সে একজন বেশ লেখাপড়া জানা মেয়ে, এম এ পাস। সে কম্পিউটার শিক্ষিত। সে একটা কারখানা চালানোর প্রায় সব কলাকৌশলই জানে। আধুনিক পৃথিবীর মোটামুটি সব খবরই সে রাখে। মুক্ত নারী, তার কোনও কুসংস্কার বা অন্ধ বিশ্বাস থাকার কথা নয়। তার মনের একটা সত্তা এই স্বপ্ন-দেখার ভিতরে কোনও সত্যকে স্বীকার করে না। আবার দ্বিতীয় আর একটা সত্তা দুহাতে আঁকড়ে ধরতে চাইছে ওই অন্ধ বিশ্বাসকে। বাবা আসছে, আমার গর্ভে বাবা আসছে। বাবাই যে আসছে তার কোনও যুক্তিসংগত প্রমাণ কখনও পাওয়া যাবে না, জানে পারুল। অন্ধ বিশ্বাসই হবে একমাত্র সম্বল। এই নিষ্ঠুর সত্যকেও সে এড়াতে পারে না। আর এই দোলাচল নিয়েই রচিত হয় মানুষের অদ্ভুত মনোভূমি।
না, আজ সে অবিশ্বাস করবে না। আজ সে একজন গ্রাম্য অশিক্ষিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন চাষি বউয়ের মতো বিশ্বাসটা করবে ভোরের ওই স্বপ্নকে। ওই অন্ধ বিশ্বাসই আজ তার বড় দরকার। সে তাই আজ সূর্যের কাছে প্রার্থনা করল, ভুলিয়ে দাও, শিখেছি, যা বুঝেছি তা ভুলিয়ে দাও, বিশ্বাস করতে দাও আমার ভোরের স্বপ্নকে….
ওই বাঙালি এসে বসেছে পশ্চিমের দাওয়ায়। পাশে দিশি বিস্কুটের টিন। রোদে ডগোমগো উঠোনে বসে আছে নেড়ি কুকুর আর তিনিটে কুশি কুশি ছানা। বাঙালি খইনি টিপছে মন দিয়ে। তার কোনও তাড়া নেই। দুখুরির মাস-মাইনেটা হাত পেতে নিয়ে যায় প্রতি মাসকাবারে।
আজ বলাকা বলল, হ্যাঁ রে বাঙালি, তুই যে ফি মাসে এসে দুখুরির মাইনে নিয়ে যাস তারপর তা পেটায় নমঃ করিস, তা মেয়েটার তো আখের দেখতে হবে। আমি ভাবি ওর নামে পোস্ট অফিসে কিছু কিছু করে রাখলে তো ওরও সুবিধে, তোরও সুবিধে। ওর বিয়ের সময়ে তাহলে আর তোকে হাত পাততে হবে না, ধারকর্জও করতে হবে না।
বাঙালি শশব্যস্তে বলে, উও বাত তো ঠিক আছে মাতাজি। এখুন কিছু মুসিবাত হচ্ছে, দু-চার মাহিনাকে বাদ আপনি ডাকঘরে রেখে দিবেন।
কেন রে, তোকে যে দোকান করার টাকা দিলুম তার কী করলি? দোকানটা নিসনি?
হ্যাঁ, হ্যাঁ জরুর, দুকান তো লিয়েছি মাতাজি!
তা তোর কি দোকানে লোকসান যাচ্ছে?
নুকসান তো যাবেই মা। ভুজিয়ার দুকান তো এখানে ভাল চলে না। বর্ধমান হলে চলত।
নাঃ। তোকে দিয়ে কিছু হবে না দেখছি। মেয়েটাকে পথে বসাবি।
আর দু-চার মাহিনা বাদ সব ঠিক হয়ে যাবে মা।
দুর মুখপোড়া! সেই কবে থেকে শুনছি দু-চার মাস বাদে সব ঠিক হয়ে যাবে। তোর নতুন বউটার পিছনে ঢালছিস বুঝি সব কিছু? তা মা-মরা মেয়েটার কথাও তো ভাববি! ভালমানুষের মতো মুখ করে ওর মাইনের টাকাটা নিয়ে যাচ্ছিস, ওর তো কিছু জমছে না। এবার এসেছিস, টাকা নিয়ে যা। এর পরের মাস থেকে কিন্তু আর পুরো টাকা দেব না। পোস্ট অফিসে জমা করব। বুঝলি?
