উত্তেজনায় উঠে পড়ল পারুল। বেসিনে গিয়ে ঠান্ডা জলের ঝাপটা দিল চোখেমুখে। না, আর ঘুমোবেনা সে। ঠাকুরঘরে গিয়ে ঠান্ডা মেঝের ওপর উপুড় হয়ে প্রণাম করে বলল, তাই যেন হয় ঠাকুর, তাই যেন হয়।
চোখে জল আসছে আনন্দে, আবেগে। বুকে উথলে উঠছে এক পরিপূর্ণতা। তার কি এত ভাগ্য হবে।
আর আধঘণ্টা বাদে খোলা বারান্দায় তাকে আবিষ্কার করে বলাকা অবাক।
ও মা! ও কী রে? এই চাষাড়ে শীতে বারান্দায় বসে আছিস যে বড়!
স্বপ্নাচ্ছন্ন, ঘোরলাগা দুটি অপরূপ চোখ মায়ের দিকে ফেরাল পারুল।
একটা কথা বলবে মা!
কথা পরে হবে। আগে ঘরে আয় তো শিগগির। শরীরের এই অবস্থায় ঠান্ডা লাগাতে আছে? নতুন তো মা হোসনি, তবু খেয়াল রাখিস না কেন? এ বাবা, গা তো বরফ হয়ে আছে তোর! আয় শিগগির ঘরে।
ঘরে এনে তাকে বিছানায় বসিয়ে ঢাকাচাপা দিল বলাকা।
শরীর খারাপ লাগছে নাকি?
পারুল সুন্দর করে হাসল, একটুও খারাপ নয় মা, আজ আমার শরীর ভাল, মন ভাল, আজ আমার সব ভাল।
ভাল হলেই ভাল বাছা। এ অবস্থায় শরীরের খেয়াল রাখতে হয়। মায়ের শরীর খারাপ হলে পেটের কুঁচোটারও যে ভোগান্তি হয়।
শোনো মা, খুব মন দিয়ে একটা কথা শুনে জবাব দাও।
কী কথা?
ভোরের স্বপ্ন কি সত্যি হয়?
কী স্বপ্ন দেখলি?
আগে বলো।
শুনি তো সত্যি হয়। কিন্তু জোর দিয়ে বলি কী করে? লোকে তো কত কথাই বলে, তার কতক ফলে, কতক ফলেও না। স্বপ্ন দেখেছিস বুঝি? ভাল স্বপ্ন তো?
ভাল না হলে বলছি! আজ আমার আকাশে উড়তে ইচ্ছে করছে।
ভাল হলে কাউকে বলিস না, বললে নাকি ফলে না।
ও বাবা, এ এত ভাল স্বপ্ন যে না বললে আমার বুক ফেটে যাবে।
তাই নাকি? তাহলে টাপটোপে বল। খুলে বলিসনি।
মায়ের কাছে নাকি সব বলা যায়! মাকে বললে দোষ হয় না, জানো না?
তাহলে দাঁড়া ঠাকুরঘরের বাসি কাজ সেরে নিই আগে। নইলে দেরি হয়ে যাবে।
তুমি বড্ড বেরসিক। শোনো, আমার খুব খিদেও পেয়েছে। তাড়াতাড়ি পুজো সেরে আমাকে খেতে দাও তো!
ও মা গো! আজ কোন দিক দিয়ে সুয্যি উঠবে কে জানে? খিদের কথা শুনে তো বিশ্বাস হয় না।
খাব মা, দেখো খুব খাব আজ।
তাহলে দুখুরিটাকে তুলে দিই। একটু ময়দা মাখুক। খেয়ে আবার উগরে দিও না কিন্তু।
মিষ্টি হেসে পারুল বলে, আজ কিচ্ছু হবে না, দেখো। আজ আমার কিচ্ছু হবে না।
তাই যেন হয়। মহিম ঠাকুরপো যে হোমিওপ্যাথি ওষুধ দিয়ে গেছে তার চারটে বড়ি মুখে ফেলে বসে থাক না।
আজ আমার ওষুধ লাগবে না মা। আমি আজ খুব ভাল আছি।
কী জানি মা, ভয় করে। পেটে কুটো গাছটিও থাকছে না বলে দুশ্চিন্তায় আমার ঘুম হয় না।
আর ভয় নেই মা। আমার পেটে কে আসছে জানো?
বলাকা অবাক হয়ে বলে, পেটে কে আসছে মানে? হিটলার নাকি?
