা সম্ভব অসম্ভব কথা। নানা সম্ভাবনা। নানা উদ্বেগ। অনেক দিন বাদে উদ্বেগ। তার জরাগ্রস্ত মন থেকে উদ্বেগও উধাও হয়ে গিয়েছিল। আবার ফিরে এসেছে। মোন চলে যাবে। নতুন করে শুরু করতে হবে জীবন। সে কি পারবে?
মোনার সন্দেহ, পারুলের টানেই তার এই পালিয়ে আসা। কিন্তু পারুলের কাছে সে তো যায়ও না। কতদিন দেখা হয়নি। পারুলের শরীর লুট করেছিল এক দুপুরে বিশ বছর আগে। কৃতকর্মের জন্য কত গুনোগার দিতে হল।
একটা দীর্ঘশ্বাস ঘনিয়ে উঠল বুকের মধ্যে। অনেকক্ষণ ধরে শ্বাসটা বেরোল।
চোখ বুজে সে টের পাচ্ছিল তার দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। সে কি কাঁদছে? হয়তো। কিন্তু বুঝতে পারছে না কেন কাঁদছে।
তুমি কি ঘুমোচ্ছ?
চোখ খুলে ঘরের দরজায় মোনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পেল অমল। তাড়াতাড়ি উঠে বসতে গিয়ে মাথাটা ঝিম করে উঠল।
না না, ঘুমোচ্ছি না। কিছু বলবে?
আমরা যাচ্ছি। আজই যেতে হবে?
আমি তো থাকব বলে আসিনি। কথাটা তোমাকে জানিয়ে যাওয়ার দরকার ছিল। জানিয়ে গেলাম।
আমাকে কী করতে হবে যেন!
যদি দয়া করে কলকাতায় আসতে পারো তা হলে আমার উকিল তোমাকে সব বলে দেবে। তোমাকে কোর্টে অ্যাপিয়ার হতে হবে না।
তুমি কোথায় চলে যাবে মোনা?
সেটা জেনে কী হবে?
এমনি জানতে চাইছি।
জেনে তো লাভ নেই।
তুমি চলে যাবে, ধরো আমিও হারিয়ে গেলাম। তারপর কী হবে?
সে তো আমার জানা নেই।
বড় মুশকিল হল।
মুশকিল! তোমার আবার মুশকিল কীসের?
আমি তো আজকাল কিছুই পারি না।
তোমার কোনও মুশকিল নেই, গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ, প্রেমিকার পিছনে ছুটছ, তোমার তো খুশির প্রাণ গড়ের মাঠ। শুধু বলে যাই, বুডঢা আর সোহাগকে ভাসিয়ে দিও না।
কিছুক্ষণ আবার বোকা চোখে মোনার দিকে চেয়ে থাকে অমল। তারপর বলে, কোথায় একটা গণ্ডগোল হচ্ছে। বুঝলে! কোথাও একটা ভীষণ ভুল হচ্ছে।
সেটা তুমি বসে বসে ভেবে বের করো। আমার অত সময় নেই। আমাকে নতুন করে নিজের জীবনটা গুছিয়ে নিতে হবে। কাজেই আমার এখন সময় নেই।
মোনা।
বলো।
একটা কথা যদি জানতে চাই?
কী কথা?
তুমি কি আর কাউকে বিয়ে করবে?
মোনার ফর্সা রং হঠাৎ টকটকে লাল হয়ে উঠল। কঠিন চোখে অমলের দিকে চেয়ে বলল, সেটা জেনে তোমার লাভ কী? তুমি তো আর আমার জন্য ডুয়েল লড়তে যাবে না!
তা বলিনি তো!
আমার বয়স ত্রিশের কোঠায়। মেয়েদের পক্ষে অনেক বয়স। আর সবাই তো তোমার মতো নয় যে একটা ছেড়ে আর একটা ধরে বেড়াবে।
মার খেয়ে বিবর্ণ মুখে বসে রইল অমল। এর চেয়ে থাপ্পড় ভাল ছিল। শুধু মিনমিন করে আবার বলল, ভুল হচ্ছে, কোথাও বড্ড ভুল হচ্ছে।
আমার কোনও প্রেমিক নেই। জুটলে তোমাকে জানিয়ে দেব। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে, চলি।
দরজাটা ফাঁকা হয়ে গেল। বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল ফের। ধড়াস ধড়াস শব্দ হচ্ছে তার হৃৎপিণ্ডে।
খোলা দরজা দিয়ে একটা ভারী সুন্দর গেরুয়া আর খয়েরি রঙের প্রজাপতি এসে ঘর জুড়ে ঘুরতে লাগল।
আবার চোখ বুজতেই জলে ভেসে যেতে লাগল চোখ।
কী গো, শরীর খারাপ?
