তা সেসব খেতে পারলে আর ফলগুলো পড়ে রইল? তুমি কেমন ধারা লোক?
ওই ভয়েই তো খাইনি। ওসব ফল-টল খেলে জিব যদি ফের স্বাদগন্ধ পেতে শুরু করে তখন কি। আর হাসপাতালের খাবার খেতে পারব?
নাঃ, তোমাকে নিয়ে আর পারা যায় না।
রাগ কোরো না গো ভালমানুষের ছেলে। তুমি বড় ভাল লোক। আমি আজকাল যাকেই দেখি তাকেই মনে হয় ভাল লোক। পরশুদিন আমার ভাইঝি দেখতে এসে দুটো টাকা দিয়ে গিয়েছিল। বালিশের তলায় রেখেছিলাম যত্ন করে। সকালবেলায় জমাদারটা এসে বালিশের তলায় হাত ঢুকিয়ে বের করে নিয়ে গেল। তা বাপু তাকেও আমার কেন যেন ভাল লোক বলেই মনে হচ্ছিল। সবাই তাকে গালমন্দ করে বটে, সে নাকি আঁটপাট দেয় না, পায়খানা পরিষ্কার করতে চায় না, তার জন্যই নাকি চারধারে গু-মুত জমে আছে, কিন্তু আমার তাকে দিব্যি ভালমানুষ বলে মনে হল।
এটা সরকারের হাসপাতাল বুড়িমা, সরকার ওদের মাইনে দেয়, ওদের কাজ করা উচিত।
হ্যাঁ বাবা, এই সরকার লোকটা কে বলল তো! সবাই তাকে খুব গালমন্দ করে বটে শুনি, সে-ই নাকি নাটের গুরু, যত নষ্টের গোড়া, তা লোকটা যদি এতই খারাপ তবে তার এত নামডাক কেন বলো তো!
আহা সরকার মানে কি আর একটা লোক? অনেক লোক মিলেই তো সরকার।
ও বাবা! এত সরকার! তা বাবা সরকারেরাই বা খারাপ কেন বলো! গাঁটের কড়ি দিয়ে হাসপাতালখানা তো বানিয়ে দিয়েছে! দিব্যি পাকা ঘর, মেঝেতে পড়ে আছি বটে, কিন্তু বাড়ির চেয়ে তো ঢের ভাল, বাড়ির মাটির মেঝেতে কি এত আরাম হত।
নাঃ, তোমাকে নিয়ে আর পারা যায় না বুড়িমা, হাসপাতালের এইসব অব্যবস্থার জন্যই তো আমরা আন্দোলন করছি।
ওই আর একটা লোক, সবাই আন্দোলনবাবুর কথা খুব বলে। সে নাকি খুব ভাল। সে এলে সব নাকি ফের ঠিকঠাক হয়ে যাবে। তা আন্দোলনবাবু আসে না কেন বলো তো! তাকে বড় দেখতে ইচ্ছে যায়। দেখতে পেলে একটু পায়ের ধুলো নিতাম।
না বুড়িমা, তোমাকে কিছু বোঝানো যাবে না, বুঝে তোমার কাজও নেই। ফলগুলো দয়া করে খেও। কাল থেকে পড়ে আছে। এরপর পচে উঠবে! মাছি তো ভনভন করছে দেখছি।
হ্যাঁ বাবা, মাছিরা খুব ছেঁকে ধরে আমাকে। বড় বড় নীল মাছি, গুয়ের মাছি, তা হোক, মাছিগুলো দেখতে ভারী সুন্দর।
বুড়িমা! ও বুড়িমা! সাড়া দিচ্ছ না কেন? … এই রে! টেঁসে গেল নাকি?
কে বাবা! যমদূত?
না বুড়িমা, আমি যমদূত নই।
তবে কি তুমি সরকার না আন্দোলন?
না বুড়িমা, আমি সরকারি লোক নই, আন্দোলন করতেও আসিনি। শাবলরাম মাড়োয়ারির ছেলের বিয়ে বলে গরিবদের কম্বল দেওয়া হচ্ছে। এই নাও, তোমার জন্যও একখানা এনেছি।
বাঃ বাঃ, এ তো ভারী বাহারি জিনিস গো! বিনি মাগনা দিচ্ছ নাকি?
