কী শুরু করব?
সকাল সন্ধে একটু গায়ত্রী জপ করো, আমি বাবাকে বলব তোমার জন্য একটা পৈত গ্রন্থি দিয়ে দিতে। কাল স্নান করে ভক্তির সঙ্গে পৈতেটা গলায় দিও।
এসব আবার কী জুলুম শুরু করলে? আমি জন্মসূত্রে বামুন হলেও আচার আচরণে চাড়াল। আমাকে দিয়ে ওসব হবে না।
দেখো বাপু, আমি সম্পর্কে গুরুজন, তার চেয়েও বড় কথা, আমি তোমার ভাল চাই। যে তোমার ভাল চায় তার একটা কথা শুনতে দোষ কি?
অমল হেসে বলল, তোমার যে সব অদ্ভুত অদ্ভুত নিদান। একবার বললে বউয়ের সঙ্গে এক বিছানায় শুতে হবে। এখন বলছ পৈতে পরে গায়ত্রী জপ করতে হবে।
তাতে তো বাড়তি পরিশ্রম নেই। না হলে করলেই একটু, ওই যে বলছিলে মনটাকে স্থির করার জন্য লেখো, এও একরকম তাই, মন্ত্র ধরা থাকলে মন স্থির হয়।
মাথা নেড়ে অমল একটু হেসে বলে, মন্ত্র জপ করলে মন স্থির হয় না ঠাকরোন, বিশ্বাস করলে মন স্থির হতে পারে। আমার যে সেখানেই ফাঁক।
তুমি বড্ড ঝগড়ুটে লোক বাপু। একটা না একটা কাঁড়া কাটবেই। বলি বিশ্বাস কি মানুষ সঙ্গে করে নিয়ে আসে?
তবে?
করতে করতেই বিশ্বাস আসে।
আগে তো বুঝতে হবে মন্ত্রের সত্যিই কোনও জোর আছে কি না।
করেই দেখো না।
অবশ্য শাস্ত্রে বলে মনকে যা ত্রাণ করে তাই হল মন্ত্র। একটা এক্সপেরিমেন্ট করতে পারি। কিন্তু যদি কাজ না হয়?
না হলে না হবে।
তখন কিন্তু বিশ্বাস একেবারে চলে যাবে। ছায়াটুকুও থাকবে না।
কাজ হবেই, করেই দেখো।
দীপ্ত মুখে বউদি উঠে চলে গেল।
অনেকক্ষণ গুম হয়ে বসে রইল অমল। ধীরে ধীরে বিকেলের আলো মরে আসছে। সন্ধের সময়টা বড় বিষাদের সময়। এই দিন গিয়ে রাত যখন আসে তখন অমলের মনটায় যেন হু হু করে বিষণ্ণতার বাতাস বয়ে যায়। সে ভারী ছটফট করে তখন।
আজও সে তাড়াতাড়ি গায়ে জামাকাপড় চাপিয়ে রোদ মরতে না মরতেই বেরিয়ে পড়ল। উদ্দেশ্যহীন যাওয়া। সে শুধু পথে বিপথে জোর কদমে হেঁটে যায়, কোথাও পৌঁছোয় না।
.
৪৫.
এবার তোর ছেলে হবে।
যাঃ, কী করে বুঝলে?
বুঝব না! সে কী রে! আমিই তো আসছি!
তুমি?
হ্যাঁ রে। জন্মাতে বড্ড ইচ্ছে যায় যে! নিরালম্ব ঘুরে বেড়াই, এ কি ভাল লাগে বল!
সত্যি বলছ?
সত্যি বলছি।
তিন সত্যি করে বলো। আমার গা ছুঁয়ে বলো।
দুর পাগল! এতে অবিশ্বাসের কী আছে? তোর ছেলে হয়ে আসতে বরাবর ইচ্ছে ছিল আমার।
আমার গর্ভ কি শুদ্ধ, পবিত্র বাবা?
কেন বল তো!
তোমার মতো মানুষ কি অপবিত্র শরীরে জন্ম নিতে পারে?
তুই অপবিত্র কেন মা?
