আপনি একটা অদ্ভুত লোক মশাই, এঁড়ে তর্কের ওস্তাদ। যৌনকর্মী কথাটার তাৎপর্য স্বীকার করতে চাইছেন না তো! বলতে চাইছেন নাম বা অভিধা পালটে দিলেই বিষয়বস্তুটা পালটে যায় না? আপনার মতে বারাঙ্গনা বা বারবধূ যৌনকর্মীর চেয়ে অনেক ভাল শব্দ! এই প্রসঙ্গে আপনি হরিজন শব্দটিও লক্ষ করতে বলছেন আমাকে! অন্ত্যজ শ্রেণীকে মর্যাদা দিতে গান্ধীজি যে হরিজন শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন তাতে মোটেই তাদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়নি!
কী বললেন? বেশ্যাদের যৌনকর্মী আখ্যা দিয়ে আদিখ্যেতার চেয়ে তাদের নিয়মিত ডাক্তারি পরীক্ষা, চিকিৎসা, মাসি ও গুণ্ডা তোলাবাজদের হাত থেকে বাঁচানোর ব্যবস্থা করা অনেক বেশি জরুরি? আহা, আস্তে আস্তে হবে, সব হবে। আগে মর্যাদা দিতে শিখুন তো, তারপর চিকিৎসা ইত্যাদিও হতে থাকবে! দেশে এখন একটা নবজাগরণ শুরু হয়েছে। মানুষ সচেতন হচ্ছে। ভাল-মন্দের নতুন বিন্যাস শুরু হয়েছে।
আচ্ছা মশাই, আচ্ছা, আমি মেনে নিচ্ছি যে নবজাগরণ কথাটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। তবে এটা তো মানবেন যে পুরনো মূল্যবোধগুলি ধীরে ধীরে পালটে যাচ্ছে। যেমন ধরুন, পৃথিবীতে নাস্তিকের সংখ্যা বাড়ছে। ধরুন, জাতপাত বর্ণাশ্রম এসব আজকাল আর তেমন মানতে চাইছে না কেউ। মেয়েরা আবদ্ধ থাকতে চাইছে না সতীত্বের সংজ্ঞায়। পাপ বা বিকৃতি বলে ধরা হচ্ছে না সমকামিতাকে। আপনি মানতে না চাইলেও এসব তো ঘটছে। এগুলো কি প্রগতির লক্ষণ নয়?
নয়? জানতাম আপনি এসব বুঝতে চাইবেন না। তর্ক থাক, আসুন আমরা ওই সুন্দরী নারীটির সৌন্দর্য কিছুক্ষণ অবলোকন করি। আমাদের ভাটিয়ে-যাওয়া যৌবনের জন্য একটু শোক হবে হয়তো। তা হোক। শরীর বুড়ো হয় বটে, কিন্তু মন তো হয় না। ওই সৌন্দর্য আমাদেরও স্পর্শ করে।
কী বললেন? একজন নরখাদক বাঘের কাছে ভারতসুন্দরীর সৌন্দর্যের কোনও আবেদন নেই? শুধু রক্তমাংসের লোভ আছে। কী বীভৎস চিন্তা আপনার! ধন্যি মশাই, এমন চমৎকার এক সন্ধ্যায় হঠাৎ আপনার নরখাদকদের কথা মনে হল কেন? আপনি দর্শকদের মধ্যে সেই নরখাদকদেরই দেখতে পাচ্ছেন বলে? না মশাই, সত্যিই আপনাকে নিয়ে পারা যায় না…
পাশের ঘরে একটা খুটখাট শব্দ হচ্ছিল। কে যেন তালা খুলে ঘরে ঢুকল। একটু গলাখাঁকারির শব্দ। মেয়েলি গলা। ঘরটা বন্ধই থাকে। তবে কি কাজের মেয়েটা ঘর পরিষ্কার করতে ঢুকেছে?
