তুই যে মরেছিস!
সত্যি?
হ্যাঁ রে।
নিয্যস?
হ্যাঁ, এবার বেরিয়ে আয় ভিতর থেকে।
মরলাম কখন? কই টের পেলাম না তো?
টের পাবি কী করে? মরেছিস কি আজকে? সেই কবে থেকে মরতে শুরু করেছিস। একটু একটু করে মরেছিস বলে হ্যাঁচকাটা লাগেনি, তা সেটা একরকম ভালই।
সে তো বুঝলাম। এখন বেরোই কোথা দিয়ে বলো তো বাবা যমদূত!
কেন, অসুবিধে কী? নাক মুখ কান গুহ্যদ্বার ব্রহ্মতালু যে কোনও একটা ফুটো দিয়ে টুক করে বেরিয়ে আয়।
বড্ড অন্ধকার যে, ফুটোফাটা দেখব কী করে বলো তো বাবা, একটা বাতি-টাতি দেখাতে পারো না?
দুর বুড়ি, তোর বড্ড বায়নাক্কা, চারদিকে ঢুঁ মারতে থাক, রন্ধ্র একটা ঠিক পেয়ে যাবি। শরীরের মধ্যে বাতি কোথা পাবি?
বড্ড ভয় করছে যে বাপু!
ভয়টা কীসের?
অজান জায়গায় কোথায় নিয়ে ফেলবে বাবা?
তা এটাই বা তোর কোন কালের জায়গা ছিল শুনি! এটাও তো অজানা জায়গা।
তা অবিশ্যি বটে। তবু কেন ভয়-ভয় করছে বলো তো!
ও তোর ভয় পাওয়ার অভ্যাস। মেঘ করলেও ভয়, রোদ উঠলেও ভয়, তোদের কি ভয়ের শেষ আছে? চোরে যেমন সিঁধ কাটে তেমনি সিঁধ কাটতে থাক।
তা হ্যাঁ বাবা যমদূত, আমার শরীরের মধ্যে এত যন্ত্রপাতি কেন বলো তো? ই রে বাবা, যেদিকে টু মারি সেদিকেই যন্ত্রপাতি!
তা আর হবে না! মানুষ বানাতে কি কম মেহনত লাগে আমাদের?
তা আমার ভেতরে এত যন্ত্রপাতি দিয়েছ তোমরা, কই টের পাইনি তো! শুধু পেটের খোঁদলটা খুব টের পেতাম। ই রে বাবা, এ যে কলকারখানা বানিয়ে ফেলেছিলে গো! আমাদের মতো মনিষ্যির কি এত যন্ত্রপাতি লাগে?
তবেই বোঝো, ভগবান মোটেই একচোখা নয়, তোকেও কারও চেয়ে কম দেননি।
কিন্তু বাবা, এখন যে আমার বড্ড মায়া হচ্ছে।
কীসের মায়া রে বুড়ি?
এমন সুন্দর শরীর ছাড়তে ইচ্ছে যাচ্ছে না যে!
মর বুড়ি! এখন মায়ায় পড়লে কি হয়? আর শরীরে তোর আছেটাই বা কী বল! বুড়ো থুথুরে হয়ে গেছিস, শনের নুড়ি চুল, চামড়া ঝুলে গেছে, হাড্ডিসার চেহারা, রাজ্যের অসুখে শরীর ঝাঁঝরা, ও পচা, শরীর দিয়ে কী হবে তোর?
না বাছা, শরীরটা ভেঙে গেছে বটে, কিন্তু তাতে কী? ভেতরে যে ভারী ভাল ভাল বন্দোবস্ত ছিল, এও কি জানতাম? আমার মতো এমন পোড়াকপালির জন্যও এত কিছু করেছ তোমরা।
ভাল করে ভেবে দেখ বুড়ি, শরীর ছাড়বি কিনা।
দুটো চারটে দিন সবুর করো না বাবা, তাড়া কীসের?
তবে শরীর আঁকড়ে পড়ে থাক। আমি চললুম। আমার মেলা কাজ।
.
কী করছ গো বসে বসে?
