সে। একইভাবে গায়ের সোয়েটার, জামা আর পায়জামা ছেড়ে রডে ঝুলিয়ে রাখার চেষ্টা করল। পায়জামাটা ঝুলে রইল বটে, জামা আর সোয়েটার খসে পড়ল নীচে। পড়েই রইল।
শীতকালে শাওয়ারে চান করতে বড় কষ্ট। শরীরে যেন লক্ষ ছুঁচ ফোঁটার যন্ত্রণা হয়। কিন্তু মগে করে গায়ে জল ঢালার সাধ্যই নেই অমলের। মগ জলে ডুবিয়ে তোলাও যেন অগাধ পরিশ্রমের কাজ। সে শাওয়ার ছেড়ে ঝরনা জলের নীচে দাঁড়াল। প্রচণ্ড ঠান্ডা জলে তার শরীর শিহরিত হতে লাগল। অবশ হয়ে যেতে লাগল।
জলের ঝরোখার নীচে দাঁড়িয়ে সে আবছায়া বাথরুমটা দেখতে পাচ্ছিল। গ্রামদেশে কেউ এত মহার্ঘ্য বাথরুম করে না। ছেলেবেলায় তারা কতবার মাঠঘাটে মলত্যাগ করতে গেছে, স্নান করেছে পুকুরে বা খালে। শখ করে দোতলায় এই অ্যাটাচড বাথ তৈরি করিয়েছে সে নিজের খরচে। ডিজেল পাম্প বসিয়েছে, ওভারহেড ট্যাঙ্কও। সব বড্ড অর্থহীন মনে হচ্ছে তার কাছে।
সে কি এরকমই চেয়েছিল? তাও এই দুর্বল মাথায় বুঝতে পারছে না অমল? মানুষের অবচেতনে অনেক বাসনা থাকে। হয়তো অমলেরও ছিল। ঝগড়ার সময় কতবার তারা ডিভোর্সের কথা বলেছে, কতবার। কিন্তু এরকম কঠিন, প্রস্তুত হয়ে তো কখনও শেষ সিদ্ধান্ত জারি করা হয়নি। ঝগড়ার পর আবার ডিভোর্সের কথা ভুলে গেছে তারা। এ তো তা নয়। মোনা সিদ্ধান্ত নিয়েই এসেছে।
অনেকক্ষণ ঠান্ডা জলের নীচে দাঁড়িয়ে থাকে অমল। তার হয়তো সর্দি হবে, জ্বর হবে, নিউমোনিয়া হবে। হোক। তার এখন নিজের জন্য কোনও ভাবনা হচ্ছে না। তার যা খুশি তোক।
কতক্ষণ গেল কে জানে। হঠাৎ দরজায় ধাক্কার শব্দ হল।
মেজদা! এই মেজদা!
সচকিত অমল বলল, কে?
আমি সন্ধ্যা। কতক্ষণ ধরে চান করছিস?
মাথাটা গরম লাগছে।
ঠান্ডা লাগবে যে! বেরিয়ে আয় এবার।
যাচ্ছি।
কলটা বন্ধ কর।
করছি।
অমল কল বন্ধ করল। তোয়ালে দিয়ে মাথা, গা মুছল। পায়জামা পরে জামা আলোয়ান কুড়িয়ে নিতে গিয়ে দেখল সেগুলো একদম ভিজে গেছে।
বাথরুম থেকে বেরোতেই বড় বড় চোখ করে সন্ধ্যা বলল, তুই কী রে মেজদা? এতক্ষণ ধরে কী করছিলি?
অমল কাঁপছিল শীতে। কঁপতে কাঁপতেই বলল, মাথাটা বড্ড গরম লাগছিল বলে–
ইস! জলে সাদা হয়ে গেছিস। শিগগির গায়ে জামা দে। তারপর রোদে গিয়ে দাঁড়া।
পরিশ্রান্ত অমল জামা গায়ে দিতে দিতে যেন প্রচণ্ড পরিশ্রমে হাঁফিয়ে পড়ছিল। বলল, তোর বউদি চলে গেছে?
মুখটা বিকৃত করে বলল, কোথায় আর যাবে। বউদির ঘরে গুজগুজ ফুসফুস হচ্ছে। আমি তো খেয়ালও করিনি, হঠাৎ বাবা ডেকে বলল, যা তো সন্ধ্যা, দেখে আয় তো অমলের বাথরুমে এতক্ষণ ধরে শাওয়ারে জল পড়ে যাচ্ছে কেন! শুনে আমি দৌড়ে এলাম। ভয় পাচ্ছিলাম, অজ্ঞান-টজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছিস নাকি।
অনেকক্ষণ চান করেছি নাকি?
