তা হোক, একটু বলো।
তোরা বলিস আমি নাকি একচোখো, শুধু ওই মানুষটার ওপরেই নাকি আমার যত টান। কিন্তু আমরা তো এখনকার মতো ঢলাঢলি করিনি কখনও। দুজনে যেন কুলি আর কামিন। সংসার গড়ে তুলতে দুজনেই মনেপ্রাণে খেটে গেছি। তখন শ্বশুর শাশুড়ি ছিল, দেওর ননদরা ছিল। মস্ত সংসার। দিনমানে তো স্বামী-স্ত্রীর দেখাই হত না। সংসারের নানা কাজে জড়িয়েমড়িয়ে থাকতুম। কিন্তু সবসময়ে মনটা সজাগ থাকত ওই মানুষটার জন্য।
ওরকম হ্যান্ডসাম পুরুষ তুমি আর দেখেছ?
দুর বোকা! হ্যান্ডসাম বলেই কি আর ভালবাসতুম? দেখতে কুৎসিত হলেও অন্যরকম হত না। তার। রূপটা চোখ টানে ঠিকই, কিন্তু মেয়েরা যাকে পায় তাকে ঘিরেই লতিয়ে উঠতে চায়। ওইটেই তো মেয়েদের স্বভাব। সেই স্বভাবকে এখনকার মেয়েরা জলে ভাসিয়ে দিয়ে অন্যরকম হতে চায় বলেই তো এত অশান্তি।
বাবা তোমার জন্য কেমন অস্থির হত বলো।
না বাপু, তার আদিখ্যেতা ছিল না। যখন দশ বছরেরটি এসেছিলুম, তখন তো সে ছিল বাপ দাদার মতো একজন। বয়স্ক, গম্ভীর, সবসময়ে আগলে রাখত। যখন বড় হয়েছি তখন হল অন্যরকম। আমার ওপর খুব নির্ভর করত। যা বেঁধে দিতুম তাই খেত, টু শব্দটি করত না। কাজকর্মে ভুল হলে মাথায় হাত বুলিয়ে নরমভাবে বুঝিয়ে দিত। তার মুখ থেকে যে কথা বেরোত তাই আমার মনে হত বেদবাক্য।
কখনও ঝগড়া হয়নি তোমাদের, না?
না বাপু, ঝগড়া কাকে বলে তা জানতুম না। মতের অমিল হলে দুজনে বসে কথা কয়ে কয়ে সব ঠিক করে নিতুম। যারা বলে সে অত্যাচারী পুরুষ ছিল তাদের মুখে আগুন। তারা তার হাঁকডাকটা দেখত। তার বুকের ভিতরটা তো আর দেখতে পেত না।
কথায় বাধা পড়ে গেল। দুখুরি এসে বলল, ও মা, তুমি বসে আছ যে! বামুন ঠাকুর বলে পাঠাল, কী রান্না হবে তার জোগাড়যন্তর হয়নি এখনও।
বলাকা বলে, তাড়া কীসের? যাচ্ছি বল গে। হ্যাঁ রে দুখুরি, তোর বাপটা কখন থেকে এসে বসে আছে, একবার সামনে আসিস না কেন? ওরও তো মেয়েকে একটু চোখের দেখা দেখতে ইচ্ছে করে।
ইল্লি! আমার জন্য মোটেই আসে না, টাকার জন্য আসে।
ছিঃ, ওরকম বলতে নেই। ও গরিব মানুষ, টাকা তো লাগবেই। তা বলে ওরকম তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবি? তুই কী রে?
চাপা গলায় দুখুরি বলে, গায়ে ঘামের গন্ধ যে! খইনি খায়, এঃ মা! ঝাঁটার মতো গোঁফ।
ও মাঃ তাতে কী হল! তবু তো বাপ! যা না একটু কাছে গিয়ে দাঁড়া, খুশি হবে খন।
ইল্লি। ও আমি পারব না।
ছিঃ মা। ওরকম করতে নেই। লোকটা দুঃখ পাবে। যা একটু কাছে।
গিয়ে কী করব?
একটা পেন্নাম কর।
দুখুরি ভারী লজ্জা-লজ্জা ভাব করে বলে, পেন্নাম করিনি তো কখনও।
আজ কর। বাবাকে পেন্নাম করতে হয়। যা।
দুখুরি একটু গুম হয়ে থেকে তারপর খুব অনিচ্ছের সঙ্গে গিয়ে বাপের সামনে দাঁড়াল।
বাঙালির মুখখানায় ভারী বোকা একটা হাসি ফুটে উঠল হঠাৎ।
দুখু, তু তো বড় হয়ে গেছিস!