চোখ চাইল অমল, এসো ঠাকরোন।
কাঁদছিলে নাকি?
না না, এমনি চোখে জল এল হঠাৎ।
এতকালের সম্পর্ক কাটান-ছাড়ান হলে কান্না তো পাবেই ভাই।
অমল চেয়ে রইল। অঝোর ধারায় জল পড়ছে চোখ দিয়ে।
এই জন্যই তোমাকে বলেছিলাম পাগলামি না করে কলকাতা ফিরে যাও। কথা তো শুনলে না!
আমি যে ওদের ভয় পাই।
ওসব অলক্ষুণে কথা বোলো না তো! শুনলে রাগ হয়।
মোনা তোমাকে কী বলল ঠাকরোন?
কী আবার বলবে। মেয়েমানুষের কি দুঃখের শেষ আছে? তোমরা তো মনেও রাখো না, ওই মেয়েমানুষই ঘরদোর সন্তান সংসার আগলে থাকে বলে তোমরা ভেসে যাও না। ঘরের মহিলাটি ঘাঁটি আগলে না থাকলে এত পাগলামি, বাউণ্ডুলেপনা করে বেড়াতে পারতে বুঝি? অত সোজা নয়, বুঝলে?
বউদির সঙ্গে একমত হয়ে মাথা নাড়ল অমল। বিড়বিড় করে বলল, ভুল হচ্ছে, কোথাও বড় ভুল হচ্ছে আমাদের।
.
৪৭.
বিশু চলে গেল কলকাতায়, আর বাড়িটা কী ফাঁকাই না হয়ে গেল। সব যেন ঝিমিয়ে পড়ল। চারদিকটা কেমন মলিন লাগছে। পান্নার সঙ্গে তার দাদা বিশুর যেমন ভাব, তেমনই ঝগড়া, তেমনই খুনসুটি। বালিশ নিয়ে মারপিটও কত হত আগে। বালিশ ফেটে তুলো উড়ত আর মা বকে বকে হয়রান হত। এবার আর সেই আগের মতো হল না। বিশুর এখন পড়ার চাপ বাড়ছে, গম্ভীর হয়েছে, বড় হয়েছে। আর পান্নাও সংসার নিয়ে হিমসিম খাচ্ছে। মায়ের বকুনিও আছে সঙ্গে। এটা ঠিকমতো হল না, ও কাজটা পড়ে রইল। ওর মধ্যে মধ্যেই প্রিয় দাদাটির সঙ্গে যা-একটু ইয়ার্কি ঠাট্টা গল্প। সেটাও কি কম? দাদাটাকে আর সহজে পাওয়াও যাবে না। পাস-টাস করে যদি চাকরি পায় বা বিদেশে চলে যায় তাহলে তো হয়েই গেল। আর তা করতে এদিকে তো পান্নার বয়সও বসে থাকবে না। হয়তো বাবা পাত্র জুটিয়ে এনে বিয়ে দিয়ে দেবে। ঘোরো সংসারের ঘানিতে। সংসার কেমন তা মায়ের অসুখ হওয়ার পর কয়েক দিনেই বুঝে গেছে পান্না। এমন সংসারে তার দরকার নেই বাপু। কিন্তু সে জানে, তার জন্য এই হড়িকুড়িই অপেক্ষা করছে ভবিষ্যতে।
আজ সকালেই চলে গেল দাদা। সেই থেকে মনটা খারাপ। আর বড্ড ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। পারুলদির কাছে যখন-তখন যাওয়া যেত। তা পারুলদিকে আজই নিতে আসছে তার বর। পান্নার কিছুদিন এসব সয়ে নিতে হবে। সয়েও যায় সব কিছু।