অনেকক্ষণ নয়! চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ মিনিট তো হবেই।
অবাক হয়ে অমল বলে, কই, টের পাইনি তো!
কী যে হয়েছে তোর কে জানে। ওই রাক্ষুসীই তোকে খাবে। কেন যে পারুলদিকে বিয়ে করলি না কে জানে বাবা। এখন যা তো রোদে গিয়ে বোস। আমি চেয়ার পেতে দিচ্ছি।
আর কেউ আসেনি রে?
কার কথা বলছিস?
সোহাগ বা বুডঢা!
বুডঢা আসেনি। সোহাগ এসেছে।
একটু উদ্দীপ্ত হয়ে অমল বলে, এসেছে?
হ্যাঁ, মন খুব খারাপ।
কোথায় বল তো!
আমার সঙ্গে একবার চুপটি করে দেখা করে এসে বোধহয় দাদুর ঘরে বসে আছে।
কী বলল তোকে?
তেমন কিছু নয়। শুধু বলল, মন খারাপ। পরে কথা হবে পিসি।
সন্ধ্যার পিছু পিছু উঠোনে নেমে রোদে চেয়ারে বসল অমল। দুপুরের ঝাঝালো রোদ যেন বন্ধুর মতো বুকে টেনে নিল তাকে। আরামে ঘুম এসে যাচ্ছিল তার। মাথাটা ব্যথা করছে স্নানের পর থেকেই। তার কি জ্বর আসবে?
ঘুম আর জাগরণের মাঝখানে বসে রইল সে। কতক্ষণ গেল কে জানে।
ভাইঝি চটপটি এসে ডাকল, কাকা, খাবে এসো।
অমল উঠল। খাবার ঘরে গিয়ে ভাতের থালার সামনে বসলও। কিন্তু খিদে মরে গিয়ে পেটের ভিতরে কেমন একটা ঘোলানো ভাব। টক জল উঠে আসছে গলায়।
কিছু খেয়ে, কিছু ফেলে উঠে এল অমল।
ফের রোদে এসে বসল।
সামনেই সন্ধ্যা তার বিষয়সম্পত্তি ছড়িয়ে নিয়ে বসেছে। আচার, কাসুন্দি, আমলকি রোদে দিচ্ছে। বসে। ওই সবই ওর ধ্যানজ্ঞান।
মেয়েটা কোথায় রে?
দেখছি না তো। কোথাও গেছে বোধহয়।
আমার শরীরটা খারাপ লাগছে, বুঝলি!
যাও না, লেপচাপা দিয়ে শুয়ে থাকো গিয়ে। সোহাগ এলে তোমার কাছে পাঠিয়ে দেবোখন।
অমল ফের উঠে এল দোতলায়। মাথার ভিতরে যেন একটা কলকারখানা চলার শব্দ হচ্ছে। শরীর টালমাটাল। ঘরে এসেই সে বিছানায় শুয়ে পড়ল লেপমুড়ি দিয়ে। কিন্তু ঘুমিয়ে পড়ল না। ঘুম এলই না তার। অবসন্ন শরীর শুধু ঝিমঝিম করছে।
একথা ঠিক যে, মোনার প্রতি আর সে কোনও আকর্ষণই বোধ করে না। যৌন আকর্ষণ দূরে থাক, মোনার মুখোমুখি হতে সে আজকাল অস্বস্তি বোধ করে, ভয় পায়। এও ঠিক তাদের ভিতরে কোনও সম্পর্কই গড়ে ওঠেনি। একসময়ে যা-ও একটু বোঝাপড়ার চেষ্টা ছিল তাও শেষ হয়ে গেছে কবে। অভ্যাসবশে দুজনে একসঙ্গে থাকে মাত্র। তবু মোনা চলে যাবে ভাবতেই বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে কেন? কেন ভয় খামচে ধরে বুক!
তবে কি ভালবাসা নয়, মানুষ দাস হয়ে থাকে তার অভ্যাসের কাছে? এ যেন দাবার ছক-এ সাজানো গুটির মতো ব্যাপার। একটা খোপ ফাঁকা হয়ে গেলে, গুটিটা উধাও হলে হঠাৎ যে ভ্যাকুয়াম সৃষ্টি হয় সেটাই যেন অনিশ্চয়তায় ফেলে দেয় তাকে। সাহেবদের এসমস্যা নেই। তারা ছক পালটে ফেলে, শূন্যতা পূরণ করে নেয় নতুন গুটি বসিয়ে। সে কেন পারে না? তার মধ্যে নেই কেন কোনও অ্যাডভেঞ্চার? খাত বদলের আগ্রহ?