বাঙালি ভারী লাজুক ভঙ্গিতে বসে মাথা চুলকোয়৷ মুখে একটু ক্যাবলা হাসি।
বলাকা রাগ করে বলে, তুই তো জন্ম দিয়েই খালাস, নামে মাত্র বাপ৷ মেয়েটাকে তো কোলেপিঠেও করিসনি বোধ হয়। বউ মরতেই আর একটা বিয়ে করে এনেছিস। ধন্যি বাপ তুই! মেয়েটা তো বাপকে দেখলে যেন ভূত দেখে।
বাঙালি লজ্জা পেয়ে বলে, আমার মুচ আছে তো মা, দুখারি মুচকে খুব ডরায়, উসি লিয়ে উ আমার পাশ আসে না।
আহা, বাপের গোঁফ থাকলে মেয়ে ভয় পায় জন্মে শুনিনি বাবা। হ্যাঁ রে পারুল, তোর বাপেরও তো গোঁফ ছিল, তার জন্য কি তোরা ভয় পেতি? মুখপোড়ার কথা শোন।
পারুল উঠোনে বলাকার পাশে রোদে বসেছিল। আজ ভারী আনমনা সে। কথাবার্তা কিছুই কানে যাচ্ছিল না তার। ভারী বিভোর হয়ে আছে নিজের মধ্যে। ডাক শুনে গভীর অন্যমনস্কতা থেকে বলল, উ!
বলাকা ফের বাঙালির সঙ্গে কথা ফেঁদে বসে। পারুল ফিরে যায় তার অন্যমনস্কতায়। তার পেটের ভিতরে এক দিব্য পুরুষ। এই পৃথিবীর কিছুই আজ তাকে স্পর্শ করছে না।
হ্যাঁ রে, জ্যোতিপ্রকাশ কখন আসবে?
ফের যেন গভীর অতল থেকে বাস্তবে উঠে আসতে হয় পারুলকে। বড় কষ্ট হয়।
কী বলছ মা?
বলি জামাই আসবে কখন?
টাটা থেকে সকালে রওনা হবে। পৌঁছতে দুপুর গড়িয়ে যাবে মনে হয়।
কালকেই তো রওনা হয়ে যাবি! বাড়িটা ফাঁকা হয়ে যাবে।
পারুল একটু হাসল, তোমার কি ফাঁকা লাগে মা? তুমি যেদিকে তাকাও সেদিকেই তো বাবাকে দেখতে পাও, তাই না?
তা পাই। তা বলে কি তোরা আমার কিছু নয় নাকি?
মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, আমরা সত্যিই তোমার কাছে কিছু নয়। বাবাই তোমার সব।
তোদের মধ্যেও তো তোর বাবাই জন্ম নিয়েছে। নইলে জায়া বলেছে কেন? বাপ তার ছেলেপুলের ভিতরে দিয়ে ফের জন্মায় বলেই না তার ছেলেপুলের মা হল তার জায়া।
তবু স্বীকার করবে না যে তুমি বাবাকে আমাদের চেয়ে বেশি ভালবাসতে?
বলাকা হাসে, ভালবাসার কমবেশি কি বোঝা যায় রে, নাকি মাপা যায়? কাকে ফেলে কাকে রাখি বল তো! তোরা যে কে কার চেয়ে কম তা কি ঠিক বুঝতে পারি? সকলের জন্যই বুক টনটন করে।
দেখলে তো মা, আজ আমার বমি হল না।
রোসো বাছা, সবে খেয়েছ। এখনও সময় যায়নি। বেশি বাহাদুরি করতে হবে না। আগে খাবারটা তল হোক তারপর বোঝা যাবে।
আর হবে না মা। দেখো, সব ঠিক হয়ে যাবে।
বলাকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
আজ আমাকে একটু বাবার কথা বলো তো মা। খুব শুনতে ইচ্ছে করছে।
ওরে, ঝাঁপি খুলে বসলে কথায় কথায় বেলা হয়ে যাবে। কত শুনবি?
