মহিম রায় মুগ্ধ চোখে চেয়ে দেখছিল, মুগ্ধ কানে শুনছিল। এ সে শুনছে কী? একজন স্বাধিকারপ্রমত্ত অত্যাচারী স্বামীর নির্যাতিতা স্ত্রী বলছে এ কথা? এও কি সম্ভব?
মেলে না, মেলে না, হিসেব কিছু মিলতে চায় না। এই ঊনআশি বছর বয়সে জীবনের অঙ্কে ভুল ধরা পড়ে সে যেন মনে মনে কানমলা খায়। হরিদার কাছে সে অনেক ব্যাপারেই হেরে-যাওয়া মানুষ, কিন্তু মরার ভিতর দিয়ে সেই পরাজয়ের বিপুলতা যেন আরও উদঘাটিত করে দিয়ে গেছে লোকটা।
যে ছেলেটিকে বাপের খেয়াল মেটাতে মার্চ মাসের হাড়কাঁপানো শীতের রাতে পুকুরে জাল ফেলে মাছ তুলতে হয়েছিল, ফিজিক্সের কৃতী অধ্যাপক সেই ছেলে ঝন্টু বাপের বুক থেকে হঠাৎ মুখ তুলে ছোট ভাইকে ব্যস্তসমস্ত হয়ে বলে উঠল, এই মন্টু, দেখ দেখ, বাবার বুকে যেন হার্টবিট পাচ্ছি! কেমন শব্দ হচ্ছে বুকের মধ্যে। বাবা নিশ্চয়ই মরেনি! ফকিরবাবার জল-পড়া খাইয়েছি, মরতে পারেই না।
কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার ছোট ছেলে মন্টু ভ্যাবলার মতো বাবার বুকে কান পেতে কী শুনছিল কে জানে। কিন্তু মহিমের মনে হচ্ছিল, ফকিরবাবার জল-পড়ার গুণ নয় বাবারা, বেঁচে উঠলে হরিদা তোমাদের পিতৃভক্তির জোরেই বেঁচে উঠত। ঘোর কলিকাল বাবারা, নইলে এত ভালবাসা বৃথা যেত না।
দুটি ছেলে সারাজীবন বাপের সঙ্গে কথা বলার সময় দাঁড়িয়ে কথা বলেছে, কখনও বসেনি। বউমারা এই আধুনিক যুগের মেয়ে হয়েও শ্বশুরের সামনে ঘোমটা ছাড়া আসেনি। শোকের বাড়ি যখন মুহ্যমান, চারদিকে কান্নার রোল, তখন মহিম মৃতের ঘরে আনন্দে অভিভূত হয়ে বসে আছে। তার চারদিকে যেন সত্যযুগের হাওয়া বইছে।
শরীর ভাল নয়, সবাই বারণও করেছিল, তবু মহিম রায় গৌরহরির মৃতদেহের অনুগমন করেছিল। তখন গভীর রাত, তিন মাইল রাস্তা ভেঙে যেতে যেতে মনে মনে বলেছিল, কায়দাটা শিখিয়ে দিয়ে গেলেন না হরিদা! বহুকাল ধরে চেলাগিরি করলুম তবু শিখতে পারলুম কই? না কি এসব শেখার বা শেখাবার জিনিসই নয়, এসব কেউ কেউ নিয়ে আসে।
না, মহিম রায় কখনও গৌরহরি চাটুজ্জের মতো ছিল না। সে বরাবর তার পরিবারের প্রতি অত্যধিক স্নেহশীল। পাঁচজনের দুঃখকষ্টের কথা ভেবে সর্বদাই নিজেকে আরাম আয়েস থেকে গুটিয়ে রেখেছে, এক গেলাস জল কাউকে গড়িয়ে দিতে বলতেও ছিল ভারী কুণ্ঠা। ছেলেদের সঙ্গে এক সারিতে খেতে বসেছে, বড় মাছের টুকরোগুলো ছেলেদের পাতেই দিয়েছে দেবিকা–তার বউ। কখনও তাতে কিছু মনে করেনি মহিম। ভুলটাও কি সেখানেই? তখন থেকেই কি সংসারে সে উদ্বৃত্তের খাতে?