পারুল মিষ্টি হেসে বলে, তাকে অনেকে হিটলারও বলত মা। বলো তো কে?
কী জানি বাবা, সকালে উঠে হেঁয়ালি করতে লেগেছিস।
তার টকটকে ফর্সা রং, ইয়া তাগড়াই চেহারা, চোমড়ানো গোঁফ, পুরুষ সিংহের মতো বুকের পাটা। কে বলো তো? চিনতে পারছ না?
বলাকা বিহ্বল চোখে মেয়ের দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর মৃদু গলায় বলল, কার কথা বলছিস? তোর বাবা?
দুহাতে মাকে জাপটে ধরে বুকে মাথা ঘষতে ঘষতে পারুল বলল, বাবা গো, বাবা!
তাকেই স্বপ্নে দেখেছিস?
স্বপ্ন কী গো! এই যেমন তোমাকে দেখছি ঠিক সেরকম স্পষ্ট, জীবন্ত, ইজিচেয়ারটায় বসে আছে, আমি পায়ের কাছটিতে।
আমি কেন দেখি না রে! কী বলল তোকে?
পরিষ্কার বলল, আমি তোর গর্ভে আসছি, ছেলে হয়ে।
যাঃ! সত্যি?
এই দেখ, গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
বলাকা পারুলের মুখটা বুকে চেপে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, তা আসবে না কেন? তুই ছিলি মানুষটার প্রাণ, তা বলে একচোখো ছিল না মোটেই। সব কটা ছেলেমেয়েকেই ভারী ভালবাসত। কিন্তু আসকারা দিত তোকে।
কত কথা হল বাবার সঙ্গে! কত পুরনো কথা!
বলাকার চোখে জল এসেছিল। ধরা গলায় বলল, কত ভাগ্যি তোর!
হ্যাঁ মা, আজ মনে হচ্ছে আমার বড় ভাগ্য।
আমারই পোড়া কপাল। রোজ ঘুমোনোর আগে তাকে বলি, ওগো, চোখের আড়ালে গেছ, আজ একবার স্বপ্নে দেখা দিও। কিন্তু একদিনও দেখি না তাকে। কত কথা জমে আছে বুকের মধ্যে। ইচ্ছে যায় মুখোমুখি বসে দুটো কথা কই, তা যাই হোক, তুই তো দেখলি! কেমন দেখলি তাকে? রোগা হয়ে যায়নি তো! মুখখানা তেমনি ঢলঢলে আছে? গায়ে রংটা তেমনি আছে?
সব ঠিক আছে মা।
মনে মনে আমারও কতবার ইচ্ছে হয়েছে মানুষটা কোনও না কোনওভাবে ফের ফিরে আসুক.. তোদের কারও ঘরে। তারপর ভেবেছি, তোরা সব বড় হয়ে গেছিস, এ বয়সে আর কি কারও ছেলেপুলে। হওয়ার কথা! মনটা ভেঙে যেত। আজ বুকটা খুব হালকা লাগছে। এখন আর মরতেও ইচ্ছে করছে না। ঠাকুরকে গিয়ে বলি, যতদিন না ছেলেটা হয় ততদিন আমাকে বাঁচিয়ে রেখো ঠাকুর।
মরার কথা বোলো না তো! এমন একটা সুন্দর সকালে এসব বলতে নেই।
না মা, মরার কথা নয়, বাঁচার কথাই তো বলছি। বাঁচতে কি ইচ্ছে যায় না, বল তো! কিন্তু বাঁচতে হলে এমন একজনকে চাই যার জন্য বেঁচে থাকার একটা মানে হয়। তার বাবা গিয়ে অবধি সেইটেই হারিয়ে গিয়েছিল।
আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে মা। শিগগির গিয়ে পুজো সেরে লুচি-টুচি ভাজতে বলে দাও। আর নতুন আলু দিয়ে পাঁচ ফোড়নের একটা চচ্চড়ি।
বলাকা চলে যাওয়ার পর গায়ে আলোয়ান জড়িয়ে ফের বারান্দার কোণে এসে দাঁড়ায় পারুল। পুব দিকটা এখান থেকে দেখা যায়। সামনে বাঁশঝাড় আর একটা দোতলা বাড়ির ফাঁক দিয়ে সূর্য ওঠে। এখানে দাঁড়িয়েই তার বাবা রোজ সকালে সূর্য প্রণাম করত। আজ পারুলও করল। তারপর হঠাৎ আপনমনেই হেসে ফেলল।
