পাগল নাকি! ওসব নয়। এটা একধরনের ক্যাথারসিস। ওই যে কী বলে যেন, মোক্ষণ না কী যেন।
আমি আজই চলে যাব। তোমার সাহিত্য সাধনায় বাধা দিতে আসিনি।
কী বলবে ভেবে না পেয়ে অমল বলল, ও, আচ্ছা।
আমি তোমাকে খুঁজতেও আসিনি, ফিরিয়ে নিয়ে যেতেও আসিনি।
বিপন্ন অমল তার ভীত চোখে চেয়ে থাকে মোনর দিকে। তার গালে কয়েক দিনের দাড়ি, প্রায় জটবাঁধা চুল, আধময়লা পোশাকে মোনার সামনে নিজেকে খুব নিম্নস্তরের জীব বলে মনে হচ্ছে তার। বড় অপরাধবোধও হতে থাকে।
তুমি আমাদের কাছ থেকে দূরে থাকতে চাও?
অমল আবার ঘাবড়ে গিয়ে বলে, না না, কে বলেছে ওসব?
কেউ বলেনি, তোমার আচরণই বলছে।
অমল কথা খুঁজে না পেয়ে মাথা নিচু করে।
পালিয়ে আসার দরকার ছিল না।
অমল দ্রুত ভাববার চেষ্টা করছে। এই আকস্মিক আক্রমণের বিরুদ্ধে তার কোনও পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না। তাই কথা আসছে না মুখে। নিজের অস্বাভাবিক আচরণের সপক্ষে কোনও যুক্তিও খুঁজে পাচ্ছে না সে। তার মাথা আজকাল কাজ করে না। তার রিফ্লেক্স বলে কিছু নেই।
সে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসহীন গলায় বলার চেষ্টা করল, না ঠিক পালিয়ে নয়। কী যে একটা ব্যাপার হল, আমি ঠিক জানি না।
তুমি না জানলেও আমি জানি। তুমি আমার হাত থেকে মুক্তি চাইছ! তাই তো!
না না, তা বলিনি।
তুমি কী বলবে তা তুমিই জান। আমিও তোমার হাত থেকে রেহাই চাইছি।
অ্যাঁ? বলে অমল হাঁ করে চেয়ে থাকে।
তুমি কবি-সাহিত্যিক হবে না দার্শনিক হবে তা নিয়ে আমার একটুও মাথাব্যথা নেই। কিন্তু তোমার ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু ভেবেছ?
ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ভাববে তা কেউ প্রম্পট করে দিলে সুবিধে হত অমলের। সে ভেবেই পেল না ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই শীতের দুপুরে তাকে মাথা ঘামাতে হবে কেন?
সে নির্বোধের মতো চেয়ে রইল।
এর পর যখন-তখন তোমার উধাও হয়ে গেলে তো চলবে না। কারণ আমি তোমার ঘরদোর সংসার আগলে পড়ে থাকতে পারছি না। আমাকে আমার পথ দেখতে হচ্ছে। ছেলে-মেয়ের ভার তোমাকেই নিতে হবে। তুমি সক্রেটিস হবে না শেকসপিয়র হবে তা জানি না, কিন্তু ওদের দায়িত্ব তোমাকেই নিতে হবে। আই অ্যাম লিভিং ফর এভার।
অপমানিত নয়, বরং ভারী উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল অমল। কিছুক্ষণ মোনার মুখের দিকে চেয়ে থেকে বলল, কোথায় যাচ্ছ?