যখন মেজো ছেলে অমল ক্লাসে কাঁড়ি কাঁড়ি নম্বর পেয়ে ফাস্ট হওয়া শুরু করল তখন হল আরও চিত্তির। প্রথমে আনন্দ এবং বিস্ময়। পুত্ৰগৌরবে বুক তিন ইঞ্চি বেড়ে গেল। মাধ্যমিকে স্ট্যান্ড করে যখন সেই ছেলে হইচই ফেলে দিল তখন এল ভয়। ছেলেকে সেই থেকে সমীহ করতে শুরু করেছিল সে। বাপকে কোনওদিনই ছেলেরা সমীহ করত না। অমলের তাচ্ছিল্যটা ছিল আরও প্রকট। কৃতী ছেলেদের বোধহয় সেই অধিকার জন্মায়–এই ভেবে মহিম মেনেও নিল ব্যাপারটা। দেবিকা মাঝে মাঝেই বলত, অমল! অমল তো মানুষ নয়, ভগবান।
জিন থেকেই সব হয়-টয় বলে শুনেছে মহিম। বংশধারার কোন গাঁটে কোন জিন যে ঘাপটি মেরে থাকে আর তা থেকে কী করে যে এক একজন এরকম দলছুট জন্মায় কে জানে! নইলে তার মতো অ্যাভারেজ সাদামাটা মানুষের ঘরে অন্য সব সাদামাটা ছেলেমেয়ের মধ্যে একটা কী করে অমন মাথাওলা বেরোল!
ঠোঁটকাটা, বদরসিক রসময় একবার বলেছিল, ওরে, এ যে কাকের ঘরে কোকিলের ছা। তোর হাতে আর কেউ তামাক খেয়ে গেল না তো!
এ কথায় প্রায় হাতাহাতি হওয়ার উপক্রম। ঠাট্টাই হবে, তবু অমন ঠাট্টা কেউ করে? আজ অবশ্য কথাটা ভাবলে রাগ হয় না। অমল কি সত্যিই তার ছেলে? সে কি ওর নির্মাতা? ওর চোখ, কান, মুখ, মন, মেধা এসব তো মহিমের তৈরি নয় হে বাপু। সে জন্মদাতা হতে পারে, সৃষ্টিকর্তা তো নয়।
অমলের সঙ্গে ভাবভালবাসা হয়েছিল গৌরহরিদার ছোট মেয়ে পারুলের। সেটা মহিমের কাছে আনন্দের ব্যাপারই ছিল। হরিদার সঙ্গে একটা আত্মীয়তার সম্পর্ক তার আকাঙ্ক্ষারই বস্তু। তা ছাড়া ও বংশের মেয়ে ভালই হওয়ার কথা। যে মেয়ে নিজের বাবার সেবা করে বড় হয়েছে সে স্বামীর ঘরে এসেও সবাইকেই সুখী করে।
কিন্তু আচমকাই পারুলের অন্য পাত্রের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়ে গেল।
মহিম রায় দৌড়ে গিয়েছিল গৌরহরির কাছে।
হরিদা, এ কী শুনছি!
গৌরহরি বৈঠকখানায় বসে দলিলপত্র দেখছিলেন। তলচক্ষুতে তাকে একটু দেখে নিয়ে বললেন, কখনও প্রেমে-ট্রেমে পড়েছিস?
আমি! কী যে বলেন! আমাদের সুযোগ ছিল কোথায়?
তাহলে বুঝবি কী করে? ও-বস্তু আমারও তো হয়নি। পঁচিশ বছর বয়সে একটা দশ বছর বয়সি মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিল বাবা। সে প্রেম করবে কী, ভয়েই মরে। তাই বলছি এসব আমাদের বোঝবার কথা নয়।
কিন্তু ওদের যে ভালবাসা ছিল, বিয়ের কথা হয়ে আছে।
তাই তো বলছি। তুই কি ভাবছিস আমি জোর করে পারুলের বিয়ে অন্য জায়গায় দিচ্ছি? সেসব ভাবিসনি। অমল ভাল ছেলে, আমাদের সকলেরই পছন্দ। কিন্তু বিয়েটা হচ্ছে পারুলের ইচ্ছেতেই।
কেন এরকম হল হরিদা?
বললুম যে, তুই আর আমি দুজনেই পুরনো আমলের মানুষ, এসব আমাদের বোঝার কথা নয়। তবে এসব প্রেম-ট্রেম হল কাঁচা মাটির কাজ। জলে বৃষ্টিতে গলে ধুয়ে যায়। সংসারের আঁচে না পড়লে কি এসব পাকাপোক্ত হয়? ওদের প্রেম কেঁচে গেছে।