দুখুরি খপ করে নিচু হয়ে পায়ের ধুলো নিতেই বাঙালি দুহাতে আঁকড়ে ধরল তাকে। তারপর হঠাৎ হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল।
৪৬-৫০. ভারতসুন্দরী মিস ইন্ডিয়া
৪৬.
ওই দেখুন, ভারতসুন্দরী মিস ইন্ডিয়া দাঁড়িয়ে আছে এক মোহিনী বিভঙ্গে। কাধ থেকে কোমর অবধি লম্বমান সোনালি ম্যাশ, তাতে সমুদ্রনীল রঙের অক্ষরে লেখা মিস ইন্ডিয়া…। ভারী রূপবতী মেয়ে। দীর্ঘকায়া, নির্মেদ। চোখে বৌদ্ধিক আলো আর কলঙ্কহীন দাতে শ্বেতশুভ্র হাসি।
কী বললেন! ভোগ্যপণ্য? আপনি দোষদৃষ্টিপরায়ণ বলেই কি একথা বলছেন না? আপনার সৌন্দর্য দেখার চোখই নেই। শুনুন মশাই, সৌন্দর্যের সবটুকুই শুধু শরীরী নয়, শরীরের অতিরিক্ত কিছুও নিশ্চয়ই আছে। সেইটে উপভোগ করুন। মেয়েটিকে ভাল করে লক্ষ করুন, ওকে ঘিরে কি এক আশ্চর্য চৌম্বক বলয় রচিত হয়নি?
একজন রসিক বিচারক ওকে প্রশ্ন করেছিল, হে সম্ভাব্য ভারত সুন্দরী, আপনি ভূত ও আরশোলার মধ্যে কাকে বেশি ভয় পান?
সুন্দরী সহাস্যে বলেছিল, আরশোলাকে।
আর একজন বিচারক প্রশ্ন করে, দুজন পুরুষ মানুষের মধ্যে একজন খুব একটা সুন্দর নয়, খুব একটা চালাক-চতুর বা চটপটে নয়, খুব মানিয়ে-গুছিয়ে চটকদার কথা বা জোক্স বলতে পারে না, কিন্তু সে খুব সৎ, সত্যবাদী, চরিত্রবান। আর একজন চৌখশ, চালাক, বেশ স্মার্ট, মাচো হ্যান্ডসাম চেহারা, কথায়বার্তায় খই ফুটছে, কিন্তু সে ঘুষখোর, মিথ্যেবাদী এবং লম্পট। এ দুজনের মধ্যে যদি একজনকে বেছে নিতে হয় তবে আপনি কাকে নেবেন?
একটু মিষ্টি হেসে সুন্দরী বলেছিল, দুজনের মধ্যে যার টাকা বেশি আমি তাকেই বেছে নেব।
কী বিপুল হাততালি পড়েছিল শুনেছেন? কী চোখধাঁধানো জবাব বলুন তো! জবাবটা কি আপনার পছন্দ হল না? না! টাকা জিনিসটাকে কি আপনি পুরুষের সর্বোত্তম গুণ বলে মনে করেন না? আশ্চর্য মশাই, আপনি নিতান্তই সেকেলে তোক দেখছি! এরপর আবার বর্ণাশ্রমের কথাও তুলবেন নাকি? বস্তাপচা সব ধারণা নিয়ে বসে থাকলে এই শৃঙ্খলমুক্ত মানসিকতার যুগকে আপনি বুঝবেন কী করে? মেয়েটা কী ভীষণ প্র্যাকটিক্যাল, স্মার্ট এবং ডাউন টু আর্থ বলুন তো!
কী বললেন! এই শরীর-দেখানো, কটাক্ষ-মদির সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা একধরনের বিপণন! তার মানে কী মশাই? বিপণন কথাটা আসছে কোথা থেকে? মার্কেটিং-এর বঙ্গানুবাদ নাকি? তার মানে আপনি কী ইঙ্গিত করছেন বলুন তো! ঝেড়ে কাশুন তো মশাই। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কি বলতে চাইছেন এটা একধরনের সূক্ষ্ম বেশ্যাবৃত্তি? শুনুন মশাই, এখন যৌনকর্মীরাও মেইনস্ট্রিমে চলে আসছে। তারাও এখন আর আলাদা কিছু নয়। তাদের এখন এক ধরনের শ্রমজীবী বলেই ধরা হয়। সুতরাং আপনার ওরকম কটাক্ষ করাটা মোটেই যুগোপযোগী হচ্ছে না।