অমল একটু তটস্থ হয়ে ম্লান হেসে বলল, কিছুনা ঠাকরোন, আগডুম বাগড়ম নানা কথা মাথায় আসে, সেগুলো লিখি।
ও কি তোমার সায়েন্সের ব্যাপার? না না।
অনেকক্ষণ সাড়া না পেয়ে ভাবলাম ঘুমোচ্ছ বুঝি। কিন্তু শীতের বেলায় বেশি ঘুমোলে শরীর খারাপ করবে ভেবে বুদ্ধি করে চা নিয়ে এলাম। ভাবলাম চায়ের ছুতো করে জাগিয়ে দিয়ে যাই, তা এসে দেখছি, মন দিয়ে লেখাপড়া করছ।
লেখাপড়া নয় ঠাকরোন, এ একরকম চিকিৎসা।
ও মা! লেখাপড়া আবার কীসের চিকিৎসা?
ও তুমি বুঝবে না, মাথায় এলোমেলো চিন্তা এলে সেগুলো ঠেকানোর জন্য আমি মনে যা আসে লিখতে থাকি। লেখায় একটা প্যাটার্ন চলে আসে। তাতে মনটা একটু স্থির হয়।
হ্যাঁ গো, তোমার মনের অশান্তি কি আর শেষ হবে না?
চায়ের কাপটা হাতে নিতে গিয়ে একটু চলকে গেল। অমল টের পায় আজকাল তার হাত কাঁপে। অকারণেই কাঁপে। কিংবা কোনও গূঢ় কারণে।
কলকাতায় খবর দিয়েছ তো!
দিয়ে লাভ কী?
দুশ্চিন্তা করবে তো! আজ তিন দিন।
আজ তিন দিন? বলো কী? আমার তো মনে হচ্ছে যেন অনেক দিন হল এসেছি।
চালাকি কোরো না, আজই একটা খবর দাও। তোমার এসব হাবভাব আমার মোটেই ভাল লাগে না বাপু। অবিশ্যি তোমার দাদাটি বিবেচক লোক। সে হয়তো খবর একটা দিয়েছে।
অমল হেসে বলল, খবর যে দেওয়া হয়ে গেছে তা কি আর আমি জানি না বলে মনে করো? তোমরা সংসারী মানুষ, বেহিসাব তোমাদের কুষ্ঠিতে নেই।
বেহিসেবি চলন কি ভাল ঠাকুরপো? এবার খোলসা করে বলো তো হুট করে চলে এলে কেন।
শুনে কী করবে?
শুনিই না।
অমল খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, শুনলেও তোমার বিশ্বাস হবে না।
কেন হবে না?
আমি ওদের খুব ভয় পাই।
ও মা! কাদের ভয় পাও?
আমার বউ, ছেলে আর মেয়েকে।
ভয় পাও কেন? ওরা কি তোমাকে কামড়ায় নাকি?
না। এ ভয়টা একটু অদ্ভুত ধরনের।
বউকে একটু আধটু ভয় পাও সে ঠিক আছে। অনেকেই পায় বলে জানি। কিন্তু ছেলেমেয়েকে ভয় কীসের?
আমি ওদের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে পেরে উঠি না। সবসময়ে মনে হয় ওরা আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ জীব, অনেক বেশি পাওয়ারফুল।
যত উদ্ভুটে কথা। আর তাও যদি হয় তো ভয়টা কীসের!
আমার ওদের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকতে ইচ্ছে করছিল।
তাই না বলে কয়ে চলে এলে? ওরা তোমার আপনার জন না কি?
অস্বীকার করি কী করে?
তাহলে?
সেইসবও ভাবি, কেন যে আজকাল আমার ভয় হয়
তুমি তো বামুনের ছেলে!
অমল অবাক হয়ে একটু হেসে বলল, তাতে কী?
বলি বামুনের ছেলে হয়ে জন্মেছ, পৈতেও হয়েছিল জানি, তা গলার যজ্ঞসূত্রটা কোথায় গেল?
দুর! সে কবে হারিয়ে ফেলেছি।
গায়ত্রী মন্ত্র মনে আছে?
ওং ভূর্ভুবঃ সঃ তো? কেন মনে থাকবে না?
কখনও জপ-টপ করো?
দুর দুর, ওসব কবেই চুকেবুকে গেছে।
তোমার মাথা, কিছু চুকেবুকে যায়নি। ফের শুরু করো তো!