তুমি তো জানো না বাবা, যখন আমার সতেরো বছর বয়স তখন যে আমি অপবিত্র হয়ে যাই।
জানি রে মা, জানি। পাপ-পুণ্যের হিসেব তো অত সহজ সরল নয়। দেহ ভ্রষ্ট হয়েছিল বটে, মন ভ্রষ্ট হয়নি যে! দেহ নয় মা, পাপ হল মনের। শরীর কি পাপ করে? মন তাকে যেমন করতে বলে সে তেমন করে।
তবু কেমন খুঁতখুঁত করে মনটা, ভাবি, কী দরকার ছিল ওরকম হওয়ার? কেন হল? না হলে কি পারত না?
দুনিয়ায় সব ঘটনা কি আমাদের পছন্দমতো ঘটে? দুর পাগল, তাহলে দুনিয়ায় কোনও মজা থাকত না।
কেন আমাকে নিয়েই মজা হল বলো! আমি তো কত শুদ্ধ ছিলাম, মনটাও কত সহজ সরল ছিল, লোককে টপ করে বিশ্বাস করতাম। কাউকে খারাপ বলে মনে হত না। অথচ আমার কপালেই কেন ওরকম বিচ্ছিরি কাণ্ড হল? আকাশ থেকে যেন মাটিতে আছড়ে পড়লাম। তখন আমার কী মনে হয়েছিল জানো? মনে হয়েছিল ভগবান বলেও কিছু নেই। থাকলে কেন এরকম হবে? সেই যে ঘেন্না এল লোকটার ওপর, আর ওর ছায়াটাও সহ্য হত না। এখন দেখলে মায়া হয়।
হ্যাঁ মা, একটা ভুল থেকে কত ভুলে জড়িয়ে পড়ল অমল। ওকে একটু মায়া করিস, সে ভাল। যখন ছোট্টটি ছিলি তখন থেকেই তোর বড় মায়া। আর কাউকে নয়, কিন্তু তোকেই আমি বরাবর আসকারা দিয়েছি।
হ্যাঁ বাবা, তুমি খুব আসকারা দিয়েছ আমায়। সবাই ভয় পেত তোমাকে, আমার একটুও ভয় ছিল না।
যখন হামা দিতি তখন আমি মোকদ্দমার কাগজ দেখতুম, আর তুই টেবিলের নীচে পায়ের কাছটিতে বসে খেলা করতিস। একটু যখন বড় হয়েছিস তখন কী করতিস মনে আছে? রান্নাঘরে গিয়ে যা-কিছু রান্না হত তার খানিকটা বাটি করে নিয়ে এসে আমাকে খাওয়াতিস। অসময়ে আমি কখনও কিছু খেতাম না, কিন্তু তোর পাল্লায় পড়ে খেতে হত। আরও শুনবি? বাড়ির অন্যেরা খেতে বসলে তোর ভয় হত সবাই বুঝি তোর বাবার ভাগেরটা খেয়ে ফেলবে। তাই খুব চেঁচামেচি করতি তুই, তোমরা সব খ্রাচ্ছ। যে! আমার বাবা কী খাবে তবে? তারপর কান্না জুড়তিস।
হ্যাঁ, একটু একটু মনে আছে।
তোর ছেলেই তো ছিলাম আমি। তাই ফের তোর ছেলে হয়েই আসছি।
উঃ, আনন্দে আমার বুকটা কেমন ধকধক করছে? হ্যাঁ বাবা, সত্যি তো?
সত্যি রে, খুব সত্যি।
তুমি খুব দস্যি হবে বাবা?
হয়তো হব। তা বলে মারধর করিসনি যেন!
পাগল! খুব আদর দেব তোমায়, যেমন তুমি দিয়েছ। শিগগির এসো। আমার যে তর সইছে না।
গর্ভ পূর্ণ হোক মা। অপেক্ষা করো।
এসো বাবা, এসো…
ওই এসো শব্দটা জেগে উঠে শুনতে পেল পারুল। তার নিজের গলায়। পা থেকে লেপ সরে গেছে বলে শীত করছে খুব। গায়ে কাঁটা দিচ্ছে, ধড়মড় করে উঠে বসল সে। স্বপ্ন! এ কি স্বপ্ন! কটা বাজে এখন? ডিমলাইটের আলোয় সে মস্ত দেয়ালঘড়িতে দেখল, পৌনে পাঁচ। এ ভোররাতের স্বপ্ন, এই স্বপ্ন সত্যি হয় বলে সে শুনেছে। সমস্ত শরীর জুড়ে আনন্দ যেন সেতারের মতো ঝংকার দিচ্ছে। বাবা আসবে! তার গর্ভে বাবা আসবে! এ কি সত্যি? বিশ্বাস হয় না যে!