চিন্তার সূত্রটা ছিঁড়ে যাওয়ায় অমল কলমটা রেখে দিয়ে চেয়ারে বসেই আড়মোড়া ভাঙল। শরীর দুর্বল লাগছে। সকালে দুবার চা খেয়েছিল সে, আর কিছু খায়নি। টেবিলের একপাশে এখনও জলখাবারের প্লেটটা পড়ে আছে যা স্পর্শও করেনি সে। দুটো মাখন মাখানো টোস্ট, ডিম সেদ্ধ আর দুটো কলা। খেতে ইচ্ছে হয়নি, তারপর ভুলেও গেছে। এখন খিদেয় পেট জ্বলে যাচ্ছে। তার।
ঘড়ি দেখে একটু অবাক হল অমল। বেলা পৌনে একটা। এখনই বউদি খেতে ডাকবে নীচে। কয়েকটা মাছি উড়ে উড়ে বসছে টোস্ট আর ডিমের ওপর। সে প্লেটটা তুলে নিয়ে পিছনের বারান্দায় এসে নীচে আগাছার জঙ্গলে খাবারগুলো ফেলে দিল। ভূতভুজিতে লাগুক। কাক কুকুরেরা সন্ধান করে ঠিক খেয়ে নেবে।
গায়ে বহুকাল তেল মাখে না সে। ছেড়েই দিয়েছে ওসব। বড়জোর স্নানের পর একটু ক্রিম জাতীয় কিছু মেখে নেয় হাতে, পায়ে, মুখে। তার বড় শুষ্ক শরীর, সহজেই খড়ি ওঠে গায়ে, ঠোঁট ফাটে। শরীরে স্নেহজাতীয় পদার্থের অভাবই হবে হয়তো। শরীরে আরও অনেক অভাব নিশ্চয়ই রয়েছে তার। কে সেসবের খবর রাখে? এখানে ক্রিম-ট্রিম নেই বলে তার শরীরে প্রায় বিভূতির মতো খড়ি উঠেছে। ঠোঁট ফেটে প্রায়ই রক্তের স্বাদ পায় জিভে। চুল ছাঁটতে খেয়াল থাকে না বলে লম্বা চুল ঘাড় অবধি নেমেছে। মাথা চুলকোয়ও খুব। উকুন হয়ে থাকতে পারে। বা খুসকি। কে জানে কী। নিজের দিকে বহুকাল নজর দেওয়া হয়নি।
পিছনের বারান্দার কোণে ত্রিভুজের মতো এক টুকরো রোদে দাঁড়িয়ে থাকে অমল। স্নান করতে হবে। বড্ড শীত। ঠান্ডা জল গায়ে ঢালতে হবে ভাবলেই যেন শরীর সিরসির করে।
একটা শব্দ পেয়ে আনমনা চোখ ঘুরিয়ে লম্বা বারান্দায় অন্য প্রান্তে সে একজন ফর্সা মহিলাকে দেখতে পেল। নীল শাড়ি, তার ওপর কাশ্মীরি শাল। দেখতে বেশ সুন্দরীই মনে হল।
কেমন আছ?
প্রশ্ন শুনে বেশ কুঁকড়ে গেল অমল। কী লজ্জা! এ তো মোনা!
আমাকে দেখে কি ভয় পেলে নাকি?
অপরাধবোধ, লজ্জা, ভয় সব একসঙ্গে চেপে ধরল অমলকে। হঠাৎ বড্ড ঘাবড়ে গেছে সে। একটু ক্যাবলা হাসি হাসতে গিয়ে ফাটা ঠোঁট চড়াক করে আরও একটু ফেটে গেল। এক ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে নামল ঠোঁট থেকে থুতনি বেয়ে। আলোয়ানটা তুলে ঠোঁট চেপে ধরল সে।
এমনভাবে চেয়ে আছ যেন চিনতেই পারনি!
ভারী অপ্রস্তুত অমল বলে, আরে না না, চশমাটা চোখে নেই বলেই বোধহয়
চশমা তো তোমার চোখেই রয়েছে।
ওঃ হ্যাঁ। তাও বটে। কী আশ্চর্য! কখন এলে?
এই মাত্র।
কেউ বলেনি তো আমাকে!
বললে কী করতে? আহ্লাদে নেচে উঠতে?
তা নয়। আসলে আমি একটু অন্যমনস্ক ছিলাম হয়তো!
সে তো দেখতেই পাচ্ছি। কার কথা ভাবছিলে?
আরও ঘাবড়ে ভয় খেয়ে অমল বলে, না তো! কারও কথাই ভাবছিলাম না তো! একটু লেখালেখি করছিলাম তো! তাই বোধহয়–
তুমি কি সাহিত্যিক হওয়ার চেষ্টা করছ?