হ্যাঁ গো বুড়িমা, একদম বিনি মাগনা।
তা ভাল বাছা, কলিকালে এখনও বিনি মাগনা জিনিস মেলে তাহলে গো, কেমন যেন বিশ্বাস হতে চায় না।
কেন বলো তো! বিশ্বাস না হওয়ার কী আছে?
এখেনে যে আমাকে ওষুধপত্তর কিছু দেয় না বাবা, শুনেছিলুম সরকারবাবু হাসপাতালে বিনি পয়সায় ওষুধ দেওয়ার বন্দোবস্ত করেছে। তা এখানকার লোক বলে ওসব বাজে কথা। ওষুধ খেতে হলে পয়সা দিতে হবে। এই যে চারদিকে গু-মুত-বমি-গয়ের-থুথু পড়ে আছে এসবও নাকি পয়সা না দিলে পরিষ্কার করা হবে না। ডাক্তারবাবু বুকে নল লাগালেও পয়সা লাগবে। তা বাবা, সেদিন ভয়ে ভয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করলুম, হ্যাঁ গো, এই যে শ্বাস নিচ্ছি এর জন্য পয়সা চাইবে না তো!
এ দেশে গরিবদের দেখার তো কেউ নেই বুড়িমা। সেইজন্যই তো তোমাদের আন্দোলনে নামতে বলি। একবার রুখে দাঁড়াও, দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে।
আন্দোলনবাবুকে আমার পেন্নাম দিও বাবা। সে বড্ড ভাল লোক।
এখানে এত দুর্গন্ধ কেন বলো তো বুড়িমা?
তা আর হবে না বাছা, আমার যে পেট ছেড়েছে!
এঃ মাঃ!
পরশুও হামাগুড়ি দিয়ে পায়খানায় যেতে পেরেছি, কাল থেকে হাত-পায়ে যেন সাড়া পাচ্ছি না, বিছানাতেই হয়ে যাচ্ছে।
আঁঃ তা পরিষ্কার করছে না কেউ?
না বাবা, সেরকম নাকি নিয়ম নেই।
ওষুধপত্রও দিচ্ছে না!
এই তো বললাম, ওষুধপত্র দিলে পয়সা নেবে।
এ তো ভীষণ অন্যায়!
রাগ কোরো না বাবা, আমি কিছু খারাপও তো নেই, সবাই বলছে বুড়িটা গপগপ করে খায় বলে হাগছে। তা তাই হবে বোধহয়, তা এই সময়ে তুমি কম্বল এনেছ দেখে বাঁচলুম। কম্বলটা আমার মাথায় ঠেকিয়ে শিয়রে রেখে দাও। কম্বলেই আমার অসুখ ভাল হয়ে যাবে।
ধ্যেৎ! কী যে বলো!
কম্বলে অসুখ সারবে না বাবা?
তাই কখনও সারে? কম্বল কি পেট খারাপের ওষুধ?
তবে তুমি আনলে যে! আমি তো ভাবছি ওষুধ না হোক কম্বল তো জুটল। ভগবান বোধহয় কম্বল দিয়েই দাস্ত বন্ধ করবেন।
নাঃ, তোমার মাথাটাই গেছে দেখছি। কম্বল কেন দেয় জানো না? ওম-এর জন্য। এই যে ঠান্ডার। মধ্যে মেঝেতে পড়ে আছ, তোমার শীত করে না?
ও বাবা, তা আর করে না! খুব করে বাবা, খুব শীত করে। কিন্তু ওম কি আমার সইবে বাবা? বেশি ওম-এ আবার গায়ে ফোঁসকা না পড়ে যায়, ঠান্ডা থেকে হঠাৎ গরম হলে গোলমাল হবে না তো!
ওঃ, তোমাকে নিয়ে আর পারা যায় না, এই জন্যেই বলে মানুষের ভাল করতে নেই।
এটা কার কথা বাবা? বড় ভাল কথা তো!
.
ও বুড়ি!
অ্যাঁ! কে রে?
আমি যমদূত।
বটে!
হ্যাঁ রে, এবার শরীরটা ছেড়ে ফেলে দে দিকিনি।
শরীর ছেড়ে ফেলব? কেন বাপু?