সেটা ইররেলেভেন্ট। আমার যাওয়ার অনেক জায়গা আছে।
অমল সঙ্গে সঙ্গে একমত হয়ে বলল, সে তো বটেই।
তুমি কয়েক বছর আমাকে আশ্রয় দিয়েছিলে বলে অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু তুমি ছাড়াও আমার যে আশ্রয় আছে এটা তোমার জানা দরকার।
অমল মাথা নেড়ে জানাল যে এ ব্যাপারেও সে একমত।
আমি উকিলের সঙ্গে পরামর্শ করে এসেছি। মিউচুয়াল ডিভোর্সের কাগজপত্রও সব তৈরি হয়েছে। তুমি কলকাতায় ফিরে গিয়ে সইসাবুদ করে দিয়ে এসো।
ডিভোর্স! বলে আবার হাঁ হল অমল। মাথার ভিতরে একটা বজ্রপতনের মতো শব্দ হল। তার ফুলকিও যেন দেখতে পেল সে। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে তার। টলে উঠে হাত বাড়িয়ে রেলিং চেপে ধরল অমল।
হ্যাঁ, ডিভোর্স। অবাক হওয়ার তো কিছু নেই! তুমি তো মনে মনে দূরে সরেই গেছ। আইনের সেপারেশন তো তার চেয়ে বেশি কিছু নয়। তোমার মন যা চাইছে সেটাকেই লিগালাইজ করে নেওয়া।
অমল যে বুঝতে পারছে না তা নয়। আবার বুঝতে পারছে বললেও ভুল হবে। ধারালো তলোয়ারের মতো সামনে লকলক করছে মোনা। তার সর্বাঙ্গে ধার, চোখে ধার, মনে ধার, কথায় ধার। কতখানি ক্ষতবিক্ষত হল তা নিজেও বুঝতে পারছে না অমল। শুধু ঠোঁট থেকে রক্ত মুছতে গিয়ে জিবে নোতা স্বাদ পায় সে।
ক্লিষ্ট, মার-খাওয়া জন্তুর মতো সে বোধহীন চোখে চেয়ে থেকে অনেকক্ষণ বাদে বলে, ডিভোর্স।
হ্যাঁ। কথাটা কি নতুন শুনলে!
এইবার অমল অদ্ভুতভাবে বলে উঠল, একটু নতুন লাগছে।
সে কী! নতুন লাগার মতো কথা তো নয়!
অমল নিজেকে সামলাতে রেলিং ছেড়ে দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়াল। তার হাঁফ ধরছে কেন কে জানে। বলল, নতুন নয়, বড্ড আকস্মিক।
কাব্য করে লাভ নেই। তুমিও তো এটাই চাইছিলে!
অমল নেতিবাচক মাথা নাড়ল, কিন্তু জবাব দিল না।
ডিভোর্স পেলেই বা তোমার কী সুবিধে হবে তা জানি না। যে বিদ্যাধরীর জন্য তুমি সংসার ছেড়ে এখানে পালিয়ে এসেছ সেও তো দুটো বাচ্চার মা, সে কি স্বামী ছেড়ে তোমাকে নিয়ে থাকতে রাজি হয়েছে?
অবাক অমল বলে, কে? কার কথা বলছ?
আকাশ থেকে পড়লে নাকি? জান না কে?
মোনার পিছনে বউদি এসে দাঁড়িয়েছে। হাত বাড়িয়ে পিছন থেকে মোনার কাঁধটা ধরে বলল, ওসব কথা পরে হবে ভাই। এখন এসো তো আমার সঙ্গে।
মোনা একটু ঝাঁঝের গলায় বলে, কোথায় যাব?
এতটা রাস্তা এসেছ, পরিশ্রম তো কম হয়নি। একটু জিরিয়ে নাও আগে। কথা তো পরেও হতে পারবে। ধুলো-পায়ে ওসব এখন বলতে হবে না।
বউদির বলাটার মধ্যে একটা দীন ভাব ছিল। ভারী নরম গলায় বলা। মোনা কী ভাবল কে জানে, একবার অমলের দিকে চোখ হেনে চলে গেল।
শরীরটাকে সামলাতে একটু সময় নিল অমল। আজকাল তার কী হয়েছে কে জানে, একটু উত্তেজনার ব্যাপার হলেই শরীর কাঁপতে থাকে, মাথা টাল খায় এবং দুর্বল লাগতে থাকে।
একরকম টাল খেতে খেতেই সে ঘরের লাগোয়া বাথরুমে এসে ঢুকল। স্বলিত হাতে আলোয়ানটা খুলে রডে রাখতে গেল সে, পারল না। আলোয়ানটা পড়ে গেল মেঝের ওপর। সেটা আর তুলল না
